সিলেট নগরে নিজ বাসা থেকে উদ্ধার হওয়া চিকিৎসক পদ্মজিৎ চক্রবর্তী প্রান্তের (৩১) মরদেহের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে। মঙ্গলবার দুপুরে ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ পরিবারের সদস্যদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে স্বজনরা মরদেহ মৌলভীবাজারে গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যান। সেখানে ধর্মীয় রীতিনীতি অনুযায়ী তার শেষকৃত্য সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে।
পদ্মজিৎ চক্রবর্তী প্রান্ত মৌলভীবাজার সদর উপজেলার সাবিয়া গ্রামের বাসিন্দা। তিনি ওই গ্রামের পূর্ণেন্দ্র চক্রবর্তীর ছেলে। পেশাগত জীবনে তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়া মেডিকেল কলেজের চিকিৎসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।
সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) দুপুরে সিলেট নগরের মির্জাজাঙ্গাল এলাকার স্বপ্নিল-২০ নম্বর বাসা থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে বাসার দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে। পরে জানালার গ্রিলের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় প্রান্তের মরদেহ দেখতে পাওয়া যায়।
ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর থেকেই চিকিৎসকের মৃত্যুকে ঘিরে নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে নতুন বাসায় ওঠার পরদিনই তার এমন অস্বাভাবিক মৃত্যু হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে স্বজনদের মধ্যে সন্দেহ ও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
পুলিশ অবশ্য প্রাথমিকভাবে ঘটনাটিকে আত্মহত্যা হিসেবে ধারণা করছে। তবে একই সঙ্গে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে কোনো মন্তব্য করতে চাইছে না আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
পারিবারিক ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রান্ত সম্প্রতি সিলেট নগরের মির্জাজাঙ্গাল এলাকার ওই বাসায় ওঠেন। সেখানে ওঠার পরদিনই তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ কারণে স্বাভাবিকভাবেই ঘটনাটি নিয়ে পরিবারের সদস্য ও স্বজনদের মধ্যে বিভিন্ন প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
স্বজনদের কয়েকজনের দাবি, প্রান্ত ছিলেন শারীরিকভাবে সুস্থ-সবল এবং প্রাণবন্ত একজন তরুণ। তাকে জানালার গ্রিলের সঙ্গে ফাঁস লাগানো অবস্থায় পাওয়ার বিষয়টি তাদের কাছে সহজে গ্রহণযোগ্য মনে হচ্ছে না।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন স্বজন বলেন, প্রান্তের মতো সুঠাম দেহের একজন তরুণ কী পরিস্থিতিতে জানালার গ্রিলের সঙ্গে ঝুলে আত্মহত্যা করতে পারেন, সেটি তাদের কাছে পরিষ্কার নয়। নতুন বাসায় ওঠার পরদিনই কেন তিনি এমন সিদ্ধান্ত নেবেন, সেই প্রশ্নেরও উত্তর খুঁজছেন তারা।
তবে স্বজনদের এসব সন্দেহের কোনোটি এখনো তদন্তের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়নি।
পরিবারের সদস্য ও ঘনিষ্ঠ স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, পদ্মজিৎ চক্রবর্তী প্রান্ত ছিলেন হাসিখুশি ও প্রাণচঞ্চল স্বভাবের মানুষ। তার এমন মৃত্যু পরিবার ও পরিচিতজনদের মধ্যে গভীর শোকের সৃষ্টি করেছে।
মৌলভীবাজারে প্রান্তের পরিবারের সামাজিকভাবে ভালো পরিচিতি রয়েছে। স্থানীয়ভাবে তাদের বাড়িটি ‘ভটের বাড়ি’ বা ‘ব্রাহ্মণ বাড়ি’ নামে পরিচিত বলে জানিয়েছেন স্বজনরা।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, প্রান্তরা দুই ভাই-বোন। কয়েক বছর আগে তাদের মা মারা যান। তার ছোট বোন এখনো অবিবাহিত। পরিবারের একজন তরুণ সদস্যের এমন আকস্মিক মৃত্যুতে স্বজনদের মধ্যে শোকের পাশাপাশি নানা প্রশ্নও তৈরি হয়েছে।
প্রান্তের মৃত্যুর পর কয়েকটি গণমাধ্যমে কোতোয়ালি থানার ওসির বরাত দিয়ে এমন তথ্য প্রকাশিত হয় যে, এর আগে তার বোনও আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন।
তবে পরিবারের স্বজনরা এ তথ্য সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন। তাদের দাবি, প্রান্তের পরিবারের কোনো সদস্য এর আগে আত্মহত্যা করেননি এবং আত্মহত্যার চেষ্টার ঘটনাও ঘটেনি।
