
জন্মাষ্টমী উপলক্ষে দেশের সব নাগরিককে ধর্মীয় সম্প্রীতি, সহনশীলতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার বন্ধন আরও সুদৃঢ় করার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, রাষ্ট্র ও সমাজে কোনো ধরনের বিভেদ-বৈষম্য সৃষ্টি না করে দল-মত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাইকে নিজেদের বাংলাদেশি পরিচয়ে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।
বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) সকাল ১০টায় রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে জন্মাষ্টমী উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বক্তৃতায় এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় ‘সংখ্যালঘু’ বা ‘সংখ্যাগুরু’ পরিচয় মুখ্য বিষয় নয়। একটি রাষ্ট্র ও সমাজে বিভিন্ন ধর্ম ও মতের মানুষের সম্মিলনই বৈচিত্র্যময় সমাজের সৌন্দর্য। তিনি বলেন, দেশের বাইরে গেলে বিভিন্ন দেশের মানুষের কাছে পরিচয়ের ভিন্নতা তৈরি হলেও নিজেদের জাতীয় পরিচয়ই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, ‘সংখ্যালঘু কিংবা সংখ্যাগুরু নয়, আসুন সবাই নিজেদের বাংলাদেশি ভাবি।’ রাষ্ট্র ও সমাজে দল-মত, ধর্ম-বর্ণ কিংবা কোনো পরিচয় যেন মানুষের মধ্যে বিভেদ ও বৈষম্য সৃষ্টির কারণ না হয়।
জন্মাষ্টমীর তাৎপর্য তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, হিন্দু ধর্মীয় শাস্ত্রমতে কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী তিথিতে সনাতন ধর্মের অবতার শ্রীকৃষ্ণ জন্মগ্রহণ করেন। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস অনুযায়ী, প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার বছর আগে মথুরায় তার জন্ম হয়। সে সময় মথুরার শাসক ছিলেন নিষ্ঠুর ও অত্যাচারী স্বৈরশাসক কংস। শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাবের পর কংসের পতন ঘটে। দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালন ছিল শ্রীকৃষ্ণের অন্যতম ব্রত বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রসঙ্গ টেনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, গণতন্ত্রকামী জনগণের অধিকার কেড়ে নিয়ে কংসের মতো এক নিষ্ঠুর শাসক দীর্ঘ সময় জনগণের কাঁধে চেপে বসেছিল। দল-মত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে দেশের গণতন্ত্রকামী জনগণ হাজারো প্রাণের বিনিময়ে সেই কংসরূপী ফ্যাসিস্টদের পতন ঘটিয়েছে। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে আবারও গণতন্ত্রের যাত্রা শুরু হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ভঙ্গুর অর্থনীতি, বিভাজিত প্রশাসন ও অবনতিশীল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটিয়ে এখন দেশ পুনর্গঠনের পালা।
তিনি বলেন, বাংলাদেশে আবহমানকাল থেকেই দল-মত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষ একে অপরের সঙ্গে মিলেমিশে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতি বজায় রেখে নিজ নিজ ধর্ম ও সংস্কৃতি পালন করে আসছে। তবে সময়ে সময়ে কিছু মানুষ রাষ্ট্র ও সমাজে বিভেদ-বিরোধ সৃষ্টি জিইয়ে রাখার অপচেষ্টা চালিয়েছে।
সমাজবিরোধী কোনো অপশক্তি যাতে আর মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে এবং কেউ যেন বিরাজমান সম্প্রীতির পরিবেশ নষ্ট করতে না পারে, সে জন্য সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, সমাজে পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির বন্ধন অটুট রাখা নাগরিক হিসেবে সবার দায়িত্ব।
জন্মাষ্টমী উপলক্ষে দেশের মানুষের প্রতি আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ধর্মীয় সম্প্রীতি, সহনশীলতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সৌহার্দ্য-সম্প্রীতির বন্ধন আরও সুদৃঢ় করতে হবে।
দেশকে অস্থিতিশীল করতে নানা ধরনের গুজব ছড়ানোর বিষয়েও সতর্ক করেন তিনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে কেউ কেউ মানুষকে উসকানি দেওয়ার অপচেষ্টা করছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কোনো ধরনের সাম্প্রদায়িক উসকানি কিংবা বিদ্বেষ যেন সমাজে অস্থিরতা সৃষ্টি করতে না পারে, সে বিষয়ে সবাইকে সজাগ থাকতে হবে। প্রতিটি নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার অঙ্গীকারবদ্ধ বলেও জানান তিনি।
সমৃদ্ধ ও স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়তে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে নাগরিকদের ক্ষমতায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ লক্ষ্যেই সরকার ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, স্পোর্টস কার্ড এবং সব ধর্মের ধর্মীয় গুরুদের জন্য সম্মানী ভাতাসহ বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করছে।
তিনি বলেন, সরকার এমন একটি কল্যাণমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায়, যেখানে দল-মত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে দেশের নাগরিকরা প্রয়োজন অনুযায়ী রাষ্ট্রীয় সহায়তা পাবেন। একই সঙ্গে নাগরিকরাও রাষ্ট্রের প্রতি নিজেদের দায়িত্ব পালন করবেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, রাষ্ট্র, সরকার ও নাগরিকদের মধ্যকার পারস্পরিক দায়িত্ব, আস্থা ও আলাপের মাধ্যমেই সবার কাঙ্ক্ষিত কল্যাণরাষ্ট্র গড়ে উঠবে। এই রাষ্ট্র ও সমাজে কেউ যাতে পিছিয়ে না থাকে, তা নিশ্চিত করতে সরকার বদ্ধপরিকর।
তিনি আরও বলেন, ‘এই দেশ আপনার, আমার, আমাদের সকলের। নাগরিক হিসেবে এই দেশে আপনার-আমার-আমাদের সবার অধিকার সমান।’ নিজ নিজ ধর্মীয় বিশ্বাস ও সংস্কৃতি অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করা প্রত্যেক নাগরিকের সাংবিধানিক মৌলিক অধিকার বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার।’ ধর্মীয় বিশ্বাস যার যার হলেও নিরাপত্তা পাওয়ার অধিকার সবার সমান।
জন্মাষ্টমীর শুভেচ্ছা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, শুভ জন্মাষ্টমীর উৎসবের পরই দেশের সামনে আসন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসব দুর্গাপূজা। দেশের সব মানুষ যেন শান্তি, স্বস্তি ও নিরাপত্তার সঙ্গে নিজ নিজ ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসব পালন করতে পারেন—এ প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তিনি। পাশাপাশি দেশের সনাতন ধর্মাবলম্বীদের জন্মাষ্টমীর শুভেচ্ছা জানানোর সঙ্গে দুর্গোৎসবেরও আগাম শুভেচ্ছা জানান প্রধানমন্ত্রী।