
মহালয়ার মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে দেবীপক্ষ। দেবী দুর্গার আগমনী বার্তায় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে বইতে শুরু করেছে শারদীয় দুর্গোৎসবের আনন্দ। শরতের কাশফুল, শিউলির সুবাস আর উৎসবের আমেজে সিলেটের মন্দির ও পূজামণ্ডপগুলোতে চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি।
কোথাও প্রতিমায় রং ও অলংকরণের কাজ চলছে, কোথাও তৈরি হচ্ছে পূজামণ্ডপের প্যান্ডেল। আবার কোথাও ব্যস্ত সময় পার করছেন আলোকসজ্জা ও সাজসজ্জার কাজে নিয়োজিত কর্মীরা। উৎসবকে সুন্দর ও সুশৃঙ্খলভাবে উদ্যাপনের লক্ষ্যে আয়োজকেরা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সব প্রস্তুতি শেষ করতে কাজ করছেন।
সংশ্লিষ্ট আয়োজকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এবার সিলেট জেলা ও মহানগর মিলিয়ে মোট ৬৩৬টি মণ্ডপে দুর্গাপূজার আয়োজন করা হচ্ছে। এরই মধ্যে প্রায় ৭০ শতাংশ প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে।
এবার সিলেট মহানগর এলাকায় ১৬২টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে। এর মধ্যে ১৪৬টি সর্বজনীন এবং ১৬টি পারিবারিক পূজামণ্ডপ।
অন্যদিকে, সিলেট জেলার বিভিন্ন উপজেলায় ৪৭৪টি মণ্ডপে পূজার আয়োজন করা হচ্ছে। এসব মণ্ডপের মধ্যে ৪৪৮টি সর্বজনীন এবং ২৬টি পারিবারিক।
গত বছর সিলেট জেলা ও মহানগর মিলিয়ে ৬১৮টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেই হিসাবে এবার পূজামণ্ডপের সংখ্যা বেড়েছে ১৮টি।
মণ্ডপের সংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি আয়োজনকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন এলাকায় উৎসবের প্রস্তুতিও জোরদার হয়েছে। নগর থেকে উপজেলার প্রত্যন্ত এলাকা পর্যন্ত পূজার আয়োজনে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
দুর্গাপূজাকে সামনে রেখে প্রতিমা নির্মাণের শেষ পর্যায়ের কাজ চলছে বিভিন্ন মণ্ডপে। প্রতিমায় রং করা, পোশাক ও অলংকার সংযোজন এবং সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ করছেন কারিগরেরা।
একই সঙ্গে মণ্ডপের প্যান্ডেল তৈরি, প্রবেশপথ সাজানো এবং আলোকসজ্জার প্রস্তুতিও চলছে। উৎসবের দিনগুলোতে দর্শনার্থীদের উপস্থিতি বাড়বে বলে বিভিন্ন মণ্ডপের আশপাশের পরিবেশ সুন্দর ও সুশৃঙ্খল রাখার ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছেন আয়োজকেরা।
পূজার সময় যত ঘনিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে কর্মব্যস্ততা। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সব কাজ শেষ করে ভক্ত ও দর্শনার্থীদের জন্য মণ্ডপ প্রস্তুত রাখাই এখন আয়োজকদের প্রধান লক্ষ্য।
মহালয়া সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এ দিনের মধ্য দিয়ে পিতৃপক্ষের অবসান ঘটে এবং দেবীপক্ষের সূচনা হয়। চণ্ডীপাঠ, দেবীর স্তব ও আগমনী সংগীতের মধ্য দিয়ে দেবী দুর্গাকে আবাহন করেন ভক্তরা।
মহালয়ার পর থেকেই দেবীর আগমনের প্রতীক্ষা আরও জোরালো হয়ে ওঠে। এরপর মহাষষ্ঠী থেকে শুরু হয় দুর্গাপূজার মূল আনুষ্ঠানিকতা। পূজার দিনগুলোতে অঞ্জলি, আরতি, ভজন-কীর্তনসহ নানা ধর্মীয় আয়োজনে মুখর হয়ে ওঠে মণ্ডপগুলো।
ধর্মীয় অনুষ্ঠানের পাশাপাশি বিভিন্ন মণ্ডপে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা এবং দরিদ্র মানুষের মধ্যে বস্ত্র বিতরণের মতো সামাজিক কর্মসূচিও আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে।
বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ সিলেট মহানগর শাখার সাধারণ সম্পাদক চন্দন দাস জানিয়েছেন, পূজাকে সামনে রেখে মণ্ডপগুলোতে সাজসজ্জার কাজ চলছে। ধর্মীয় আয়োজনের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা ও অসচ্ছল মানুষের মধ্যে বস্ত্র বিতরণের কর্মসূচিও থাকবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রস্তুতি শেষ করতে আয়োজকেরা কাজ করছেন।
দুর্গাপূজার আগমনী বার্তার সঙ্গে সঙ্গে নগরের বিপণিবিতান ও বিভিন্ন বাজারেও বাড়ছে মানুষের আনাগোনা। নতুন পোশাক কেনা, পূজার সামগ্রী সংগ্রহ এবং পরিবারের সদস্য ও আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে উৎসব উদ্যাপনের পরিকল্পনা করছেন অনেকে।
পূজা ঘিরে কেনাকাটা ও অন্যান্য প্রস্তুতির কারণে নগরজীবনেও উৎসবের আমেজ তৈরি হচ্ছে। ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার পাশাপাশি পারিবারিক মিলনমেলা ও সামাজিক যোগাযোগের মধ্য দিয়ে উৎসবের আনন্দ ভাগাভাগি করে নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে।
উৎসব শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করতে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন পূজা উদ্যাপন পরিষদের নেতারা। তাঁদের মতে, নিরাপদ পরিবেশে পূজা উদ্যাপনের জন্য আয়োজক, প্রশাসন এবং সাধারণ মানুষের সমন্বিত ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
সিলেট মহানগর পুলিশ কমিশনার সারোয়ার মুর্শেদ শামীম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সন্দেহজনক বা উসকানিমূলক পোস্ট দেখলে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া না দেখানোর আহ্বান জানিয়েছেন। এ ধরনের কোনো পোস্ট চোখে পড়লে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানানোর পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
পূজাকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট পর্যবেক্ষণ এবং সংশ্লিষ্টদের মধ্যে সমন্বয় বজায় রাখার ব্যবস্থাও নেওয়া হবে বলে তিনি জানিয়েছেন।
সব মিলিয়ে মহালয়ার মধ্য দিয়ে সিলেটে শারদীয় দুর্গোৎসবের প্রস্তুতি আরও গতি পেয়েছে। প্রতিমা নির্মাণ, মণ্ডপ সাজানো, আলোকসজ্জা এবং ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজনের মধ্য দিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন আয়োজকেরা।
নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বাকি প্রস্তুতি সম্পন্ন করে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে দুর্গাপূজা উদ্যাপন করতে চান সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। এখন অপেক্ষা মহাষষ্ঠীর, যেদিন থেকে শুরু হবে দুর্গাপূজার মূল আনুষ্ঠানিকতা।