Dhaka ০২:৩২ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৭ অগাস্ট ২০২৬, ২ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ঋতুপর্ণার বাঁ পায়ে বিদ্যুতের ঝলক

  • Reporter Name
  • Update Time : ১০:৪৩:৫২ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৪ মার্চ ২০২৬
  • ৫০৩ Time View

ফুটবল কি কেবলই গোলের খেলা? কেবলই ওই জাল কাঁপানোর আদিম উল্লাস? স্কোরবোর্ডের ওই নিরস সংখ্যাগুলোই কি বলবে শেষ কথা? মাফ করবেন, চীনের বিপক্ষে ঋতুপর্ণা চাকমার নেওয়া ওই বাঁ পায়ের শটটি দেখে তাকে স্রেফ ফুটবল ম্যাচ বললে ভুল হবে। ওটা ছিল স্পর্ধা। ছিল এক বাংলাদেশিকন্যার দর্প চূর্ণ করা ৩৫ গজের এক কাব্য। 

সিডনির যে দৃশ্যে কোনো ট্রফি ছিল না, গোল ছিল না, ছিল শুধু বিষাদভরা আফসোস। ম্যাচের ১৪ মিনিট, চীনের প্রাচীর, তখন কেবল রক্ষণভাগে নয়, যেন ‘ওরা আমাদের চেয়ে গায়ের জোরে বেশি’ ধারণাটি বাঙালির মনস্তত্ত্বকেও চেপে ধরেছে। সেই দমবন্ধ করা পরিস্থিতিতেই ঋতুপর্ণা যখন বলটা রিসিভ করলেন মুহূর্তেই বিদ্যুৎ খেলে যায় যেন তাঁর বাম পায়ে। অসামান্য সুইংয়ে বলটা যখন তিনি বাতাসে ভাসালেন, মনে হয়েছিল সিডনির আকাশে কোনো এক ধূমকেতু! শটটি নেওয়ার সময় ঋতুপর্ণা বলের নিচের অংশে নিখুঁতভাবে হিট করেছিলেন, এতে বাতাসে একটি ধনুরাকৃতি তৈরি হয়েছি। এই ধরনের শটে বল বাতাসে থাকাকালীন গতি খুব একটা কমে না, যা গোলরক্ষককে বিভ্রান্ত করার জন্য যথেষ্ট। চীনের অভিজ্ঞ ও দীর্ঘকায়ী গোলরক্ষক চেন চেন পিছু হটে কোনোমতে আঙুলের ডগায় বলটি স্পর্শ করে কর্নারের রক্ষাকবচ বেছে নেন। এতে কেঁপে ওঠে চীনা রক্ষণের ‘গ্রেট ওয়াল অব চায়না’। ম্যাচে ঋতুপর্ণা তাঁর চিরচেনা লেফট উইং পজিশনে খেলেছেন। তবে মাঝে মাঝে তাঁকে চীনের রক্ষণভাগকে বিভ্রান্ত করতে ফরোয়ার্ড হিসেবেও ইন সাইড কাট করতে দেখা গেছে। তিন-চারবার তাঁকে ডিফেন্ডারদের বিপক্ষে সফল ড্রিবলিংও করতে দেখা গেছে। কখনও নিচে নেমে রক্ষণেও খেলতে দেখা গেছে। পুরো মাঠ ছুটে চলা এই পাহাড়ি কিশোরীর গতির কাছে হিমশিম খেতে হয়েছে চীনা ডিফেন্ডারদের। 

জিপিএস চিপের মাধ্যমে দলের ট্রেনার হয়তো সঠিক তথ্যটি দিতে পারবেন, তবে এদিন মারিয়া মান্ডার কাছ থেকে পাওয়া বলটি নিয়ে ঋতুপর্ণার কাউন্টার অ্যাটাকের গতির একটা অনুমানভিত্তিক তথ্য দেওয়া যেতে পারে। যেখানে ওই মুহূর্তে তাঁর দৌড়ের গতি ছিল ঘণ্টায় ২৭ থেকে ২৯ কিলোমিটার। আর তা বাঁ পায়ে নেওয়া ওই শটটির গতি ছিল প্রায় ৮০ থেকে ৯০ কিলোমিটার। কেননা এর চেয়ে কম গতি হলে চীনা গোলরক্ষক তা গ্রিপ করতে পারতেন। 

