
রাজধানীর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও আশপাশের এলাকায় সংঘবদ্ধ ডাকাত চক্রের তৎপরতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয় ব্যবহার করে লোকজনকে গাড়ি থেকে নামিয়ে জিম্মি করা, মারধর এবং অর্থ-সম্পদ লুটে নেওয়ার মতো অপরাধের অভিযোগ উঠেছে কয়েকটি চক্রের বিরুদ্ধে।
পুলিশের বরাতে প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, এসব ঘটনায় জড়িত কিছু ব্যক্তি নির্দিষ্ট অর্থের বিনিময়ে ডাকাতিতে অংশ নেন। অপরাধ সংঘটনের পর কেউ ঢাকার বাইরে চলে যান, আবার কেউ প্রত্যন্ত এলাকায় আত্মগোপন করেন। এমনকি বিদেশে বসবাস করেন—এমন এক ব্যক্তির বিরুদ্ধেও দেশে এসে ডাকাতিতে অংশ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
প্রতিবেদনে পাবনার চাটমোহরের বাসিন্দা মো. শহিদুল ইসলামের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন এলাকায় ডাকাতিসহ একাধিক মামলা থাকার কথা জানিয়েছে পুলিশ। সিরাজগঞ্জের তাড়াশে তাঁর একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, শহিদুলের সঙ্গে আরও কয়েকজন কাজ করেন। তাঁদের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পোশাক ও বিভিন্ন সরঞ্জাম ব্যবহার করে ডাকাতির অভিযোগ রয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ২৩ জুলাই উত্তরা পশ্চিম থানা এলাকায় এক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ১৫ লাখ টাকা লুটের ঘটনায় এ চক্রের সদস্যদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় তাঁদের ভাড়া করার পেছনে রতন চৌধুরী ওরফে ডালিমের নামও উল্লেখ করেছে পুলিশ।
তবে এসব অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা বিচারিক প্রক্রিয়ায় নির্ধারিত হবে।
বিমানবন্দর এলাকায় ডাকাতির সঙ্গে জড়িত সন্দেহভাজনদের মধ্যে মো. জলিল মোল্লা নামে আরেক ব্যক্তির কথা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। তাঁর বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন থানায় পাঁচটি ডাকাতির মামলা রয়েছে বলে পুলিশি তথ্যের বরাতে জানানো হয়েছে।
এ ধরনের ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা থাকার বিষয়টি অপরাধ তদন্ত ও প্রতিরোধের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে মামলার সংখ্যা থাকলেই কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে—এমনটি বলা যায় না।
প্রতিবেদনে বাগেরহাটের বাসিন্দা সৈয়দ নাসির উদ্দিনের নামও উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি ফ্রান্সে বসবাস করেন বলে সংবাদে বলা হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি ভারত হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে একটি চক্রের সঙ্গে ডাকাতিতে অংশ নিতেন এবং পরে একই পথে বিদেশে ফিরে যেতেন।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, উত্তরায় একটি স্বর্ণের দোকানে ডাকাতির ঘটনার তদন্তে নাসিরকে গ্রেপ্তার করেছে গোয়েন্দা পুলিশ। তাঁর সঙ্গে শ্যালক শামীমসহ আরও কয়েকজনের সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে।
তবে তাঁর বিদেশযাত্রা, দেশে প্রবেশ এবং বিভিন্ন ঘটনায় সম্পৃক্ততার বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য সংশ্লিষ্ট তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
পুলিশের তথ্যের বরাতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিমানবন্দরকেন্দ্রিক কয়েকটি চক্র নির্দিষ্ট অর্থের বিনিময়ে ডাকাতিতে অংশ নেয়। সাধারণ ডাকাতির ঘটনায় পাঁচ থেকে দশ লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। চোরাচালানের মাধ্যমে দেশে আসা স্বর্ণের বড় চালান লক্ষ্য করে পরিচালিত অভিযানে আরও বেশি অর্থ লেনদেন হতে পারে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ধরনের অভিযোগ সত্য হলে তা শুধু ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্য নয়, বিমানবন্দরকেন্দ্রিক যাত্রী চলাচল ও ব্যবসায়িক লেনদেনের ক্ষেত্রেও গুরুতর উদ্বেগের বিষয়।
প্রতিবেদনে অতীতের একটি ঘটনার বিবরণও তুলে ধরা হয়েছে। ২০২৪ সালের ৬ এপ্রিল সিঙ্গাপুর যাওয়ার উদ্দেশ্যে বিমানবন্দরে পৌঁছানো কুষ্টিয়ার রাশেদুল ইসলামকে লক্ষ্য করে ডাকাতির অভিযোগ ওঠে।
সংবাদ অনুযায়ী, ফ্লাইটের আগে প্রয়োজনীয় কাজ সারতে তিনি একটি বাসে ওঠেন। পরে বাসের দরজা বন্ধ করে যাত্রীবেশে থাকা কয়েকজন তাঁর চোখ-মুখ বেঁধে মারধর করেন এবং সঙ্গে থাকা মূল্যবান জিনিসপত্র নিয়ে যান। পরে তাঁকে রাজধানীর জসিমউদ্দীন গোলচত্বরের কাছে নামিয়ে দেওয়া হয়।
এ ঘটনা বিমানবন্দরগামী যাত্রীদের যাতায়াতের ক্ষেত্রে সতর্কতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তাকে সামনে নিয়ে আসে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা উত্তরা বিভাগের উপকমিশনার মো. ইলিয়াস কবিরের বক্তব্য অনুযায়ী, বিমানবন্দর ও উত্তরা এলাকায় অপরাধ সংঘটনের পর অভিযুক্ত ব্যক্তিরা দ্রুত ঢাকার বাইরে চলে যান। তাঁদের গ্রেপ্তারের পর কেউ কেউ অল্প সময়ের মধ্যে জামিনে বেরিয়ে আবার অপরাধে জড়ানোর ঘটনাও রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তবে পুলিশের তৎপরতায় এ ধরনের ডাকাতির ঘটনা অনেকাংশে কমেছে বলেও জানান তিনি।
অন্যদিকে, স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক উইং কমান্ডার এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী জানিয়েছেন, বিমানবন্দর ও আশপাশের এলাকায় ডাকাতি, ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধ প্রতিরোধে নিয়মিত গোয়েন্দা নজরদারি, টহল ও অভিযান চালানো হয়।
বিমানবন্দর এলাকায় যাতায়াতের সময় অপরিচিত ব্যক্তির প্রস্তাবে অনিরাপদ যানবাহনে ওঠা থেকে বিরত থাকা, সন্দেহজনক পরিস্থিতিতে দ্রুত পুলিশের সহায়তা নেওয়া এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয় দেওয়া ব্যক্তির পরিচয় যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ।
একই সঙ্গে সংঘবদ্ধ অপরাধ দমনে গোয়েন্দা নজরদারি, বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয় এবং মামলার তদন্ত দ্রুত সম্পন্ন করার বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।