Dhaka ০৬:১৩ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৯ অগাস্ট ২০২৬, ৪ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

২৮ শতাংশ শূন্যপদ নিয়ে ‘ধুঁকছে’ পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর

  • Reporter Name
  • Update Time : ০৮:১৮:৩০ অপরাহ্ন, সোমবার, ২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ৫১৩ Time View

দেশে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ এবং মা ও শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় বাংলাদেশের অর্জন বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত। তবে মাঠপর্যায়ে জনবলের তীব্র সংকটে সেই সাফল্য এখন ম্লান হতে শুরু করেছে। বর্তমানে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের কেন্দ্র থেকে মাঠপর্যায় পর্যন্ত প্রায় ২৮ শতাংশ পদ খালি পড়ে আছে। জেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। সেখানে অনেক ক্ষেত্রে ২৮ থেকে ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত পদে কোনো জনবল নেই। ফলে স্বাস্থ্যশিক্ষা ও পরিবার পরিকল্পনা সেবা পৌঁছে দেওয়ার নিয়মিত কার্যক্রমে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটছে।

 সারা দেশে শূন্যপদের ভয়াবহ চিত্র

পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে মোট ৫৪ হাজার ২২৬টি অনুমোদিত পদের মধ্যে ১৪ হাজার ৯৮১টি পদই বর্তমানে শূন্য। অধিদপ্তর থেকে নিয়মিত তথ্য হালনাগাদ না করায় বর্তমানে এই সংখ্যা আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। মাঠপর্যায়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদ হচ্ছে পরিবারকল্যাণ সহকারী। এই পদের সাড়ে ২৩ হাজার কর্মীর মধ্যে বর্তমানে ৪ হাজার ১৮৮টি পদ খালি আছে। ইউনিয়ন পর্যায়ে কাজ তদারকির জন্য থাকা ৩৭১টি পরিবার পরিকল্পনা পরিদর্শকের পদও শূন্য পড়ে আছে। এ ছাড়া সারা দেশের প্রায় আড়াই হাজার ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্রের মধ্যে ৮৭৮টিতে কোনো মেডিক্যাল অফিসার নেই।

মাঠপর্যায়ে বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে জন্মনিয়ন্ত্রণ উপকরণ বিলি এবং গর্ভবতী মা ও নবজাতকের সেবা দেওয়ার নিয়মিত কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে। কর্মকর্তাদের মতে, তিনজনের কাজ যখন একজন করতে হয়, তখন কোনো কাজই মানসম্মতভাবে করা সম্ভব হয় না।

সেবাবঞ্চিত হচ্ছেন প্রান্তিক মানুষ

জনবলসংকটের কারণে জেলা পর্যায়ের পরিস্থিতিও অত্যন্ত নাজুক। রাজশাহী জেলায় প্রায় ৩৬ শতাংশ ও ফরিদপুরে ৩৯ শতাংশ পদে কোনো লোক নেই। ফরিদপুরের পরিস্থিতি এতটাই খারাপ যে সেখানে ৩৩টি পদের মধ্যে ৮টি পদের বিপরীতে একজন কর্মীও কাজ করছেন না। বিশেষ করে মিডওয়াইফ ও সহকারী পরিচালকের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো সম্পূর্ণ খালি। এ ছাড়া পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়িতে ৪৪ শতাংশ ও গাইবান্ধায় ৩৮ শতাংশ পদ শূন্য। এর ফলে মাঠপর্যায়ে বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে জন্মনিয়ন্ত্রণ উপকরণ বিলি করা এবং গর্ভবতী মা ও নবজাতকের সেবা দেওয়ার নিয়মিত কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে।কর্মকর্তাদের মতে, তিনজনের কাজ যখন একজন করতে হয়, তখন কোনো কাজই মানসম্মতভাবে করা সম্ভব হয় না।

