
সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে বিশেষ সুরক্ষা দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা আইনের সংশোধনীতে কোনো সাংবাদিককে গ্রেপ্তার করার আগে আদালতের অনুমতি নেওয়ার বিধান রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। সাংবাদিকদের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে যেন অযথা হয়রানি বা আইনের অপব্যবহারের শিকার হতে না হয়, সে বিষয়টি বিবেচনায় নিয়েই এই প্রস্তাব সামনে এসেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সংবাদ প্রকাশ বা সাংবাদিকতার দায়িত্ব পালনকে কেন্দ্র করে কোনো সাংবাদিকের বিরুদ্ধে হঠাৎ করে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হলে তা গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। এ কারণে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে আইনের অপপ্রয়োগ ঠেকাতে একটি নির্দিষ্ট আইনি সুরক্ষা প্রয়োজন। প্রস্তাবিত বিধানের মাধ্যমে সেই সুরক্ষা নিশ্চিত করার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে।
সম্প্রতি সচিবালয়ে সাইবার সুরক্ষা আইন সংশোধনের বিষয়ে গণমাধ্যমের বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে আয়োজিত এক পরামর্শ সভায় বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। সভায় সংবাদপত্র, টেলিভিশন, অনলাইন সংবাদমাধ্যম এবং সাংবাদিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। আলোচনায় সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে সাইবার আইনের অপব্যবহার, মামলা এবং গ্রেপ্তারের মতো বিষয়গুলো উঠে আসে।
সভায় সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে আদালতের অনুমতির বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্ব পায়। প্রস্তাব অনুযায়ী, কোনো সাংবাদিকের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উঠলে সরাসরি গ্রেপ্তারের পরিবর্তে প্রথমে আদালতের অনুমোদন নেওয়ার ব্যবস্থা রাখা যেতে পারে। এর ফলে অভিযোগের বিষয়টি আদালতের নজরে আসবে এবং আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে একটি বিচারিক প্রক্রিয়া নিশ্চিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে অবশ্যই আইন অনুযায়ী তদন্ত ও বিচার হতে পারে। তবে একই সঙ্গে সাংবাদিকতার দায়িত্ব পালন এবং অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের মধ্যে পার্থক্য স্পষ্ট থাকা প্রয়োজন। কোনো সাংবাদিক সত্য ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট তথ্য প্রকাশের কারণে যেন অযথা হয়রানির শিকার না হন, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি।
প্রস্তাবিত সংশোধনীতে গণমাধ্যমের জন্য আরও কিছু সুরক্ষার বিষয় নিয়েও আলোচনা হয়েছে। বিশেষ করে সংবাদ প্রকাশের কারণে সাংবাদিক বা গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সাইবার আইনের ধারা প্রয়োগের ক্ষেত্রে যেন যথাযথ যাচাই-বাছাই করা হয়, সে বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালনের পরিবেশও নিশ্চিত করতে হবে। নতুন আইনের মাধ্যমে যেন কোনো পক্ষকে অযথা হয়রানি করা না যায়, সে বিষয়টি বিবেচনায় রাখা হচ্ছে।
এদিকে, প্রস্তাবিত আইন নিয়ে এখনো বিভিন্ন পক্ষের মতামত নেওয়া হচ্ছে। সাংবাদিক, সম্পাদক, গণমাধ্যম মালিক, আইনজীবী, সাইবার বিশেষজ্ঞ এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য ব্যক্তিদের কাছ থেকে মতামত নেওয়ার পর খসড়ায় প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনার কথা রয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, আইনটি চূড়ান্ত করার আগে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং সাইবার অপরাধ দমনের প্রয়োজনীয়তার মধ্যে একটি ভারসাম্য তৈরি করা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একদিকে যেমন অনলাইনে অপরাধ ও অপপ্রচার ঠেকাতে কার্যকর আইন প্রয়োজন, অন্যদিকে সাংবাদিকদের স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালনের সুযোগও নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
তবে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি—সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে আদালতের অনুমতি লাগবে—এটি এখনো চূড়ান্তভাবে কার্যকর কোনো আইন নয়। এটি প্রস্তাবিত সংশোধনীর একটি বিধান। সংশ্লিষ্টদের মতামত ও পর্যালোচনার পর খসড়াটি চূড়ান্ত করা হবে। এরপর আইন প্রণয়নের নির্ধারিত প্রক্রিয়া শেষ হলে নতুন বিধান কার্যকর হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
সরকারের পক্ষ থেকে আরও বলা হয়েছে, সাইবার সুরক্ষা আইন এমনভাবে প্রণয়ন করা হবে, যাতে অপরাধ দমন করার পাশাপাশি সাধারণ নাগরিক, সাংবাদিক এবং গণমাধ্যমের অধিকার ও নিরাপত্তার বিষয়টিও বিবেচনায় থাকে।
এখন সংশ্লিষ্ট মহলের নজর রয়েছে আইনটির চূড়ান্ত খসড়ার দিকে। সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে আদালতের অনুমতির প্রস্তাব শেষ পর্যন্ত কোন রূপে আইনে অন্তর্ভুক্ত হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।