দেশি নাগরিকত্ব, বিদেশি রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য’ এবং তাদের নিয়োগ ও শপথের সাংবিধানিক বৈধতা যাচাই চেয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আইনি নোটিস দেওয়া হয়েছে।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী আসলাম মিয়া মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) প্রধান নির্বাচন কমিশনার, মন্ত্রিপরিষদ সচিব, রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের সচিব, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব, আইন মন্ত্রণালয়ের সচিব, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে এ নোটিস পাঠান। নোটিসে সাত দিনের মধ্যে জবাব দিতে বলা হয়েছে।
আসলাম মিয়া বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সন্তোষজনক জবাব না পেলে তিনি উচ্চ আদালতে রিট মামলা করবেন।
তিনি জানান, খলিলুর রহমান ও হুমায়ুন কবিরের বিদেশি নাগরিকত্ব নিয়ে বিভিন্ন আলোচনা ও সংবাদ প্রকাশের বিষয়টি তার নজরে এসেছে। বিষয়টি সাংবিধানিক ও জনগুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় তিনি আইনি নোটিস দিয়েছেন।
নোটিসে বাংলাদেশের সংবিধানের ৫৬(২) অনুচ্ছেদ উল্লেখ করে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রী নিয়োগের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক ক্ষমতা রয়েছে। একই সঙ্গে সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার যোগ্যতার বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে।
সংবিধানের ৬৬(২)(গ) অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব অর্জন করলে কিংবা বিদেশি রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য স্বীকার বা স্বীকৃতি দিলে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার বা সংসদ সদস্য থাকার যোগ্য হন না। তবে ৬৬(২এ)-তে দ্বৈত নাগরিকত্বের ক্ষেত্রে বিদেশি নাগরিকত্ব ত্যাগের বিষয়ে বিশেষ বিধান রয়েছে।
এই বিধানের আলোকে নোটিসে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের নাগরিকত্বের বর্তমান অবস্থা, তিনি কখনো বিদেশি নাগরিকত্ব নিয়েছেন কি না, কোনো বিদেশি পাসপোর্ট ধারণ করেছেন বা করেন কি না এবং বিদেশি নাগরিকত্ব নিয়ে থাকলে তা ত্যাগ করেছেন কি না—এসব তথ্য যাচাইয়ের দাবি জানানো হয়েছে। বিদেশি নাগরিকত্ব ত্যাগ করে থাকলে তারিখ ও সংশ্লিষ্ট নথিও জানতে চাওয়া হয়েছে।
নোটিসে বলা হয়েছে, খলিলুর রহমান গত ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন। তাই নিয়োগ ও শপথের সময় তিনি সাংবিধানিক সব শর্ত পূরণ করেছিলেন কি না, তা যাচাই করা প্রয়োজন।
তবে খলিলুর রহমান এর আগে প্রকাশ্যে বিদেশি নাগরিকত্ব থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। ২০২৫ সালের ২১ মে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, তার একমাত্র জাতীয়তা বাংলাদেশি। একই সঙ্গে তিনি কোনো আমেরিকান পাসপোর্ট নেই এবং বাংলাদেশ ছাড়া অন্য কোনো দেশের জাতীয়তা নেই বলেও জানান।
অন্যদিকে প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির গত ২১ আগস্ট শপথ নেন। তার ব্রিটিশ নাগরিকত্ব থাকার বিষয়ে ওঠা প্রশ্ন যাচাইয়ের দাবি জানানো হয়েছে নোটিসে। প্রতিমন্ত্রী হওয়ার আগে তিনি ব্রিটিশ নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছিলেন কি না, করে থাকলে কবে করেছিলেন এবং ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ তা কবে গ্রহণ করেছে—এসব তথ্যও চাওয়া হয়েছে।
হুমায়ুন কবিরের ব্রিটিশ নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পর গত ২৪ আগস্ট সাংবাদিকরা তাকে এ বিষয়ে প্রশ্ন করেন। তবে তিনি বিষয়টি স্পষ্ট করেননি। পরদিন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, হুমায়ুন কবিরকে প্রতিমন্ত্রী নিয়োগে আইনের কোনো ব্যত্যয় হয়নি।
নোটিসে সংবিধানের ১৪৮(১) অনুচ্ছেদের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। এ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, নির্দিষ্ট সাংবিধানিক পদে নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিকে দায়িত্ব গ্রহণের আগে নির্ধারিত শপথ বা ঘোষণা করতে হয়। মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীর শপথে বাংলাদেশের প্রতি সত্য বিশ্বাস ও আনুগত্য এবং সংবিধান সংরক্ষণ, সুরক্ষা ও প্রতিরক্ষার অঙ্গীকার রয়েছে।
এ কারণে নোটিসে দুই মন্ত্রীর বিদেশি রাষ্ট্রের প্রতি কোনো শপথ, ঘোষণা বা আনুগত্যের স্বীকৃতি রয়েছে কি না, সেটিও যাচাই করতে বলা হয়েছে।
আইনজীবী আসলাম মিয়া বলেন, “তিনি আসলে নাগরিকত্ব বাতিল করেছেন কি না, সেটা প্রমাণ করুন। আমরা এর আইনি ব্যাখ্যা চাচ্ছি।”
নোটিসে দ্বৈত নাগরিকত্ব নিয়ে ২০২৩ সালের একটি রিট মামলার প্রসঙ্গও তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে বিদেশি নাগরিকত্ব ত্যাগের প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হওয়ার গুরুত্বের বিষয়টি আলোচিত হয়েছিল বলে নোটিসে উল্লেখ করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দুই ব্যক্তির নাগরিকত্ব ও জাতীয়তার নথি, বিদেশি পাসপোর্ট, বিদেশি নাগরিকত্ব গ্রহণ বা ত্যাগের নথি এবং বিদেশি রাষ্ট্রের প্রতি কোনো শপথ, ঘোষণা বা আনুগত্যের স্বীকৃতি থাকলে তার তথ্য যাচাই করতে বলা হয়েছে।
নোটিসে আরও বলা হয়েছে, কোনো সাংবিধানিক অযোগ্যতা পাওয়া গেলে সংবিধান ও আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। আর অযোগ্যতা না থাকলে তাদের নিয়োগ ও দায়িত্বে বহাল থাকার আইনগত ও সাংবিধানিক ভিত্তি জানাতে হবে।
আইনজীবী আসলাম মিয়ার দাবি, নোটিসটি কোনো মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রীর বিরুদ্ধে চূড়ান্ত অভিযোগ নয়। নাগরিকত্ব, বিদেশি রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য এবং সাংবিধানিক যোগ্যতার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে যাচাই করাই এর উদ্দেশ্য।