আরও পড়ুনঃ  টানা দেড় মাসের ছুটিতে যাচ্ছে দেশের সব মাদরাসা

ফুটবল বিশ্লেষকদের মতে একজন খেলোয়াড় যখন দৌড়ানোর মধ্যে থেকে এমন দূরপাল্লার শট নেন, তখন তাঁর শরীরের সম্পূর্ণ ভর বলের ওপর স্থানান্তরিত হয়। যে কারণে ঋতুপর্ণার শটটি ছিল বুলেট গতির। আসলে বাঁ দিক থেকে আড়াআড়িভাবে এমন শট নেওয়াটা ঋতুপর্ণার জন্য নতুন কিছু নয়। গর্ব আর শিহরণের মিশেলে এমন শটে তিনি গোল পেয়েছেন নারী সাফের ফাইনালে নেপালের বিপক্ষে। মিয়ানমার, ভুটানের বিপক্ষেও তাঁর এই জাদুকরি গোল দেখেছেন বাংলাদেশি সমর্থকরা। 

কিন্তু এশিয়ান কাপের মতো বড় মঞ্চ, তাও আবার চীনের মতো চ্যাম্পিয়ন দলের বিপক্ষে নারী ফুটবলের কিংবদন্তি যুক্তরাষ্ট্রের কার্লি লয়েডের যেন মনে করিয়ে দিলেন ঋতুপর্ণা। চীনের রোবোটিক ফুটবলের সামনে এ যেন ছিল এক বাঘিনীদের লড়ে যাওয়ার হিংস্র আবেগ। যারা ম্যাচটি দেখেছেন, তারা অন্তত চীনের দুটি গোল নিয়ে নয় কপির মগে চুমুক দেবেন ঋতুপর্ণার ওই এক ফালি রোদ্দুরের মতো অবিশ্বাস্য শটটি নিয়েই। তাই গোলের বাইরেও ফুটবল আছে, আর সেখানে আছে আমাদের একজন ঋতুপর্ণা চাকমা।

Tag :
About Author Information

জনপ্রিয় পোস্ট

ঋতুপর্ণার বাঁ পায়ে বিদ্যুতের ঝলক

Update Time : ১০:৪৩:৫২ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৪ মার্চ ২০২৬

ফুটবল কি কেবলই গোলের খেলা? কেবলই ওই জাল কাঁপানোর আদিম উল্লাস? স্কোরবোর্ডের ওই নিরস সংখ্যাগুলোই কি বলবে শেষ কথা? মাফ করবেন, চীনের বিপক্ষে ঋতুপর্ণা চাকমার নেওয়া ওই বাঁ পায়ের শটটি দেখে তাকে স্রেফ ফুটবল ম্যাচ বললে ভুল হবে। ওটা ছিল স্পর্ধা। ছিল এক বাংলাদেশিকন্যার দর্প চূর্ণ করা ৩৫ গজের এক কাব্য। 

