সিলেট নগরীতে দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি, আবাসনের চাহিদা বাড়া এবং নতুন নতুন ভবন নির্মাণের মধ্যেও স্বস্তিতে নেই ভাড়াটিয়ারা। বরং দিন দিন বাড়ছে বাসা ভাড়া, অগ্রিম টাকার চাপ এবং বাড়ির মালিকদের নানা ধরনের শর্ত। ফলে চাকরিজীবী, শিক্ষার্থী, নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারসহ নগরের বিপুলসংখ্যক মানুষকে আবাসন ব্যয় সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, সিলেট নগরের বিভিন্ন এলাকায় গত ছয় মাসে বাসা ভাড়া প্রায় ২০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। একই মানের বাসার জন্য কয়েক মাস আগের তুলনায় এখন কয়েক হাজার টাকা বেশি দিতে হচ্ছে। অনেক ভাড়াটিয়ার অভিযোগ, আয় না বাড়লেও প্রতিবছর কিংবা কয়েক মাস পরপর বাসা ভাড়া বাড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।
নগরের আম্বরখানা, উপশহর, বন্দরবাজার, শাহপরানসহ বিভিন্ন এলাকায় বাসা ভাড়ার ঊর্ধ্বগতির চিত্র দেখা যাচ্ছে। একদিকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বৃদ্ধি, অন্যদিকে বাড়তি বাসা ভাড়া—সব মিলিয়ে মধ্যবিত্ত পরিবারের মাসিক ব্যয়ের বড় একটি অংশ চলে যাচ্ছে আবাসন খাতে।
একটি প্রতিবেদনে আম্বরখানা এলাকার একজন বেসরকারি চাকরিজীবীর উদাহরণ তুলে ধরে বলা হয়েছে, এক বছর আগে যে বাসার ভাড়া ছিল ১০ হাজার টাকা, সেটির ভাড়া এখন ১৪ হাজার টাকা চাওয়া হচ্ছে। অথচ ওই ব্যক্তির আয় একই হারে বাড়েনি। ফলে বাধ্য হয়ে শহরের বাইরে অপেক্ষাকৃত কম ভাড়ার এলাকায় চলে যাওয়ার চিন্তা করছেন তিনি।
শুধু চাকরিজীবী নয়, শিক্ষার্থীরাও এই সংকটের বড় ভুক্তভোগী। কয়েকজন মিলে একটি বাসা ভাগ করে থাকলেও ভাড়া বেড়ে যাওয়ায় তাদের মাসিক খরচ অনেক বেড়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে সিলেটে উচ্চশিক্ষার জন্য আসা শিক্ষার্থীদের কাছে আবাসন ব্যয় এখন গুরুত্বপূর্ণ একটি সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাসা ভাড়ার পাশাপাশি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে অগ্রিম টাকা। অনেক বাড়ির মালিক ভাড়াটিয়ার কাছ থেকে দুই থেকে ছয় মাস পর্যন্ত অগ্রিম ভাড়া দাবি করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারের জন্য একসঙ্গে কয়েক মাসের ভাড়া পরিশোধ করা কঠিন। ফলে অনেকেই পছন্দের বাসা পেলেও প্রয়োজনীয় অগ্রিম টাকা দিতে না পারায় বাসা নিতে পারছেন না।
ভাড়াটিয়াদের অভিযোগ, অগ্রিম টাকা দেওয়ার পর বাসা ছাড়ার সময় সেই টাকা ফেরত পাওয়া নিয়েও অনেক ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হয়। লিখিত চুক্তি না থাকলে এ ধরনের বিরোধের সমাধান আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
উচ্চ ভাড়ার পাশাপাশি অনেক ভাড়াটিয়াকে বাড়ির মালিকদের নানা ধরনের নিয়ম মেনে চলতে হচ্ছে। কোথাও ব্যাচেলরদের বাসা ভাড়া দেওয়া হয় না। আবার কোথাও অতিথি আনা, নির্দিষ্ট সময়ের পর বাসায় প্রবেশ, রান্না করা কিংবা বিদ্যুৎ ব্যবহারের ক্ষেত্রেও বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়।
১৪ আগস্ট প্রকাশিত আরেকটি প্রতিবেদনে ভাড়াটিয়াদের এই অভিজ্ঞতাকে ‘অদৃশ্য কারাগার’ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, উচ্চ ভাড়া, অগ্রিম অর্থ, কঠোর বাড়ির নিয়ম এবং অনিশ্চিত বসবাসের কারণে অনেক ভাড়াটিয়া নিজেদের বাসাতেও স্বাধীনভাবে থাকতে পারছেন না বলে অভিযোগ করছেন।
একজন শিক্ষার্থীর অভিযোগ, মাসের বড় একটি অংশ বাসা ভাড়ার পেছনে চলে যাওয়ার পরও সবসময় বাসা ছাড়ার অনিশ্চয়তা থাকে। অন্যদিকে একজন বেসরকারি চাকরিজীবীর ভাষ্য, ভাড়া পরিশোধ করেও অনেক সময় নিজের বাসায় স্বাধীনভাবে থাকার সুযোগ পাওয়া যায় না।
ভাড়াটিয়াদের সমস্যার অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে এসেছে লিখিত চুক্তির অভাব। অনেক ক্ষেত্রে বাড়ির মালিক ও ভাড়াটিয়ার মধ্যে আনুষ্ঠানিক চুক্তি থাকে না। ফলে ভাড়া কতদিন পর বাড়ানো যাবে, কত টাকা অগ্রিম নেওয়া হবে, বাসা ছাড়ার আগে কতদিনের নোটিশ দিতে হবে—এসব বিষয়ে স্পষ্টতা থাকে না।
কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভাড়াটিয়াকে হঠাৎ বাসা ছেড়ে দেওয়ার মৌখিক নির্দেশ দেওয়া হয়। আবার অগ্রিম টাকা, বিদ্যুৎ-পানি-গ্যাসের বিল কিংবা বাড়তি চার্জ নিয়ে বিরোধ তৈরি হলে ভাড়াটিয়ার পক্ষে নিজের দাবি প্রতিষ্ঠা করাও কঠিন হয়ে পড়ে।
