
শাপলা চত্বর হত্যাকাণ্ডের মামলায় পলাতক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক সেনাপ্রধান আজিজ আহমেদ, সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদসহ ৩০ আসামিকে আগামী ১৬ সেপ্টেম্বরের মধ্যে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে পলাতক আসামিদের আত্মসমর্পণের বিষয়ে জাতীয় দৈনিকে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের নির্দেশ দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ আদেশ দেন।
বৃহস্পতিবার সকালে মামলায় গ্রেপ্তার ১০ আসামিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। তাদের মধ্যে সাবেক মন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, সাবেক মন্ত্রী দীপু মনি এবং লেখক শাহরিয়ার কবির রয়েছেন।
এ ছাড়া মামলার অন্য গ্রেপ্তার আসামিদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক মন্ত্রী শামসুল হক টুকু, সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসান, সাবেক আইজিপি এ কে এম শহীদুল হক, আবদুল জলিল মণ্ডল এবং সাংবাদিক মোজাম্মেল বাবু।
অসুস্থতার কারণে সাংবাদিক ফারজানা রূপাকে এদিন ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
এর আগে গত ২৭ জুলাই শেখ হাসিনাসহ মোট ৪১ জনের বিরুদ্ধে আনা আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নেয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। একই সঙ্গে মামলায় পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়।
এর ধারাবাহিকতায় বৃহস্পতিবার পলাতক ৩০ আসামিকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ট্রাইব্যুনালে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেওয়া হলো। আত্মসমর্পণ না করলে তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
মামলার প্রসিকিউশনের অভিযোগ অনুযায়ী, ২০১৩ সালের ৫ মে রাজধানীর শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশকে কেন্দ্র করে একটি পরিকল্পিত হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়। অভিযোগে বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট আসামিদের পারস্পরিক যোগসাজশে রাতের বেলায় বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে অভিযান পরিচালনা করা হয়েছিল।
প্রসিকিউশনের দাবি, ওই অভিযানের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের দমন ও নির্মূল করা। এ ঘটনায় বিপুলসংখ্যক মানুষ হতাহত হন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
মামলার তদন্ত ও প্রসিকিউশনের উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, শাপলা চত্বরের ঘটনায় এখন পর্যন্ত ৬১ জন নিহত হওয়ার তালিকা পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ৫৮ জনের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে বলে ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
ট্রাইব্যুনালের আদেশ অনুযায়ী, মামলায় পলাতক ৩০ আসামিকে আগামী ১৬ সেপ্টেম্বরের মধ্যে আত্মসমর্পণ করতে হবে। এ বিষয়ে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হবে।
আইনজীবীদের মতে, ট্রাইব্যুনালের এই আদেশ মামলার বিচারিক কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ একটি ধাপ। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পলাতক আসামিরা আত্মসমর্পণ না করলে তাদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে আইনগত প্রক্রিয়া আরও এগিয়ে নেওয়া হতে পারে।
অন্যদিকে, ইতোমধ্যে গ্রেপ্তার হওয়া আসামিদের ট্রাইব্যুনালে হাজির করার মাধ্যমে তাদের বিরুদ্ধে চলমান বিচারিক কার্যক্রমও এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। বৃহস্পতিবার ১০ আসামিকে আদালতে হাজির করা হয়।
মামলায় সাবেক মন্ত্রী, সাবেক সামরিক ও পুলিশ কর্মকর্তা, সাংবাদিক এবং বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিদের আসামি করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে শাপলা চত্বরের ঘটনায় পরিকল্পনা, সহযোগিতা ও বিভিন্ন পর্যায়ে সম্পৃক্ততার অভিযোগ আনা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা বিচারিক প্রক্রিয়ায় প্রমাণিত হতে হবে।
শাপলা চত্বরের ঘটনাকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে নানা ধরনের দাবি ও পাল্টা দাবি রয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলাটি চলমান থাকায় সাক্ষ্য-প্রমাণ ও বিচারিক কার্যক্রমের মধ্য দিয়েই অভিযোগগুলোর আইনগত নিষ্পত্তি হবে।
ট্রাইব্যুনালের বৃহস্পতিবারের আদেশের পর এখন নজর থাকবে ১৬ সেপ্টেম্বরের দিকে। ওই সময়ের মধ্যে পলাতক আসামিরা আত্মসমর্পণ করেন কি না এবং পরবর্তী সময়ে ট্রাইব্যুনাল কী ধরনের আইনগত পদক্ষেপ নেয়, তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।