
দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার এবং আমদানিনির্ভরতা কমাতে দেশীয় উৎস থেকে গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগে গতি এসেছে। গত সাত মাসে ৩২টি গ্যাস কূপের খননকাজ সম্পন্ন হয়েছে। এসব কূপ থেকে বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় ১৪৮ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হচ্ছে।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৩১ সালের মধ্যে দেশে মোট ১৫০টি নতুন কূপ খননের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর পরবর্তী ২০৩১ থেকে ২০৩৫ মেয়াদে আরও ১৫০টি কূপ খননের পরিকল্পনাও রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের আশা, এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে দেশে গ্যাসের উৎপাদন বাড়ার পাশাপাশি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরতাও কিছুটা কমবে।
ইতোমধ্যে সম্পন্ন হওয়া ৩২টি কূপের মধ্যে ১৪টি কূপ খনন করেছে সিলেট গ্যাস ফিল্ডস লিমিটেড। এসব কূপের মধ্যে রয়েছে বিয়ানীবাজার, কৈলাশটিলা, রশিদপুর ও সিলেট এলাকার বিভিন্ন কূপ।
এ ছাড়া বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেডের আওতায় ১১টি কূপের খননকাজ শেষ হয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি লিমিটেডের আওতায় আরও সাতটি কূপের কাজ সম্পন্ন হয়েছে।
প্রাথমিক হিসাবে এসব কূপ থেকে প্রতিদিন প্রায় ১৩৪ দশমিক ৪ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা ছিল। তবে একটি কূপে প্রত্যাশার চেয়ে বেশি গ্যাস পাওয়ায় বর্তমানে ৩২টি কূপ থেকে প্রায় ১৪৭ দশমিক ৯ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হচ্ছে।
গ্যাস উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়লেও সব গ্যাস এখনো জাতীয় গ্রিডে নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। পাইপলাইন-সংক্রান্ত সীমাবদ্ধতার কারণে নতুন কূপগুলো থেকে আরও প্রায় ৬০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস গ্রিডে যুক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না।
ফলে শুধু নতুন কূপ খনন করলেই হবে না, উৎপাদিত গ্যাস দ্রুত গ্রাহকদের কাছে পৌঁছে দিতে প্রয়োজনীয় পাইপলাইন ও প্রসেসিং অবকাঠামোও তৈরি করতে হবে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নতুন গ্যাস উৎপাদনের সঙ্গে সঞ্চালনব্যবস্থার উন্নয়ন সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
এদিকে আরও সাতটি কূপের খননকাজ বর্তমানে চলমান রয়েছে। এসব কূপের মধ্যে রশিদপুর, সুন্দলপুর, তিতাস, ভোলা নর্থ ও বাখরাবাদ এলাকার কূপ রয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী আগামী জানুয়ারির মধ্যে এসব কূপের কাজ শেষ হওয়ার কথা।
খননকাজ শেষ হলে নতুন কূপগুলো থেকে প্রতিদিন প্রায় ৯৬ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে পাইপলাইন ও গ্যাস প্রক্রিয়াজাতকরণ প্ল্যান্টের সক্ষমতার ওপর নির্ভর করবে কতটা গ্যাস বাস্তবে সরবরাহ করা সম্ভব হবে।
দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়াতে বর্তমানে ১৯টি প্রকল্প চলমান রয়েছে। পাশাপাশি আরও নয়টি প্রকল্প অনুমোদনের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। এসব প্রকল্পের আওতায় ৩১টি কূপ খননের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
এ ছাড়া সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে আরও চারটি কূপ খননের উদ্যোগ নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। অর্থাৎ আগামী কয়েক বছরে দেশে গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন কার্যক্রম আরও বিস্তৃত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
গ্যাসের ঘাটতি পূরণে স্থলভাগের পাশাপাশি সমুদ্রেও অনুসন্ধান জোরদার করা হচ্ছে। বঙ্গোপসাগরে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য ২৬টি অফশোর ব্লক নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অনুসন্ধান কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। পাশাপাশি সম্ভাবনাময় এলাকায় নতুন কূপ স্থাপনের জন্য তথ্য সংগ্রহ ও জরিপও চলছে।
দেশে গ্যাস উৎপাদন বাড়লেও চাহিদার তুলনায় সরবরাহ এখনো অনেক কম। বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ হচ্ছে প্রায় ২ হাজার ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট।
এর মধ্যে দেশীয় উৎস থেকে প্রায় ১ হাজার ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট এবং এলএনজি আমদানির মাধ্যমে ৯০০ থেকে ১ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে।
নতুন কূপগুলো থেকে গ্যাস উৎপাদন শুরু হওয়ায় রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন গ্যাস কোম্পানিগুলোর সরবরাহও বেড়েছে। আগে এসব কোম্পানি থেকে প্রতিদিন প্রায় ৫৬৬ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হলেও বর্তমানে তা প্রায় ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুটে পৌঁছেছে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়াতে চলমান কূপ খনন ও অনুসন্ধান কার্যক্রম সফল হলে ভবিষ্যতে জ্বালানি খাতে আমদানিনির্ভরতা কমানো সম্ভব হবে। একই সঙ্গে শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও অন্যান্য খাতে গ্যাস সরবরাহের চাপও কিছুটা কমতে পারে।
তবে উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি পাইপলাইন, প্রসেসিং প্ল্যান্ট ও সঞ্চালন অবকাঠামোর সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। নতুন কূপ থেকে পাওয়া গ্যাস দ্রুত জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা গেলে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।