তবে বাড়ির মালিকদের বক্তব্য, শুধু ইচ্ছামতো ভাড়া বাড়ানোর অভিযোগ দিয়ে পুরো বিষয়টি দেখা উচিত নয়। তাদের দাবি, ভবন নির্মাণের খরচ, ব্যাংক ঋণের সুদ, রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়, পৌরকর এবং বিদ্যুৎ-পানিসহ বিভিন্ন খরচ আগের তুলনায় বেড়েছে। ফলে এসব ব্যয় সামাল দিতে বাসা ভাড়া সমন্বয় করা অনেক সময় প্রয়োজন হয়ে পড়ে।
এছাড়া ভবনের নিরাপত্তা, অন্যান্য ভাড়াটিয়ার স্বাচ্ছন্দ্য এবং সম্পত্তির নিরাপত্তার জন্য কিছু নিয়ম-কানুন থাকা প্রয়োজন বলেও বাড়ির মালিকদের পক্ষ থেকে যুক্তি দেওয়া হয়।
নগর বিশেষজ্ঞদের মতে, ভাড়াবাজারে স্বচ্ছতার অভাব, লিখিত চুক্তির অনিয়ম এবং ভাড়া নির্ধারণে সুস্পষ্ট মানদণ্ড না থাকায় বাড়ির মালিক ও ভাড়াটিয়ার মধ্যে বিরোধ তৈরি হচ্ছে।
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক মো. জহির বিন আলম বলেছেন, সিলেটে গত কয়েক বছরে আকস্মিকভাবে বাসা ভাড়া বাড়ছে এবং এ বিষয়ে কার্যকর নীতিমালার প্রয়োজন রয়েছে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ও সিটি করপোরেশনের সমন্বয়ে নীতিমালা তৈরি করা হলে সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বস্তি ফিরতে পারে।
বাসা ভাড়া নিয়ন্ত্রণে সিলেট সিটি করপোরেশনের সরাসরি ক্ষমতা সীমিত বলেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বক্তব্য প্রতিবেদনে এসেছে। সরকারি পর্যায়ে কার্যকর নীতিমালা তৈরি হলে স্থানীয়ভাবে তা বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখার সুযোগ রয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
ফলে শুধু বাড়ির মালিক বা ভাড়াটিয়াকে দায়ী না করে একটি কার্যকর ও বাস্তবসম্মত নীতিমালার মাধ্যমে সমস্যাটির সমাধান করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আবাসন ব্যয় যখন মানুষের আয়ের তুলনায় দ্রুত বাড়তে থাকে, তখন তার প্রভাব শুধু ব্যক্তিগত জীবনে সীমাবদ্ধ থাকে না; এর সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাবও পড়ে। পরিবারের মাসিক আয়ের বড় অংশ বাসা ভাড়ায় চলে গেলে খাদ্য, শিক্ষা, চিকিৎসা, যাতায়াত ও সঞ্চয়ের জন্য কম অর্থ অবশিষ্ট থাকে।
অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে শহরের কেন্দ্র থেকে দূরের এলাকায় চলে যাচ্ছে। এতে কর্মস্থল বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াতের সময় ও খরচও বাড়ছে। অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের কেউ কেউ অপেক্ষাকৃত দূরের এলাকায় কম ভাড়ার বাসা খুঁজছেন।
অর্থনীতিবিদদের মতে, আয় বৃদ্ধির তুলনায় আবাসন ব্যয় দ্রুত বাড়লে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের ওপর চাপ বাড়ে এবং সামাজিক বৈষম্য আরও তীব্র হতে পারে।
সিলেটের আবাসন খাতে শৃঙ্খলা আনতে বাড়ির মালিক ও ভাড়াটিয়া—উভয় পক্ষের অধিকার ও দায়িত্ব স্পষ্ট করা জরুরি। লিখিত ভাড়াচুক্তি বাধ্যতামূলক করা, ভাড়া বৃদ্ধির ক্ষেত্রে যৌক্তিক নিয়ম চালু করা, অগ্রিম অর্থের বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে বাড়ির মালিকদেরও ভবন রক্ষণাবেক্ষণ, নিরাপত্তা ও অন্যান্য ব্যয়ের বিষয়টি বিবেচনায় রেখে যৌক্তিক ভাড়া নির্ধারণ করতে হবে। অন্যদিকে ভাড়াটিয়াদেরও সময়মতো ভাড়া ও ইউটিলিটি বিল পরিশোধসহ চুক্তির শর্ত মেনে চলতে হবে।
সিলেট দ্রুত সম্প্রসারিত একটি নগরী। এখানে প্রতিদিন নতুন মানুষ চাকরি, ব্যবসা ও শিক্ষার জন্য আসছেন। ফলে আবাসনের চাহিদা ভবিষ্যতে আরও বাড়বে। এখনই কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না হলে বাসা ভাড়ার এই সংকট আরও তীব্র হতে পারে।
সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, সরকার ও স্থানীয় প্রশাসন দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেবে এবং বাড়ির মালিক ও ভাড়াটিয়ার মধ্যে একটি ন্যায্য ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করবে। নিরাপদ, সাশ্রয়ী ও মর্যাদাপূর্ণ আবাসন নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত একটি আধুনিক ও বসবাসযোগ্য সিলেট নগরীর অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।