Dhaka ০১:৫২ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৭ অগাস্ট ২০২৬, ২ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ব্যাংক খাতে সংস্কারসংশোধনের অপেক্ষায় মৌলিক কিছু আইন

  • Reporter Name
  • Update Time : ০২:৫৮:০৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ২১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ৫০৫ Time View

চরম দুরবস্থায় থাকা ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর মধ্যে কিছু বাস্তবায়ন হয়েছে। কিছু বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। বিশেষত বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার এবং ব্যাংক কোম্পানি আইনের মতো মৌলিক আইন সংশোধনের প্রস্তাব নির্বাচিত সরকারের বিবেচনার জন্য রেখে গেছে অন্তর্বর্তী সরকার।

ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ বরাবরই বড় সমস্যা। তিন ভাগের একভাগ ঋণ বর্তমানে খেলাপি হয়ে গেছে। বিগত আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের সময়কালে নীতি সহায়তার নামে খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র আড়ালে রাখা হয়। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রথম দিকে গভর্নর হিসেবে অর্থনীতিবিদ ড. আহসান এইচ মনসুর দায়িত্ব নিয়ে খেলাপি ঋণের আসল চিত্র দেখানোর ওপর জোর দেন। ফলে খেলাপি ঋণ গত দুই বছরে বেড়ে প্রায় তিন গুণ হয়েছে। এর প্রভাবে মূলধন ঘাটতি, লোকসানে থাকা ব্যাংকের সংখ্যা বেড়েছে।২০২৪ সালের আগস্ট-পরবর্তী আমানতকারীদের আস্থা ফেরাতে কয়েকটি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন ও পাঁচ ব্যাংক একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করা হয়েছে। অবশ্য একীভূতকরণ নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে নানা অবস্থানের কারণে এখনও সংকট রয়ে গেছে। আবার ব্যাংক খাতের দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারে মোটাদাগে কয়েকটি আইন সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বিশেষ করে বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার সংশোধন করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব করা হয়। এ ছাড়া ব্যাংকে পরিবারতন্ত্র কমাতে ব্যাংক কোম্পানি আইনের কয়েকটি ধারা সংশোধন এবং ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে অর্থঋণ আদালত আইন সংশোধনীর জন্য প্রস্তাব পাঠানো হয়। বেশ আগেই কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে প্রস্তাব গেলেও অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে অর্থ মন্ত্রণালয় এই প্রক্রিয়া এগোয়নি।

ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ দায়িত্বের শেষ সময়ে এসে গভর্নরকে চিঠি দিয়ে জানান, এ রকম মৌলিক আইন সংশোধন করা অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য বাস্তবসম্মত হবে না। নির্বাচিত সরকারের মাধ্যমে সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া অধিকতর যুক্তিযুক্ত হবে। অর্থ মন্ত্রণালয়ে এসব সংশোধনী আটকে যাওয়ায় নিজের দুঃখবোধের কথা জানান গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর। এদিকে খেলাপি ঋণ কেনার জন্য অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি গঠনে একটি অধ্যাদেশ জারি করার আলোচনা থাকলেও শেষ পর্যন্ত অন্তর্বর্তী সরকারের হয়নি।
ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ-২০২৫-এর আওতায় পাঁচ ব্যাংক একীভূত হয়েছে। আমানতকারীদের সুরক্ষা বাড়াতে আমানত বীমা ট্রাস্ট তহবিল থেকে সর্বোচ্চ এক লাখ টাকার পরিবর্তে দুই লাখ টাকা করা হয়েছে। সাধারণভাবে এই তহবিল থেকে কোনো ব্যাংক দেউলিয়া বা বন্ধ হলে অর্থ ফেরত দেওয়ার নিয়ম রয়েছে। তবে আমানত বীমা সুরক্ষা তহবিলের আওতায় একীভূত পাঁচ ব্যাংককে যুক্ত করে দুই লাখ টাকা পর্যন্ত ফেরত দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। বিএনপির নেতৃত্বে গঠিত সরকারের অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বেশ আগে থেকে ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফেরানোর পক্ষে বক্তব্য দিয়ে আসছেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংককে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ বিলুপ্ত করার অভিপ্রায়ের কথা বলেছেন তিনি। নতুন অর্থমন্ত্রী দায়িত্ব নেওয়ার পর চার ডেপুটি গভর্নরকে নিয়ে সৌজন্য সাক্ষাতে যান গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর। সেখানে ব্যাংক খাত নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন সংস্কার কার্যক্রম ও চিন্তাভাবনা তুলে ধরেন গভর্নর।