আরও পড়ুনঃ  ১৪ হাজার সাংবাদিকের ‘তথ্য ফাঁস’, যা বললো ইসি

আরও পড়ুন

৪৮তম বিসিএস: জাইল্যা দেশের কী ক্ষতি করল! মেধায় টিকেও ছেলে চাকরি পাবে না…

নিয়োগপ্রক্রিয়ায় দীর্ঘস্থায়ী স্থবিরতা

অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, নিয়োগপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতাই আজকের এই সংকটের প্রধান কারণ। সর্বশেষ ২০২০ সালে ৩৬টি ক্যাটাগরিতে নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছিল। কিন্তু দীর্ঘ পাঁচ বছরে মাত্র ৯টি ক্যাটাগরির নিয়োগ সম্পন্ন হয়েছে। বাকি ২৭টি ক্যাটাগরির নিয়োগপ্রক্রিয়া এখনো ঝুলে আছে। নিজস্ব নিয়োগবিধি না থাকায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে নিয়মিত পদের অনুমোদন নিতে হয়। ২০২২ সালের পর মন্ত্রণালয় থেকে নতুন করে কোনো পদের অনুমোদন না মেলায় ফলাফল তৈরি থাকা সত্ত্বেও লোক নিয়োগ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। পাশাপাশি মামলাসংক্রান্ত জটিলতার কারণেও অনেক পদের নিয়োগ আটকে আছে। স্থানীয় পর্যায়ে খাগড়াছড়ি জেলা পরিষদের মাধ্যমে নিয়োগ হওয়ার কথা থাকলেও আদালতের স্থগিতাদেশের কারণে সেখানেও কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।

নতুন নিয়োগবিধি অনুমোদনের জন্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। সেটি অনুমোদিত হলে শূন্য পদের তালিকা সংগ্রহ শেষে নতুন করে নিয়োগপ্রক্রিয়া শুরু করা সম্ভব হবে।

পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) মীর সাজেদুর রহমান

সংস্কার ও ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ

বর্তমানে স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশনের পক্ষ থেকে ‘প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ও জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তর’ নামে একটি নতুন অধিদপ্তর গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এই পরিকল্পনায় পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরসহ তিনটি দপ্তরকে একীভূত করার কথা বলা হয়েছে। এই প্রস্তাব নিয়ে অধিদপ্তরের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মধ্যে ব্যাপক উদ্বেগ ও সংশয় তৈরি হয়েছে। তাঁদের আশঙ্কা, নতুন কাঠামোয় নিয়োগ বা পদোন্নতি কীভাবে হবে, তা এখনো অস্পষ্ট। এতে বিদ্যমান জনবলসংকট আরও দীর্ঘায়িত হতে পারে। অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে নতুন কোনো নিয়োগ দেওয়ার পরিকল্পনা তাঁদের হাতে নেই। তবে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) মীর সাজেদুর রহমান জানিয়েছেন, একটি নতুন নিয়োগবিধি অনুমোদনের জন্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। সেটি অনুমোদিত হলে ও সারা দেশ থেকে শূন্য পদের তালিকা সংগ্রহের কাজ শেষ হলে নতুন করে নিয়োগপ্রক্রিয়া শুরু করা সম্ভব হবে। তবে জনবলসংকট বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ডা. আশরাফী আহমদ।

Tag :
About Author Information

জনপ্রিয় পোস্ট

২৮ শতাংশ শূন্যপদ নিয়ে ‘ধুঁকছে’ পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর

Update Time : ০৮:১৮:৩০ অপরাহ্ন, সোমবার, ২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

দেশে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ এবং মা ও শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় বাংলাদেশের অর্জন বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত। তবে মাঠপর্যায়ে জনবলের তীব্র সংকটে সেই সাফল্য এখন ম্লান হতে শুরু করেছে। বর্তমানে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের কেন্দ্র থেকে মাঠপর্যায় পর্যন্ত প্রায় ২৮ শতাংশ পদ খালি পড়ে আছে। জেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। সেখানে অনেক ক্ষেত্রে ২৮ থেকে ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত পদে কোনো জনবল নেই। ফলে স্বাস্থ্যশিক্ষা ও পরিবার পরিকল্পনা সেবা পৌঁছে দেওয়ার নিয়মিত কার্যক্রমে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটছে।

 সারা দেশে শূন্যপদের ভয়াবহ চিত্র

পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে মোট ৫৪ হাজার ২২৬টি অনুমোদিত পদের মধ্যে ১৪ হাজার ৯৮১টি পদই বর্তমানে শূন্য। অধিদপ্তর থেকে নিয়মিত তথ্য হালনাগাদ না করায় বর্তমানে এই সংখ্যা আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। মাঠপর্যায়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদ হচ্ছে পরিবারকল্যাণ সহকারী। এই পদের সাড়ে ২৩ হাজার কর্মীর মধ্যে বর্তমানে ৪ হাজার ১৮৮টি পদ খালি আছে। ইউনিয়ন পর্যায়ে কাজ তদারকির জন্য থাকা ৩৭১টি পরিবার পরিকল্পনা পরিদর্শকের পদও শূন্য পড়ে আছে। এ ছাড়া সারা দেশের প্রায় আড়াই হাজার ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্রের মধ্যে ৮৭৮টিতে কোনো মেডিক্যাল অফিসার নেই।

মাঠপর্যায়ে বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে জন্মনিয়ন্ত্রণ উপকরণ বিলি এবং গর্ভবতী মা ও নবজাতকের সেবা দেওয়ার নিয়মিত কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে। কর্মকর্তাদের মতে, তিনজনের কাজ যখন একজন করতে হয়, তখন কোনো কাজই মানসম্মতভাবে করা সম্ভব হয় না।

