
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টিকটকে পরিচয় হওয়া কয়েকজন তরুণের সঙ্গে নতুন জীবন শুরু করার আশায় বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে পড়ে কুমিল্লার চার স্কুলছাত্রী। তাদের মধ্যে তিনজন পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী এবং অন্যজন তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে। গত সোমবার সকালে বিদ্যালয়ে যাওয়ার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর তারা প্রথমে ঢাকায় যায়। সেখানে থাকার ব্যবস্থা করতে না পেরে পরে হবিগঞ্জের চুনারুঘাটে পৌঁছায়। শেষ পর্যন্ত এক অটোরিকশাচালকের সন্দেহ ও পুলিশের তৎপরতায় তাদের উদ্ধার করা হয়।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, উদ্ধার হওয়া তিন ছাত্রীর বয়স ১২, ১২ ও ১৩ বছর। অপর শিশুটির বয়স আট বছর। তারা সবাই কুমিল্লা নগরের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী।
পুলিশ জানায়, টিকটকে ভিডিও প্রকাশ ও সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে কয়েকজন তরুণের সঙ্গে ওই শিক্ষার্থীদের পরিচয় গড়ে ওঠে। একপর্যায়ে তাদের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ ও ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। তবে পরিচিত তরুণদের প্রকৃত ঠিকানা সম্পর্কে তাদের স্পষ্ট ধারণা ছিল না।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তৈরি হওয়া ধারণা ও কল্পনা থেকে তারা বাড়ি ছেড়ে স্বাধীনভাবে জীবনযাপনের সিদ্ধান্ত নেয়। তাদের পরিকল্পনা ছিল ঢাকায় গিয়ে উপার্জন করা এবং পরিচিত তরুণদের সঙ্গে নতুন জীবন শুরু করা।
এ জন্য তারা বাড়ি থেকে স্বর্ণালংকার ও মুঠোফোনসহ পরিবারের কিছু মূল্যবান জিনিস সঙ্গে নেয়। দুই বোনের একজন পরিবারের একটি অ্যান্ড্রয়েড ফোন কুমিল্লার টাউন হল মার্কেটের একটি দোকানে চার হাজার টাকায় বিক্রি করে। পরে সেই টাকা নিয়ে তারা ঢাকার উদ্দেশে রওনা হয়।
একই পরিবারের দুই বোনের মধ্যে বড় বোন বাড়ি ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিলে ছোট বোনও বিষয়টি জেনে যায়। ছোট বোনকে সঙ্গে না নিলে বাবা-মাকে জানিয়ে দেওয়ার কথা বলায় তাকেও সঙ্গে নেওয়া হয় বলে পুলিশ জানিয়েছে।
পুলিশের তথ্যমতে, সোমবার সকালে বাড়ি থেকে বেরিয়ে চার শিক্ষার্থী বেলা ১১টার মধ্যে ঢাকায় পৌঁছায়। সেখানে বাসা ভাড়া নিয়ে থাকার চেষ্টা করলেও বয়স কম হওয়ায় তারা বাসা পায়নি। এরপর তারা হবিগঞ্জের চুনারুঘাটে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। তাদের একজনের দাদাবাড়ি ওই এলাকায়।
রাতের অন্ধকারে সেখানে পৌঁছে তারা নির্দিষ্ট ঠিকানা খুঁজে পাচ্ছিল না। এ সময় একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে বিভিন্ন স্থানে ঘুরতে থাকে তারা। শিশুদের আচরণ ও পরিস্থিতি দেখে চালকের সন্দেহ হয়। পরে তিনি বিষয়টি স্থানীয় পুলিশকে জানান।
খবর পেয়ে পুলিশ সোমবার দিবাগত রাত দুইটার দিকে চুনারুঘাট এলাকা থেকে চার শিশুকে উদ্ধার করে। তাদের কাছ থেকে স্বর্ণালংকারও উদ্ধার করা হয়। এ ছাড়া কুমিল্লা থেকে বিক্রি করা মুঠোফোনটি গোয়েন্দা পুলিশ উদ্ধার করেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান বুধবার সংবাদ সম্মেলনে জানান, সোমবার সকালে বিদ্যালয়ে যাওয়ার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হলেও চার শিক্ষার্থীর কেউ শ্রেণিকক্ষে উপস্থিত হয়নি। বিকেলে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বিষয়টি জানতে পেরে পুলিশকে জানায়। পরে গোয়েন্দা পুলিশ ও কোতোয়ালি মডেল থানার সদস্যরা অনুসন্ধান শুরু করেন। এ ঘটনায় পরিবারের সদস্যরাও থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন।
তদন্তের অংশ হিসেবে পুলিশ বিভিন্ন স্থানের সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ করে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের ছবি ও পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য দেশের বিভিন্ন থানায় পাঠানো হয়। পরে হবিগঞ্জের চুনারুঘাট থানা-পুলিশের সহযোগিতায় তাদের অবস্থান শনাক্ত করে উদ্ধার করা সম্ভব হয়।
পুলিশ সুপার জানান, অটোরিকশাচালকের দায়িত্বশীল ভূমিকা শিশুদের দ্রুত উদ্ধার করতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে।
এ ধরনের ঘটনা এড়াতে সন্তানদের প্রতি আরও যত্নশীল হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন পুলিশ সুপার আনিসুজ্জামান। তাঁর মতে, সন্তান কখন কোথায় যাচ্ছে, কীভাবে সময় কাটাচ্ছে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কার সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে, সেসব বিষয়ে অভিভাবকদের সচেতন থাকা প্রয়োজন।
তিনি সন্তানদের পর্যাপ্ত সময় দেওয়া, তাদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা এবং অনলাইন কার্যক্রম সম্পর্কে খোঁজখবর রাখার ওপর গুরুত্ব দেন। পরিবারের সঙ্গে সন্তানের সুসম্পর্ক এবং যথাযথ তদারকি থাকলে এ ধরনের ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব বলে তিনি মনে করেন।
এ ঘটনায় থানায় করা সাধারণ ডায়েরির ভিত্তিতে পরবর্তী আইনগত প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।