
সিলেটের আলোচিত ট্রিপল মার্ডারের শিকার প্রবীণ ব্যবসায়ী আব্দুস সাত্তার (৯০) ও তার স্ত্রী সুরাইয়া বেগমের (৭৬) জানাজা সম্পন্ন হয়েছে। শুক্রবার বাদ আসর সিলেট নগরের ঐতিহাসিক শাহী ঈদগাহ ময়দানে তাদের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এতে বিপুলসংখ্যক মুসল্লি ও এলাকাবাসী অংশ নেন।
জানাজার আগে মুসল্লিদের উদ্দেশে আবেগঘন বক্তব্য দেন যুক্তরাজ্য থেকে দেশে ফেরা নিহত দম্পতির একমাত্র ছেলে আরিফ ইফতেখার। শুক্রবারই তিনি দেশে ফেরেন।
বক্তব্যে আরিফ ইফতেখার বলেন, “আমার বাবা যদি কোনো ভুল করে থাকেন, আপনারা ক্ষমা করে দেবেন। আর কেউ যদি তার কাছে টাকা-পয়সা পেয়ে থাকেন, তাহলে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করবেন।”
এরপর পাশাপাশি দুটি খাটিয়ায় বাবা-মায়ের মরদেহ রেখে একসঙ্গে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজার আগে দুটি অ্যাম্বুলেন্সে করে রায়নগরের বাসা থেকে তাদের মরদেহ শাহী ঈদগাহ ময়দানে নিয়ে আসা হয়।
জানাজা শেষে দাফনের জন্য মরদেহ দুটি নয়াসড়কস্থ হযরত মানিক পীর (রহ.) মাজারসংলগ্ন কবরস্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। দাফন ও জানাজায় অংশ নিতে যুক্তরাজ্য থেকে নিহত দম্পতির একমাত্র ছেলে ও এক মেয়ে শুক্রবার দেশে ফেরেন। এর আগে বৃহস্পতিবার দেশে ফেরেন তাদের দুই মেয়ে।
দাফন শেষে এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় নিহত দম্পতির ছেলে থানায় মামলা করবেন বলে জানা গেছে।
এর আগে বুধবার সকালে সিলেট নগরের রায়নগর মিতালী আবাসিক এলাকার নিজেদের বাসা থেকে আব্দুস সাত্তার, তার স্ত্রী সুরাইয়া বেগম এবং গৃহকর্মী তাহমিনা বেগমের (১৮) গলাকাটা মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। গৃহকর্মী তাহমিনার জানাজা ও দাফন বৃহস্পতিবার তার গ্রামের বাড়ি সুনামগঞ্জে সম্পন্ন হয়েছে।
বৃহস্পতিবার দেশে ফিরে নিহত আব্দুস সাত্তার ও সুরাইয়া বেগমের মেয়েরা সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গ থেকে বাবা-মায়ের মরদেহ গ্রহণ করেন।
নিহত আব্দুস সাত্তারের চার সন্তানের সবাই প্রবাসে বসবাস করেন। তাদের মধ্যে দুই মেয়ে যুক্তরাজ্যে এবং এক মেয়ে ও একমাত্র ছেলে যুক্তরাষ্ট্রে থাকেন।
যেভাবে ঘটে নৃশংস হত্যাকাণ্ড
গত বুধবার সকালে রায়নগরের মিতালী আবাসিক এলাকার একটি বাসায় ঘটে নৃশংস এই হত্যাকাণ্ড। ঘটনার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পুলিশ সন্দেহভাজন হিসেবে বাবুল মিয়াকে আটক করে এবং হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনের দাবি করে।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, নিহত গৃহকর্মী তাহমিনা বেগমের সঙ্গে বাবুল মিয়ার প্রেমের সম্পর্ক ছিল। ঘটনার দিন সকালে তাহমিনার সম্মতিতে বাবুল ওই বাসায় প্রবেশ করে। পরে দুজনের মধ্যে কথাকাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে বাবুল ছুরি দিয়ে তাহমিনাকে আঘাত করে।
তাহমিনার চিৎকার শুনে গৃহকর্ত্রী সুরাইয়া বেগম এগিয়ে এলে তাকেও ছুরি দিয়ে আঘাত করা হয়। পরে গৃহকর্তা আব্দুস সাত্তার এগিয়ে এলে তাকেও ছুরিকাঘাত করা হয়। এতে ঘটনাস্থলেই তিনজনের মৃত্যু হয়।
পুলিশ জানায়, হত্যাকাণ্ডের পর বাবুল ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করে বারান্দা দিয়ে পালিয়ে যায়। পরে কাছের একটি ঝোপে হত্যায় ব্যবহৃত ছুরিটি ফেলে দেয়। সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ এবং স্থানীয়দের সহযোগিতায় তাকে আটক করে পুলিশ। পরে তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী ঝোপঝাড় থেকে ছুরিটিও উদ্ধার করা হয়।
বুধবার সন্ধ্যায় বাবুল মিয়াকে আটকের পর সিলেট মহানগর পুলিশ কমিশনার সারোয়ার মুর্শেদ শামীম জানান, বাবুল ওই বাসায় রংমিস্ত্রির কাজ করত এবং মাঝে মাঝে কসাইয়ের কাজও করত। গৃহকর্মী তাহমিনার সঙ্গে তার প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল।
পুলিশের প্রাথমিক বক্তব্য অনুযায়ী, বুধবার সকাল ৯টার দিকে বাবুল ওই বাসায় গিয়ে তাহমিনার সঙ্গে একটি কক্ষে প্রবেশ করে। সেখানে তাদের মধ্যে শারীরিক সম্পর্ক নিয়ে কথা কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে বাবুল ছুরি দিয়ে তাহমিনাকে আঘাত করে। শব্দ পেয়ে সুরাইয়া বেগম এগিয়ে এলে তাকেও ছুরিকাঘাত করা হয়। পরে তাদের চিৎকার শুনে আব্দুস সাত্তার এগিয়ে এলে তাকেও ছুরি দিয়ে হত্যা করা হয়।
তবে পুলিশের এসব বক্তব্য ও মামলার পরবর্তী তদন্তে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ এবং ঘটনার বিস্তারিত আরও পরিষ্কার হবে।