আরও পড়ুনঃ  দেশের সব বিমা কোম্পানির নিবন্ধন নবায়নে মাশুল বাড়ছে, চলতি সপ্তাহে প্রজ্ঞাপনের সম্ভাবনা

খেলাপি ঋণের বর্তমান পরিস্থিতি
বাংলাদেশ ব্যাংক প্রকাশিত খেলাপি ঋণের তথ্য রয়েছে গত বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। এতে দেখা যায়, ২০২৫ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যাংক খাতে মোট ঋণ ১৮ লাখ তিন হাজার ৮০ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপিতে পরিণত হয়েছে ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ। খেলাপি ঋণের বিপরীতে ব্যাংকগুলো প্রভিশন বা নিরাপত্তা সঞ্চিতি রেখেছে মাত্র এক লাখ ৩০ হাজার ৩৯৬ কোটি টাকা। প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে তিন লাখ ৪৪ হাজার ২৩১ কোটি টাকা। বিশাল প্রভিশন ঘাটতি ব্যাংকের আমানতকারীদের জন্য বড় ঝুঁকি নির্দেশ করে। ২০২৪ সালের জুন শেষে খেলাপি ঋণ ছিল যেখানে দুই লাখ ১১ হাজার ৩৯২ কোটি টাকা। মোট ঋণের যা ছিল ১২ দশমিক ৫৬ শতাংশ। অবশ্য ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ঋণ কমে ৩০ শতাংশে নেমেছে বলে জানা গেছে।

Tag :
About Author Information

জনপ্রিয় পোস্ট

ব্যাংক খাতে সংস্কারসংশোধনের অপেক্ষায় মৌলিক কিছু আইন

Update Time : ০২:৫৮:০৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ২১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

চরম দুরবস্থায় থাকা ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর মধ্যে কিছু বাস্তবায়ন হয়েছে। কিছু বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। বিশেষত বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার এবং ব্যাংক কোম্পানি আইনের মতো মৌলিক আইন সংশোধনের প্রস্তাব নির্বাচিত সরকারের বিবেচনার জন্য রেখে গেছে অন্তর্বর্তী সরকার।

ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ বরাবরই বড় সমস্যা। তিন ভাগের একভাগ ঋণ বর্তমানে খেলাপি হয়ে গেছে। বিগত আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের সময়কালে নীতি সহায়তার নামে খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র আড়ালে রাখা হয়। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রথম দিকে গভর্নর হিসেবে অর্থনীতিবিদ ড. আহসান এইচ মনসুর দায়িত্ব নিয়ে খেলাপি ঋণের আসল চিত্র দেখানোর ওপর জোর দেন। ফলে খেলাপি ঋণ গত দুই বছরে বেড়ে প্রায় তিন গুণ হয়েছে। এর প্রভাবে মূলধন ঘাটতি, লোকসানে থাকা ব্যাংকের সংখ্যা বেড়েছে।২০২৪ সালের আগস্ট-পরবর্তী আমানতকারীদের আস্থা ফেরাতে কয়েকটি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন ও পাঁচ ব্যাংক একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করা হয়েছে। অবশ্য একীভূতকরণ নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে নানা অবস্থানের কারণে এখনও সংকট রয়ে গেছে। আবার ব্যাংক খাতের দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারে মোটাদাগে কয়েকটি আইন সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বিশেষ করে বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার সংশোধন করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব করা হয়। এ ছাড়া ব্যাংকে পরিবারতন্ত্র কমাতে ব্যাংক কোম্পানি আইনের কয়েকটি ধারা সংশোধন এবং ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে অর্থঋণ আদালত আইন সংশোধনীর জন্য প্রস্তাব পাঠানো হয়। বেশ আগেই কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে প্রস্তাব গেলেও অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে অর্থ মন্ত্রণালয় এই প্রক্রিয়া এগোয়নি।

ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ দায়িত্বের শেষ সময়ে এসে গভর্নরকে চিঠি দিয়ে জানান, এ রকম মৌলিক আইন সংশোধন করা অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য বাস্তবসম্মত হবে না। নির্বাচিত সরকারের মাধ্যমে সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া অধিকতর যুক্তিযুক্ত হবে। অর্থ মন্ত্রণালয়ে এসব সংশোধনী আটকে যাওয়ায় নিজের দুঃখবোধের কথা জানান গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর। এদিকে খেলাপি ঋণ কেনার জন্য অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি গঠনে একটি অধ্যাদেশ জারি করার আলোচনা থাকলেও শেষ পর্যন্ত অন্তর্বর্তী সরকারের হয়নি।
ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ-২০২৫-এর আওতায় পাঁচ ব্যাংক একীভূত হয়েছে। আমানতকারীদের সুরক্ষা বাড়াতে আমানত বীমা ট্রাস্ট তহবিল থেকে সর্বোচ্চ এক লাখ টাকার পরিবর্তে দুই লাখ টাকা করা হয়েছে। সাধারণভাবে এই তহবিল থেকে কোনো ব্যাংক দেউলিয়া বা বন্ধ হলে অর্থ ফেরত দেওয়ার নিয়ম রয়েছে। তবে আমানত বীমা সুরক্ষা তহবিলের আওতায় একীভূত পাঁচ ব্যাংককে যুক্ত করে দুই লাখ টাকা পর্যন্ত ফেরত দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। বিএনপির নেতৃত্বে গঠিত সরকারের অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বেশ আগে থেকে ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফেরানোর পক্ষে বক্তব্য দিয়ে আসছেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংককে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ বিলুপ্ত করার অভিপ্রায়ের কথা বলেছেন তিনি। নতুন অর্থমন্ত্রী দায়িত্ব নেওয়ার পর চার ডেপুটি গভর্নরকে নিয়ে সৌজন্য সাক্ষাতে যান গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর। সেখানে ব্যাংক খাত নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন সংস্কার কার্যক্রম ও চিন্তাভাবনা তুলে ধরেন গভর্নর।

আরও পড়ুনঃ  ডোপ টেস্টে ইতিবাচক ফল, অভিযুক্তের ৫ মাসের জেল সহ জরিমানা

খেলাপি ঋণের বর্তমান পরিস্থিতি
বাংলাদেশ ব্যাংক প্রকাশিত খেলাপি ঋণের তথ্য রয়েছে গত বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। এতে দেখা যায়, ২০২৫ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যাংক খাতে মোট ঋণ ১৮ লাখ তিন হাজার ৮০ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপিতে পরিণত হয়েছে ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ। খেলাপি ঋণের বিপরীতে ব্যাংকগুলো প্রভিশন বা নিরাপত্তা সঞ্চিতি রেখেছে মাত্র এক লাখ ৩০ হাজার ৩৯৬ কোটি টাকা। প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে তিন লাখ ৪৪ হাজার ২৩১ কোটি টাকা। বিশাল প্রভিশন ঘাটতি ব্যাংকের আমানতকারীদের জন্য বড় ঝুঁকি নির্দেশ করে। ২০২৪ সালের জুন শেষে খেলাপি ঋণ ছিল যেখানে দুই লাখ ১১ হাজার ৩৯২ কোটি টাকা। মোট ঋণের যা ছিল ১২ দশমিক ৫৬ শতাংশ। অবশ্য ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ঋণ কমে ৩০ শতাংশে নেমেছে বলে জানা গেছে।