Dhaka ০৬:৫০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর ২০২৬, ২৩ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম :
সিলেটে দুর্গাপূজায় আতশবাজি নিষেধ, গুজব ছড়ালে আইনি ব্যবস্থা ৩৩ কোটি টাকার আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম পাচ্ছে সুনামগঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সিলেট মহানগর দায়রা জজ আদালতে নবনিযুক্ত প্রসিকিউটরদের যোগদান এক দফা দাবিতে এবার জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে সিলেট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের শিক্ষার্থীরা আমার নোবেল পাওয়া উচিত, কিন্তু তারা দেবে কি না জানি না: ট্রাম্প বাংলাদেশে বিনিয়োগ ও সংসদীয় সম্পর্ক জোরদারে যুক্তরাজ্যের আইনপ্রণেতাদের প্রতি রাষ্ট্রপতির আহ্বান রেলস্টেশনে জার্মান পর্যটকের ল্যাপটপ-ক্যামেরাসহ ব্যাগ চুরি কঠিন শর্তে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ৩৩০ কোটি ডলার বিদেশি ঋণ নিচ্ছে সরকার মেধাতালিকায় দ্বিতীয় হয়েও চাকরি হয়নি ক্লীন্টনের, নদীভাঙনে হারিয়েছেন স্থায়ী ঠিকানা পবিত্র রমজানকে কেন্দ্র করে ব্যবসায়ীদের কড়া বার্তা দিলেন বাণিজ্যমন্ত্রী

ধানের দাম ৮০০–৯৫০ টাকা, লোকসান গুনছেন কৃষক

ধান-চাল উৎপাদনে প্রসিদ্ধ জেলা নওগাঁয় এবার আউশ ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে। তবে ফলন ভালো হলেও ধানের ন্যায্য দাম না পাওয়ায় কৃষকের মুখে হাসি নেই। বাজারে ধানের দাম উৎপাদন খরচের নিচে নেমে যাওয়ায় লোকসান গুনছেন চাষিরা। ফলে ভালো ফলনও তাঁদের জন্য স্বস্তি বয়ে আনতে পারেনি।

নওগাঁর বিভিন্ন হাটে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বর্তমানে জিরাশাইল, কাটারি ও ব্রি-২৮ জাতের প্রতি মণ ধান ৮০০ থেকে ৯৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কৃষকেরা বলছেন, গত বছরের তুলনায় এবার প্রতি মণ ধানের দাম ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা কমেছে। অন্যদিকে সার, বীজ, সেচ, কীটনাশক ও শ্রমিকের মজুরি বাড়ায় উৎপাদন খরচ বেড়েছে।

কৃষকেরা ধান বিক্রি করে লোকসান গুনলেও এর প্রভাব পড়েনি নওগাঁর চালের বাজারে। স্থানীয় বিভিন্ন চালের মোকামে আগের দামেই মোটা ও সরু জাতের চাল বিক্রি হচ্ছে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, গত মৌসুমে নওগাঁয় ৫১ হাজার ৩০০ হেক্টর জমিতে আউশ ধানের আবাদ হয়েছিল। এবার আবাদ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৮ হাজার ৫৭৩ হেক্টরে। কৃষি বিভাগের হিসাবে, প্রতি একর জমিতে আউশ ধান উৎপাদনে গড়ে খরচ হয়েছে ৬৪ হাজার টাকা। সে হিসাবে প্রতি বিঘায় উৎপাদন খরচ প্রায় ২১ হাজার টাকা।

নওগাঁ সদর, মহাদেবপুর, মান্দা ও নিয়ামতপুর উপজেলার কয়েকজন কৃষকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ধান উৎপাদনে শ্রমিকের মজুরি, সার, সেচ ও জমি প্রস্তুত করতেই বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় হয়। এবার প্রতি বিঘা জমিতে এসব খাতে ২০ হাজার টাকার বেশি খরচ হয়েছে। প্রতি বিঘায় ২০ থেকে ২২ মণ ধান উৎপাদন হলেও প্রতি মণ ৮০০ থেকে ৯০০ টাকা দরে বিক্রি করে কৃষকের আয় হচ্ছে ১৭ থেকে ১৯ হাজার টাকা। ফলে উৎপাদন খরচই উঠছে না।