সেবাবঞ্চিত হচ্ছেন প্রান্তিক মানুষ

জনবলসংকটের কারণে জেলা পর্যায়ের পরিস্থিতিও অত্যন্ত নাজুক। রাজশাহী জেলায় প্রায় ৩৬ শতাংশ ও ফরিদপুরে ৩৯ শতাংশ পদে কোনো লোক নেই। ফরিদপুরের পরিস্থিতি এতটাই খারাপ যে সেখানে ৩৩টি পদের মধ্যে ৮টি পদের বিপরীতে একজন কর্মীও কাজ করছেন না। বিশেষ করে মিডওয়াইফ ও সহকারী পরিচালকের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো সম্পূর্ণ খালি। এ ছাড়া পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়িতে ৪৪ শতাংশ ও গাইবান্ধায় ৩৮ শতাংশ পদ শূন্য। এর ফলে মাঠপর্যায়ে বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে জন্মনিয়ন্ত্রণ উপকরণ বিলি করা এবং গর্ভবতী মা ও নবজাতকের সেবা দেওয়ার নিয়মিত কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে।কর্মকর্তাদের মতে, তিনজনের কাজ যখন একজন করতে হয়, তখন কোনো কাজই মানসম্মতভাবে করা সম্ভব হয় না।

আরও পড়ুনঃ  রিয়াদে মার্কিন দূতাবাসে ড্রোন হামলা, কড়া জবাব দেওয়ার হুঁশিয়ারি ট্রাম্পের

আরও পড়ুন

৪৮তম বিসিএস: জাইল্যা দেশের কী ক্ষতি করল! মেধায় টিকেও ছেলে চাকরি পাবে না…

নিয়োগপ্রক্রিয়ায় দীর্ঘস্থায়ী স্থবিরতা

অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, নিয়োগপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতাই আজকের এই সংকটের প্রধান কারণ। সর্বশেষ ২০২০ সালে ৩৬টি ক্যাটাগরিতে নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছিল। কিন্তু দীর্ঘ পাঁচ বছরে মাত্র ৯টি ক্যাটাগরির নিয়োগ সম্পন্ন হয়েছে। বাকি ২৭টি ক্যাটাগরির নিয়োগপ্রক্রিয়া এখনো ঝুলে আছে। নিজস্ব নিয়োগবিধি না থাকায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে নিয়মিত পদের অনুমোদন নিতে হয়। ২০২২ সালের পর মন্ত্রণালয় থেকে নতুন করে কোনো পদের অনুমোদন না মেলায় ফলাফল তৈরি থাকা সত্ত্বেও লোক নিয়োগ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। পাশাপাশি মামলাসংক্রান্ত জটিলতার কারণেও অনেক পদের নিয়োগ আটকে আছে। স্থানীয় পর্যায়ে খাগড়াছড়ি জেলা পরিষদের মাধ্যমে নিয়োগ হওয়ার কথা থাকলেও আদালতের স্থগিতাদেশের কারণে সেখানেও কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।

নতুন নিয়োগবিধি অনুমোদনের জন্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। সেটি অনুমোদিত হলে শূন্য পদের তালিকা সংগ্রহ শেষে নতুন করে নিয়োগপ্রক্রিয়া শুরু করা সম্ভব হবে।

পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) মীর সাজেদুর রহমান

সংস্কার ও ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ

বর্তমানে স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশনের পক্ষ থেকে ‘প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ও জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তর’ নামে একটি নতুন অধিদপ্তর গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এই পরিকল্পনায় পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরসহ তিনটি দপ্তরকে একীভূত করার কথা বলা হয়েছে। এই প্রস্তাব নিয়ে অধিদপ্তরের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মধ্যে ব্যাপক উদ্বেগ ও সংশয় তৈরি হয়েছে। তাঁদের আশঙ্কা, নতুন কাঠামোয় নিয়োগ বা পদোন্নতি কীভাবে হবে, তা এখনো অস্পষ্ট। এতে বিদ্যমান জনবলসংকট আরও দীর্ঘায়িত হতে পারে। অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে নতুন কোনো নিয়োগ দেওয়ার পরিকল্পনা তাঁদের হাতে নেই। তবে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) মীর সাজেদুর রহমান জানিয়েছেন, একটি নতুন নিয়োগবিধি অনুমোদনের জন্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। সেটি অনুমোদিত হলে ও সারা দেশ থেকে শূন্য পদের তালিকা সংগ্রহের কাজ শেষ হলে নতুন করে নিয়োগপ্রক্রিয়া শুরু করা সম্ভব হবে। তবে জনবলসংকট বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ডা. আশরাফী আহমদ।