কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের একমাত্র সন্তান ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম (১৩) হত্যাকাণ্ডে গ্রেপ্তার আসামিদের নিয়ে নতুন তথ্য সামনে এসেছে।
গ্রেপ্তার মোজাম্মেল হোসেন ফাহাদ ঘটনার মাত্র ১০ দিন আগে অপ্রতিমের বাবার অফিসে বিনা বেতনে চাকরি নিয়েছিলেন বলে জানিয়েছেন কুবির বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. কামরুন নাহাত শীলা। একই সঙ্গে নাহিদা বেগম বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর থাকাকালে মাদকবিরোধী অভিযানে কয়েকজন কিশোর গ্যাং সদস্যকে পুলিশের কাছে সোপর্দ করেছিলেন বলেও জানান তিনি।সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) সকাল সাড়ে ১০টায় কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ আব্দুল কাইয়ুম চত্বরে শিক্ষক সমিতির আয়োজিত মানববন্ধনে এসব তথ্য জানান ড. কামরুন নাহাত শীলা।তিনি বলেন, ‘আমি গতকাল রাত ১২টা পর্যন্ত ম্যাডামের সঙ্গে ছিলাম। তিনি আমাকে কিছু কথা জানিয়েছেন। চারজন অভিযুক্তকে এই মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে একজন ফাহাদ। সে প্রায় ১০ দিন আগে ম্যাডামের স্বামীর অফিসে বিনা বেতনে চাকরি নিয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘ম্যাডাম যখন সহকারী প্রক্টর ছিলেন, তখন এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনা করেছিলেন। ওই সময় কয়েকজন কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যকে পুলিশের কাছে সোপর্দ করেছিলেন। তাদের মধ্যে দুজন তুহিনের কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য ছিল বলে জানা গেছে।’
ড. কামরুন নাহাত শীলা বলেন, অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে এসব ঘটনার কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা তদন্ত করে বের করার দাবি জানিয়েছেন অপ্রতিমের মা ড. নাহিদা বেগম। পাশাপাশি গ্রেপ্তারদের মধ্যে যারা অপ্রাপ্তবয়স্ক বলে দাবি করা হচ্ছে, তারা প্রকৃতপক্ষে অপ্রাপ্তবয়স্ক কি না, তা ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে যাচাইয়ের অনুরোধ জানিয়েছেন তিনি।
এ ছাড়া প্রয়োজনে আইন সংশোধন করে হলেও অপ্রতিম হত্যার সঙ্গে জড়িতদের উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন নাহিদা বেগম।
এর আগে রোববার দুপুরে অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে চারজনকে গ্রেপ্তারের তথ্য জানান কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান। গ্রেপ্তাররা হলেন—সাইফুল ইসলাম তুহিন (১৯), মোজাম্মেল হোসেন ফাহাদ (১৫), মো. কামরুল হাসান এবং মো. সিয়াম (১৯)।
পুলিশের তথ্যমতে, মামলার প্রধান আসামি সাইফুল ইসলাম তুহিন। তিনি কুমিল্লা সিটি কলেজে একাদশ শ্রেণিতে পড়ার সময় ২০২৫ সালে ফেল করে ড্রপআউট হন। বর্তমানে তিনি পড়ালেখা করেন না।
দ্বিতীয় আসামি মোজাম্মেল হোসেন ফাহাদ (১৫) ময়নামতি কারিগরি স্কুল অ্যান্ড কলেজের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী। তৃতীয় আসামি মো. কামরুল হাসান এবং চতুর্থ আসামি মো. সিয়াম (১৯)।
পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান জানান, অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের মূল রহস্য উদ্ঘাটনে জিডির ভিত্তিতে তদন্ত শুরু করে পুলিশ। তদন্তের অংশ হিসেবে ঘটনাস্থল ও আশপাশের এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করা হয়। এতে প্রাথমিকভাবে দেখা যায়, গত ১৮ সেপ্টেম্বর দুপুর ২টা থেকে সোয়া ২টার দিকে তুহিন অপ্রতিমকে সঙ্গে নিয়ে লালমাই পাহাড়ের সানন্দা এলাকার পাহাড়ঘেরা নির্জন জঙ্গলের দিকে যায়।
অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধারের পর সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে তার সঙ্গে থাকা তুহিনকে শনাক্ত করা হয়। পরে তাকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।
পুলিশের দাবি, জিজ্ঞাসাবাদে তুহিন স্বীকার করে, অপ্রতিমের আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে পরিকল্পনা করে তাকে ওই নির্জন স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। তুহিনের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ফাহাদকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। পুলিশ জানায়, ফাহাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে কামরুল হাসানকেও হেফাজতে নেওয়া হয়।
অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের পেছনে মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যই ছিল, নাকি এর সঙ্গে অন্য কোনো কারণ বা পূর্ববিরোধের যোগসূত্র রয়েছে তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে।
তদন্তাধীন এই ঘটনায় গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ায় নির্ধারিত হবে।