কৃষকেরা জানান, ধান ঘরে তোলার পরপরই পরিবারের খরচ, ঋণ পরিশোধসহ নানা প্রয়োজন মেটাতে হয়। এ কারণে বাজারে দাম কম থাকলেও অনেকটা বাধ্য হয়েই ধান বিক্রি করতে হচ্ছে তাঁদের।

আরও পড়ুনঃ  জ্বালানি সংকটে বদলে যাচ্ছে জীবনযাত্রা

গত বুধবার মহাদেবপুর উপজেলা সদরের ধানের হাটে ১০ মণ জিরাশাইল ধান নিয়ে এসেছিলেন ডাঙ্গাপাড়া গ্রামের কৃষক আনোয়ার হোসেন। তিনি বলেন, প্রতি মণ ধান বাজারে আনতে ৩০ টাকা ভ্যানভাড়া দিতে হয়েছে। ধান বিক্রি না করে ফেরত নিয়ে গেলেও আবার ভ্যানভাড়া দিতে হতো। তাই বাধ্য হয়ে প্রতি মণ ৮৮০ টাকা দরে ১০ মণ ধান বিক্রি করেছেন তিনি। অথচ গত বছর একই ধরনের আউশ ধান প্রতি মণ ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকা দরে বিক্রি করেছিলেন।

নিয়ামতপুর উপজেলার গোবিন্দপুর গ্রামের কৃষক সেলিম হোসেন জানান, তিন বিঘা জমি বর্গা নিয়ে আউশ ধান আবাদ করেছেন তিনি। এ জন্য সমিতি থেকে ঋণও নিয়েছেন। তিন বিঘা জমিতে তাঁর প্রায় ৬০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। ধানের দাম কমে যাওয়ায় ঋণ পরিশোধ ও সংসারের খরচ চালানো নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন তিনি।

ছাতড়া বাজারের মেসার্স রেখা ধান আড়তের স্বত্বাধিকারী শহিদুল ইসলাম বলেন, বর্তমানে ধানের বাজার বেশ পড়তি। দেড় সপ্তাহের ব্যবধানে প্রতি মণ ধানের দাম ২০০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত কমেছে। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে কাটারি ধান প্রতি মণ ৯০০ থেকে ৯৬০ টাকা, জিরাশাইল ৮৫০ থেকে ৯০০ টাকা এবং ব্রি-২৮ জাতের ধান ৮০০ থেকে ৮২০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।

নওগাঁ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মনজুর রহমান বলেন, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে প্রতি একর আউশ ধান উৎপাদনে গড়ে ৬৪ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। কৃষকেরা প্রতি মণ ধান ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকা দরে বিক্রি করতে পারলে লাভ করতে পারতেন।

চালের বাজারে নেই ধানের দামের প্রভাব

ধানের দাম কমলেও স্থানীয় চালের বাজারে এর তেমন প্রভাব নেই। নওগাঁর চালকল মালিকদের ভাষ্য, গত বোরো মৌসুমে ধানের ভালো ফলনের পাশাপাশি অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে অতিরিক্ত চাল আমদানি হওয়ায় দেশে চালের মজুত বেড়েছে। ফলে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত চালের চাহিদা কমেছে এবং চালকলগুলোতে বিক্রিও কমে গেছে।

আরও পড়ুনঃ  ৪১ বছরে মা হচ্ছেন শাহরুখের নায়িকা মাহিরা খান

বিক্রি কম থাকায় মিলাররাও ধান কেনা কমিয়ে দিয়েছেন বলে জানান তাঁরা। এতে বাজারে ধানের দাম আরও কমে যাওয়ার চাপ তৈরি হয়েছে।

