দুর্গাপূজা দেখে বাড়ি ফেরার পথে ট্রলারডুবির ঘটনায় একমাত্র আট বছর বয়সী মেয়ে অদ্রিতাকে হারিয়েছেন শংকর বেপারী। মেয়ের মরদেহ উদ্ধার হলেও দুর্ঘটনার তিন দিন পেরিয়ে এখনো নিখোঁজ রয়েছেন তার স্ত্রী রিনা বেপারী। কালীগঙ্গা নদীতে ঘটে যাওয়া এ মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় শোক ও উৎকণ্ঠায় দিন কাটছে শংকরের পরিবারের।
বুধবার (২১ অক্টোবর) সকাল পর্যন্ত নিখোঁজ রিনা বেপারীর সন্ধান পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন নাজিরপুর ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের ফায়ার ফাইটার মো. পারভেজ।
এর আগে সোমবার (১৯ অক্টোবর) রাত ৯টার দিকে পিরোজপুরের নাজিরপুর ও নেছারাবাদ উপজেলার সীমান্তবর্তী শ্রীরামকাঠী-ভরতকাঠী ফেরিঘাট এলাকায় কালীগঙ্গা নদীতে এ দুর্ঘটনা ঘটে। অতিরিক্ত যাত্রী ও ভারী মোটরসাইকেল বোঝাই একটি ট্রলার ডুবে গেলে এ হতাহতের ঘটনা ঘটে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, দুর্গাপূজা উপলক্ষে প্রতিমা দর্শন শেষে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ট্রলারে বাড়ি ফিরছিলেন শংকর বেপারী। ট্রলারটিতে ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত ৫০ জনের বেশি যাত্রী এবং ছয় থেকে আটটি ভারী মোটরসাইকেল তোলা হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। অতিরিক্ত বোঝার কারণে ট্রলারটি ভারসাম্য হারিয়ে নদীতে ডুবে যায়। এ সময় অধিকাংশ যাত্রী সাঁতরে ও স্থানীয়দের সহায়তায় তীরে উঠতে পারলেও নিখোঁজ হন রিনা ও তার মেয়ে অদ্রিতা।
একমাত্র মেয়েকে হারিয়ে শোকাতুর শংকর বেপারী বলেন, ‘ঘটনার আগের রাতেও মেয়ে আমার সঙ্গে ঘুমিয়েছে। আজ সে শুধু স্মৃতি। আমি কীভাবে রাতগুলো পার করব? নৌকাডুবির পর পরিবারের কাউকে খুঁজে পাচ্ছিলাম না। হাসপাতালসহ আশপাশের নদীতে খুঁজেছি। সবাই তীরে উঠলেও ওরা নিখোঁজ রয়ে যায়। এখন মেয়ে মারা গেছে, ওর মাও হয়তো বেঁচে নেই।’
দুর্ঘটনার খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা উদ্ধার অভিযান শুরু করেন। প্রথম দফায় অভিযান চালিয়ে নিখোঁজদের উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। পরে বরিশাল থেকে ডুবুরি দল এসে দ্বিতীয় দফায় অভিযান চালায়। এ সময় শিশু অদ্রিতার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তবে তার মা রিনা বেপারীর সন্ধান এখনো মেলেনি।
নিখোঁজ রিনা বেপারী নেছারাবাদ উপজেলার গুয়ারেখা ইউনিয়নের ভরতকাঠী গ্রামের বাসিন্দা। তার স্বামী শংকর বেপারী ঢাকার একটি প্রতিষ্ঠানে নিরাপত্তাপ্রহরী হিসেবে কর্মরত। দুর্গাপূজার ছুটিতে পরিবার নিয়ে গ্রামের বাড়িতে এসেছিলেন তিনি। পূজা দেখতে গিয়ে এমন মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে এখন স্ত্রীর সন্ধানে অপেক্ষা করছেন শংকর।
দুর্ঘটনাস্থল ও উদ্ধার কার্যক্রম পরিদর্শন করেছেন নাজিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাজিয়া শাহনাজ তমা, সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. আহসান হাবিব এবং অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) নাসরিন জাহান। উদ্ধার অভিযানে পিরোজপুর জেলা ফায়ার সার্ভিসের উপপরিচালক রায়হানুল আশরাফ ও নাজিরপুর ফায়ার সার্ভিসের পরিদর্শক সোয়াইব হোসেন মুন্সি উপস্থিত রয়েছেন। পাশাপাশি নাজিরপুর ও নেছারাবাদ থানা-পুলিশের যৌথ দল ঘটনাস্থলে দায়িত্ব পালন করছে।
নেছারাবাদ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আশিক আহমেদ জানান, তীব্র পানির স্রোতের মধ্যেও ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল দুই দফায় অভিযান চালিয়ে শিশু অদ্রিতার মরদেহ উদ্ধার করেছে। নিখোঁজ রিনা বেপারীকে উদ্ধারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
এদিকে মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) দুপুর ১২টার দিকে দুর্ঘটনাস্থল শ্রীরামকাঠী ও নেছারাবাদের ভরতকাঠী খেয়াঘাট এলাকা পরিদর্শন করেন গৃহায়ন ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী আহম্মেদ সোহেল মনজুর। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন পিরোজপুরের জেলা প্রশাসক মো. গোলাম রাব্বানী ও পুলিশ সুপার মুহাম্মদ তালেবুর রহমান।