সিডনির যে দৃশ্যে কোনো ট্রফি ছিল না, গোল ছিল না, ছিল শুধু বিষাদভরা আফসোস। ম্যাচের ১৪ মিনিট, চীনের প্রাচীর, তখন কেবল রক্ষণভাগে নয়, যেন ‘ওরা আমাদের চেয়ে গায়ের জোরে বেশি’ ধারণাটি বাঙালির মনস্তত্ত্বকেও চেপে ধরেছে। সেই দমবন্ধ করা পরিস্থিতিতেই ঋতুপর্ণা যখন বলটা রিসিভ করলেন মুহূর্তেই বিদ্যুৎ খেলে যায় যেন তাঁর বাম পায়ে। অসামান্য সুইংয়ে বলটা যখন তিনি বাতাসে ভাসালেন, মনে হয়েছিল সিডনির আকাশে কোনো এক ধূমকেতু! শটটি নেওয়ার সময় ঋতুপর্ণা বলের নিচের অংশে নিখুঁতভাবে হিট করেছিলেন, এতে বাতাসে একটি ধনুরাকৃতি তৈরি হয়েছি। এই ধরনের শটে বল বাতাসে থাকাকালীন গতি খুব একটা কমে না, যা গোলরক্ষককে বিভ্রান্ত করার জন্য যথেষ্ট। চীনের অভিজ্ঞ ও দীর্ঘকায়ী গোলরক্ষক চেন চেন পিছু হটে কোনোমতে আঙুলের ডগায় বলটি স্পর্শ করে কর্নারের রক্ষাকবচ বেছে নেন। এতে কেঁপে ওঠে চীনা রক্ষণের ‘গ্রেট ওয়াল অব চায়না’। ম্যাচে ঋতুপর্ণা তাঁর চিরচেনা লেফট উইং পজিশনে খেলেছেন। তবে মাঝে মাঝে তাঁকে চীনের রক্ষণভাগকে বিভ্রান্ত করতে ফরোয়ার্ড হিসেবেও ইন সাইড কাট করতে দেখা গেছে। তিন-চারবার তাঁকে ডিফেন্ডারদের বিপক্ষে সফল ড্রিবলিংও করতে দেখা গেছে। কখনও নিচে নেমে রক্ষণেও খেলতে দেখা গেছে। পুরো মাঠ ছুটে চলা এই পাহাড়ি কিশোরীর গতির কাছে হিমশিম খেতে হয়েছে চীনা ডিফেন্ডারদের। 

জিপিএস চিপের মাধ্যমে দলের ট্রেনার হয়তো সঠিক তথ্যটি দিতে পারবেন, তবে এদিন মারিয়া মান্ডার কাছ থেকে পাওয়া বলটি নিয়ে ঋতুপর্ণার কাউন্টার অ্যাটাকের গতির একটা অনুমানভিত্তিক তথ্য দেওয়া যেতে পারে। যেখানে ওই মুহূর্তে তাঁর দৌড়ের গতি ছিল ঘণ্টায় ২৭ থেকে ২৯ কিলোমিটার। আর তা বাঁ পায়ে নেওয়া ওই শটটির গতি ছিল প্রায় ৮০ থেকে ৯০ কিলোমিটার। কেননা এর চেয়ে কম গতি হলে চীনা গোলরক্ষক তা গ্রিপ করতে পারতেন। 

আরও পড়ুনঃ  সালমানের রানআউট: ‘মনে হচ্ছে বাংলাদেশকে বিশ্বাস করাটা অপরাধ’

ফুটবল বিশ্লেষকদের মতে একজন খেলোয়াড় যখন দৌড়ানোর মধ্যে থেকে এমন দূরপাল্লার শট নেন, তখন তাঁর শরীরের সম্পূর্ণ ভর বলের ওপর স্থানান্তরিত হয়। যে কারণে ঋতুপর্ণার শটটি ছিল বুলেট গতির। আসলে বাঁ দিক থেকে আড়াআড়িভাবে এমন শট নেওয়াটা ঋতুপর্ণার জন্য নতুন কিছু নয়। গর্ব আর শিহরণের মিশেলে এমন শটে তিনি গোল পেয়েছেন নারী সাফের ফাইনালে নেপালের বিপক্ষে। মিয়ানমার, ভুটানের বিপক্ষেও তাঁর এই জাদুকরি গোল দেখেছেন বাংলাদেশি সমর্থকরা। 

কিন্তু এশিয়ান কাপের মতো বড় মঞ্চ, তাও আবার চীনের মতো চ্যাম্পিয়ন দলের বিপক্ষে নারী ফুটবলের কিংবদন্তি যুক্তরাষ্ট্রের কার্লি লয়েডের যেন মনে করিয়ে দিলেন ঋতুপর্ণা। চীনের রোবোটিক ফুটবলের সামনে এ যেন ছিল এক বাঘিনীদের লড়ে যাওয়ার হিংস্র আবেগ। যারা ম্যাচটি দেখেছেন, তারা অন্তত চীনের দুটি গোল নিয়ে নয় কপির মগে চুমুক দেবেন ঋতুপর্ণার ওই এক ফালি রোদ্দুরের মতো অবিশ্বাস্য শটটি নিয়েই। তাই গোলের বাইরেও ফুটবল আছে, আর সেখানে আছে আমাদের একজন ঋতুপর্ণা চাকমা।