
নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলা নির্বাচন অফিসে আবারও দুই রোহিঙ্গা নাগরিকের বাংলাদেশি জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) তৈরির অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় নাগরিকদের পরিচয় ও কাগজপত্র ব্যবহার করে তাদের বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে নিবন্ধনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, রংছাতি ইউনিয়নের শান্তিনগর গ্রামের ঠিকানা ব্যবহার করে নূর হালিমা ও মুজিবুর রহমান নামে দুজনের এনআইডি তৈরির প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়। এর মধ্যে নূর হালিমার এনআইডি ইতোমধ্যে হস্তান্তর করা হয়েছে। অন্যদিকে মুজিবুর রহমানের এনআইডির তথ্য নির্বাচন কমিশনের সার্ভারে আপলোড করা হলেও বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর সেটি এখনো হস্তান্তর করা হয়নি।
নির্বাচন অফিসের তথ্য অনুযায়ী, মুজিবুর রহমানের ভোটার নিবন্ধনের ফাইলে শান্তিনগর গ্রামের ঠিকানা ব্যবহার করা হয়েছে। একই সময়ের মধ্যে দুজনের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নির্বাচন অফিসের নির্দিষ্ট আইডি ব্যবহার করে সার্ভারে আপলোড করা হয়।
নূর হালিমার এনআইডিতে তার বাবা হিসেবে স্থানীয় বাসিন্দা ওমর আলী এবং মা হিসেবে তার স্ত্রী শরীফা খাতুনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু ওমর আলীর দাবি, নূর হালিমা নামে তার কোনো সন্তান নেই।
ওমর আলী জানান, তার চার সন্তান রয়েছে। তাদের মধ্যে দুই ছেলে ও দুই মেয়ে। নূর হালিমা নামে কোনো মেয়ে তার নেই। বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর নির্বাচন অফিসের কয়েকজন ব্যক্তি তার কাছে গিয়ে বিভিন্ন কাগজে স্বাক্ষর নিয়েছেন বলেও তিনি জানান।
তার পরিবারের সদস্যরাও দাবি করেছেন, তাদের বাবা-মায়ের জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য ব্যবহার করে অন্য একজনকে পরিবারের সন্তান হিসেবে দেখিয়ে এনআইডি তৈরি করা হয়েছে। কীভাবে এমন ঘটনা ঘটল, তা নিয়ে তারা বিস্ময় প্রকাশ করেছেন।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, একজন নতুন ভোটারের এনআইডি তৈরির ক্ষেত্রে জন্মনিবন্ধন, নাগরিকত্ব সনদ, বাবা-মায়ের জাতীয় পরিচয়পত্রসহ একাধিক নথি প্রয়োজন হয়। এসব নথি যাচাই-বাছাইয়ের পর তথ্য নির্বাচন কমিশনের সার্ভারে সংরক্ষণ করা হয়। ফলে যথাযথ যাচাই ছাড়া এ ধরনের নিবন্ধন কীভাবে সম্পন্ন হলো, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এদিকে নির্বাচন প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের দাবি, অভিযুক্ত দুই ব্যক্তি রোহিঙ্গা নাগরিক। স্থানীয় পর্যায়ে দালালের মাধ্যমে অর্থের বিনিময়ে তাদের বাংলাদেশি পরিচয়ে এনআইডি তৈরির চেষ্টা করা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের পূর্ণাঙ্গ সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়ার বিষয়।
উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, নূর হালিমার এনআইডি ইতোমধ্যে হস্তান্তর করা হয়েছে। মুজিবুর রহমানের এনআইডি এখনো হস্তান্তর করা হয়নি। বিষয়টি জানার পর তদন্ত শুরু হয়েছে এবং তদন্ত শেষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তদন্তে আরও জানা গেছে, ওই দুই ব্যক্তির এনআইডিতে যে পরিচয় ও ঠিকানা ব্যবহার করা হয়েছে, স্থানীয়ভাবে অনুসন্ধান করে তার সঙ্গে বাস্তবতার মিল পাওয়া যায়নি। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদেরও জানানো হয়েছে।
জেলা নির্বাচন কর্মকর্তাও ঘটনাটিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন। তার বক্তব্য, একই নির্বাচন অফিসে এর আগেও এ ধরনের অভিযোগ উঠেছিল। বারবার একই ধরনের ঘটনা কেন ঘটছে, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তে যারা জড়িত প্রমাণিত হবেন, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানানো হয়েছে।
এর আগে একই উপজেলা নির্বাচন অফিসে রোহিঙ্গা নাগরিকদের বাংলাদেশি এনআইডি তৈরিতে সহযোগিতার অভিযোগে কয়েকজনকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছিল। সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তাকেও বদলি করা হয়।
এর কয়েক মাসের মধ্যেই আবারও একই ধরনের অভিযোগ ওঠায় কলমাকান্দা উপজেলা নির্বাচন অফিসের ভোটার নিবন্ধন ও পরিচয় যাচাই প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এখন তদন্তে প্রকৃত ঘটনা এবং এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে কারা জড়িত ছিলেন, তা বেরিয়ে আসার অপেক্ষা।