নওগাঁ জেলা চালকল মালিক গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক ফরহাদ হোসেন চকদার বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বিপুল পরিমাণ চাল আমদানি করা হয়েছিল। এর প্রভাবে দেশে উৎপাদিত চালের চাহিদা কমেছে। এই প্রভাব আমনের ভরা মৌসুমেও থাকতে পারে। ফলে আমন মৌসুমেও কৃষকেরা ধানের ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

Tag :
জনপ্রিয় পোস্ট

সিলেটে দুর্গাপূজায় আতশবাজি নিষেধ, গুজব ছড়ালে আইনি ব্যবস্থা

ধানের দাম ৮০০–৯৫০ টাকা, লোকসান গুনছেন কৃষক

Update Time : ০২:৫৫:৫৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ধান-চাল উৎপাদনে প্রসিদ্ধ জেলা নওগাঁয় এবার আউশ ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে। তবে ফলন ভালো হলেও ধানের ন্যায্য দাম না পাওয়ায় কৃষকের মুখে হাসি নেই। বাজারে ধানের দাম উৎপাদন খরচের নিচে নেমে যাওয়ায় লোকসান গুনছেন চাষিরা। ফলে ভালো ফলনও তাঁদের জন্য স্বস্তি বয়ে আনতে পারেনি।

নওগাঁর বিভিন্ন হাটে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বর্তমানে জিরাশাইল, কাটারি ও ব্রি-২৮ জাতের প্রতি মণ ধান ৮০০ থেকে ৯৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কৃষকেরা বলছেন, গত বছরের তুলনায় এবার প্রতি মণ ধানের দাম ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা কমেছে। অন্যদিকে সার, বীজ, সেচ, কীটনাশক ও শ্রমিকের মজুরি বাড়ায় উৎপাদন খরচ বেড়েছে।

কৃষকেরা ধান বিক্রি করে লোকসান গুনলেও এর প্রভাব পড়েনি নওগাঁর চালের বাজারে। স্থানীয় বিভিন্ন চালের মোকামে আগের দামেই মোটা ও সরু জাতের চাল বিক্রি হচ্ছে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, গত মৌসুমে নওগাঁয় ৫১ হাজার ৩০০ হেক্টর জমিতে আউশ ধানের আবাদ হয়েছিল। এবার আবাদ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৮ হাজার ৫৭৩ হেক্টরে। কৃষি বিভাগের হিসাবে, প্রতি একর জমিতে আউশ ধান উৎপাদনে গড়ে খরচ হয়েছে ৬৪ হাজার টাকা। সে হিসাবে প্রতি বিঘায় উৎপাদন খরচ প্রায় ২১ হাজার টাকা।

নওগাঁ সদর, মহাদেবপুর, মান্দা ও নিয়ামতপুর উপজেলার কয়েকজন কৃষকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ধান উৎপাদনে শ্রমিকের মজুরি, সার, সেচ ও জমি প্রস্তুত করতেই বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় হয়। এবার প্রতি বিঘা জমিতে এসব খাতে ২০ হাজার টাকার বেশি খরচ হয়েছে। প্রতি বিঘায় ২০ থেকে ২২ মণ ধান উৎপাদন হলেও প্রতি মণ ৮০০ থেকে ৯০০ টাকা দরে বিক্রি করে কৃষকের আয় হচ্ছে ১৭ থেকে ১৯ হাজার টাকা। ফলে উৎপাদন খরচই উঠছে না।

কৃষকেরা জানান, ধান ঘরে তোলার পরপরই পরিবারের খরচ, ঋণ পরিশোধসহ নানা প্রয়োজন মেটাতে হয়। এ কারণে বাজারে দাম কম থাকলেও অনেকটা বাধ্য হয়েই ধান বিক্রি করতে হচ্ছে তাঁদের।