স্বজনদের ভাষ্য, এমন একটি তথ্য প্রকাশের ফলে পরিবারটি আরও বিব্রত ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়েছে। তারা বিষয়টি সঠিকভাবে যাচাই করে সংবাদ প্রকাশের অনুরোধ জানিয়েছেন।
এদিকে প্রান্তের ব্যক্তিগত জীবন নিয়েও বিভিন্ন তথ্য সামনে এসেছে। স্বজনদের একটি সূত্র দাবি করেছে, স্ত্রীর সঙ্গে তার কিছুটা মনোমালিন্য চলছিল। তবে এ তথ্যের স্বাধীনভাবে সত্যতা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
প্রান্তের স্ত্রীও একজন চিকিৎসক। তার বাড়ি ঢাকায় এবং তিনি সিলেটের একটি বেসরকারি হাসপাতালে কর্মরত বলে জানা গেছে। প্রায় দুই বছর আগে তাদের বিয়ে হয়।
স্ত্রীর সঙ্গে কোনো বিরোধ বা পারিবারিক বিষয় প্রান্তের মৃত্যুর সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল কি না, সেটিও তদন্তের বিষয়। এ বিষয়ে প্রান্তের স্ত্রীর বক্তব্য জানা যায়নি।
জানা গেছে, সোমবার দুপুরে প্রান্তের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেন তার স্ত্রী। কিন্তু তাকে ফোনে পাওয়া যাচ্ছিল না। বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে তিনি মৌলভীবাজারে থাকা প্রান্তের স্বজনদের জানান।
পরে বিষয়টি পুলিশকে অবহিত করা হলে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। বাসার দরজা বন্ধ থাকায় পুলিশ সেটি ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে এবং প্রান্তের মরদেহ উদ্ধার করে।
পরে প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া শেষে মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়। মঙ্গলবার দুপুরে ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হওয়ার পর মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
মঙ্গলবার বিকেল পর্যন্ত এ ঘটনায় থানায় কোনো অভিযোগ বা মামলা দায়ের করা হয়নি বলে জানা গেছে।
পুলিশ বলছে, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর তদন্তের পরবর্তী ধাপ নির্ধারণ করা হবে। মৃত্যুর ঘটনাটি আত্মহত্যা, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো কারণ রয়েছে—তদন্তের মাধ্যমে সেটি পরিষ্কার হওয়ার কথা।
সিলেট মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (গণমাধ্যম) মো. মনজুরুল আলম জানিয়েছেন, চিকিৎসক পদ্মজিৎ চক্রবর্তী প্রান্তের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হওয়ার পর মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। তবে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন এখনো পুলিশের হাতে পৌঁছেনি।
স্বজনদের পক্ষ থেকে জানালার গ্রিলের সঙ্গে ঝুলে আত্মহত্যা করার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তোলার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিষয়টি তদন্তাধীন। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা সম্ভব নয়।
এর আগে কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খান মুহাম্মদ মাইনুল জাকির জানিয়েছিলেন, প্রাথমিকভাবে ঘটনাটি আত্মহত্যা বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে তদন্ত এবং ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার আগে বিষয়টি নিশ্চিত করা যাবে না।
আত্মহত্যার সম্ভাব্য কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, এ মুহূর্তে কোনো কারণ নিশ্চিত করা যায়নি। মৃত্যুর পেছনে ব্যক্তিগত, পারিবারিক কিংবা অন্য কোনো বিষয় ছিল কি না, তা তদন্তের পরই জানা সম্ভব হবে।
ময়নাতদন্ত শেষে মঙ্গলবার পরিবারের সদস্যদের কাছে মরদেহ হস্তান্তর করা হলে তারা সেটি মৌলভীবাজারের গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যান। সেখানেই প্রান্তের শেষকৃত্য সম্পন্ন করার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
একজন তরুণ চিকিৎসকের আকস্মিক ও অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনায় পরিবার, স্বজন ও পরিচিতজনদের মধ্যে শোক নেমে এসেছে। একই সঙ্গে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিয়ে যে প্রশ্নগুলো উঠেছে, সেগুলোর উত্তর এখন পুলিশের তদন্ত এবং ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনের দিকে তাকিয়ে রয়েছে।
পুলিশ জানিয়েছে, তদন্তে প্রয়োজনীয় সব বিষয় খতিয়ে দেখা হবে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যেতে পারে।