
ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গায় জমি নিয়ে বিরোধের সালিস বৈঠকে গ্রামের বাইরে থেকে আত্মীয়-স্বজন নিয়ে আসার অভিযোগে একটি পরিবারকে সমাজচ্যুত (একঘরে) করে রাখার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় মাতুব্বরদের বিরুদ্ধে। শুধু সামাজিকভাবে বয়কট নয়, ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যদের স্থানীয় মসজিদে গিয়ে নামাজ আদায়েও নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন পরিবারের সদস্যরা।
ঘটনাটি ঘটেছে আলফাডাঙ্গা পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের চর নওয়াপাড়া গ্রামে। ভুক্তভোগী পরিবারটি প্রয়াত আব্দুর রফিক শেখের। তাঁর তিন ছেলে তারেক শেখ, ওবায়দুর শেখ ও খালিদ শেখ বর্তমানে সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন বলে পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, আব্দুর রফিক শেখের পরিবারের সঙ্গে প্রতিবেশী ওসমান গণির দীর্ঘদিন ধরে জমি নিয়ে বিরোধ চলে আসছিল। এ বিরোধ মীমাংসার জন্য গত ২৪ জুলাই গ্রামে প্রথম দফায় সালিস বৈঠক বসে। ওই বৈঠকে কোনো সমাধান না হওয়ায় ৩০ জুলাই দ্বিতীয় দফায় সালিস অনুষ্ঠিত হয়।
পরিবারটির অভিযোগ, সালিসে নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরতে তারা গ্রামের বাইরে থাকা কয়েকজন আত্মীয়-স্বজনকে নিয়ে আসেন। এ বিষয়টি স্থানীয় মাতুব্বররা ভালোভাবে নেননি। এর জেরে মাতুব্বর আবুল সরকার ও তাজ মোহাম্মদের নেতৃত্বে ৩১ জুলাই একটি বৈঠক হয়।
পরে ২১ আগস্ট সন্ধ্যায় চর নওয়াপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠে আবারও সভা ডেকে রফিক শেখের পুরো পরিবারকে সমাজচ্যুত করার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয় বলে অভিযোগ। ওই রাতেই পরিবারের ছোট ছেলে খালিদ শেখকে বিষয়টি জানিয়ে দেওয়া হয়। পরদিন ওই সভার ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে এলাকায় বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়।
ভুক্তভোগী খালিদ শেখ বলেন, ‘সালিসে আমরা আমাদের আত্মীয়-স্বজনদের এনেছিলাম। শুধু এই কারণে আমাদের পরিবারকে সমাজচ্যুত করা হয়েছে। মাতুব্বররা গ্রামের মানুষকে আমাদের সঙ্গে কথা বলতে নিষেধ করেছেন। কোনো সামাজিক অনুষ্ঠানে তো দূরের কথা, মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়তেও বাধা দেওয়া হচ্ছে। বাধ্য হয়ে আমরা অন্য গ্রামে গিয়ে নামাজ পড়ছি।’
প্রয়াত আব্দুর রফিক শেখের স্ত্রী শিমুল বেগম বলেন, ‘আমাদের একঘরে করে রাখা হয়েছে। কারও সঙ্গে কথা বলতে পারছি না। আমার ছেলেরা চরম আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।’
অভিযোগের বিষয়ে সমাজপতি আবুল সরকার বলেন, গ্রামের বিষয় নিয়ে সালিস হলেও রফিক শেখের পরিবারের লোকজন কাউকে না জানিয়ে ৩০ থেকে ৪০ জন বহিরাগত নিয়ে এসেছিলেন। এ কারণে মহল্লার সবাই মিলে তাদের সঙ্গে সামাজিক সম্পর্ক না রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। পরে তারা তাঁর কাছে এসেছিলেন এবং তিনি গ্রামবাসীর কাছে ভুল স্বীকার করতে বলেছিলেন বলেও দাবি করেন তিনি।
এদিকে আলফাডাঙ্গা পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর আজিজুল তালুকদার বলেন, জমি পরিমাপের সময় তিনি সালিসে উপস্থিত ছিলেন। তবে পরবর্তী সময়ে পরিবারটিকে সমাজচ্যুত করার সিদ্ধান্ত সম্পর্কে তাঁকে কিছু জানানো হয়নি।
ঘটনাটিকে বেআইনি ও মানবাধিকারবিরোধী বলে মন্তব্য করেছেন আলফাডাঙ্গা পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হাসিবুল হাসান হাসিব। তিনি বলেন, বর্তমান সময়ে এভাবে কাউকে একঘরে করা বেআইনি ও মানবাধিকারের পরিপন্থী। বিষয়টির সত্যতা যাচাই করে দ্রুত সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
আলফাডাঙ্গা থানার ওসির দায়িত্বে থাকা পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) মোহাম্মদ আল-আমিন বলেন, বিষয়টি সম্পর্কে এখনো বিস্তারিত জানা নেই। ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত করে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। দেশের প্রচলিত আইনের বাইরে গিয়ে বিচার করার অধিকার কারও নেই।