আরও পড়ুনঃ  ৪১ বছরে মা হচ্ছেন শাহরুখের নায়িকা মাহিরা খান

গত বুধবার মহাদেবপুর উপজেলা সদরের ধানের হাটে ১০ মণ জিরাশাইল ধান নিয়ে এসেছিলেন ডাঙ্গাপাড়া গ্রামের কৃষক আনোয়ার হোসেন। তিনি বলেন, প্রতি মণ ধান বাজারে আনতে ৩০ টাকা ভ্যানভাড়া দিতে হয়েছে। ধান বিক্রি না করে ফেরত নিয়ে গেলেও আবার ভ্যানভাড়া দিতে হতো। তাই বাধ্য হয়ে প্রতি মণ ৮৮০ টাকা দরে ১০ মণ ধান বিক্রি করেছেন তিনি। অথচ গত বছর একই ধরনের আউশ ধান প্রতি মণ ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকা দরে বিক্রি করেছিলেন।

নিয়ামতপুর উপজেলার গোবিন্দপুর গ্রামের কৃষক সেলিম হোসেন জানান, তিন বিঘা জমি বর্গা নিয়ে আউশ ধান আবাদ করেছেন তিনি। এ জন্য সমিতি থেকে ঋণও নিয়েছেন। তিন বিঘা জমিতে তাঁর প্রায় ৬০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। ধানের দাম কমে যাওয়ায় ঋণ পরিশোধ ও সংসারের খরচ চালানো নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন তিনি।

ছাতড়া বাজারের মেসার্স রেখা ধান আড়তের স্বত্বাধিকারী শহিদুল ইসলাম বলেন, বর্তমানে ধানের বাজার বেশ পড়তি। দেড় সপ্তাহের ব্যবধানে প্রতি মণ ধানের দাম ২০০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত কমেছে। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে কাটারি ধান প্রতি মণ ৯০০ থেকে ৯৬০ টাকা, জিরাশাইল ৮৫০ থেকে ৯০০ টাকা এবং ব্রি-২৮ জাতের ধান ৮০০ থেকে ৮২০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।

নওগাঁ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মনজুর রহমান বলেন, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে প্রতি একর আউশ ধান উৎপাদনে গড়ে ৬৪ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। কৃষকেরা প্রতি মণ ধান ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকা দরে বিক্রি করতে পারলে লাভ করতে পারতেন।

চালের বাজারে নেই ধানের দামের প্রভাব

ধানের দাম কমলেও স্থানীয় চালের বাজারে এর তেমন প্রভাব নেই। নওগাঁর চালকল মালিকদের ভাষ্য, গত বোরো মৌসুমে ধানের ভালো ফলনের পাশাপাশি অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে অতিরিক্ত চাল আমদানি হওয়ায় দেশে চালের মজুত বেড়েছে। ফলে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত চালের চাহিদা কমেছে এবং চালকলগুলোতে বিক্রিও কমে গেছে।

আরও পড়ুনঃ  বিএনপির বিভিন্ন কমিটির শূন্যপদে পদোন্নতি হবে কীভাবে, জানালেন রিজভ

বিক্রি কম থাকায় মিলাররাও ধান কেনা কমিয়ে দিয়েছেন বলে জানান তাঁরা। এতে বাজারে ধানের দাম আরও কমে যাওয়ার চাপ তৈরি হয়েছে।

নওগাঁ জেলা চালকল মালিক গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক ফরহাদ হোসেন চকদার বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বিপুল পরিমাণ চাল আমদানি করা হয়েছিল। এর প্রভাবে দেশে উৎপাদিত চালের চাহিদা কমেছে। এই প্রভাব আমনের ভরা মৌসুমেও থাকতে পারে। ফলে আমন মৌসুমেও কৃষকেরা ধানের ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।