চলতি বছরের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফলে গত পাঁচ বছরের মধ্যে সিলেট শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার সর্বনিম্ন। এ ফলাফল নিয়ে সিলেটজুড়ে চলছে নানা আলোচনা-সমালোচনা। তবে সিলেট শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক বিলকিস ইয়াসমিনের দাবি, পরীক্ষা কেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা স্থাপনের কারণে এবার শিক্ষার্থীরা ‘ক্লিন ও ক্লিয়ার’ পরীক্ষা দিয়েছে। ফলে শিক্ষার্থীরা যতটুকু পড়াশোনা করেছে, ফলাফলও সে অনুযায়ী এসেছে।
সোমবার (১০ আগস্ট) সকাল ১০টায় সিলেট শিক্ষা বোর্ডের সম্মেলন কক্ষে সংবাদ সম্মেলন করে আনুষ্ঠানিকভাবে ফলাফল ঘোষণা করেন বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক বিলকিস ইয়াসমিন।
এবার সিলেট শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার ৫৮ দশমিক ৩৩ শতাংশ, যা গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। এর আগে ২০২২ সালে পাসের হার ছিল ৭৮ দশমিক ৮২ শতাংশ, ২০২৩ সালে ৭৬ দশমিক ০৬ শতাংশ, ২০২৪ সালে ৭৩ দশমিক ০৫ শতাংশ এবং ২০২৫ সালে ছিল ৬৮ দশমিক ৫৭ শতাংশ। অর্থাৎ গত পাঁচ বছর ধরে সিলেট বোর্ডে ধারাবাহিকভাবে কমছে পাসের হার।
পাসের হার কমার কারণ জানতে চাইলে সংবাদ সম্মেলনে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক বিলকিস ইয়াসমিন বলেন, ‘এবার মন্ত্রণালয়ের অর্ডার ছিল প্রতিটি কেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা লাগানোর। সে অনুযায়ী সব কেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা লাগানো হয়েছে। ফলে এবার শিক্ষার্থীরা ক্লিন ও ক্লিয়ার পরীক্ষা দিয়েছে। আমার মনে হয়, সে অনুযায়ী ফলাফল এসেছে।’
বিগত বছরের পরীক্ষাগুলো তাহলে সঠিকভাবে হয়নি কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমি এরকম কিছু বলতে চাই না। তবে আমার অবজারভেশন, বাচ্চারা যতটুকু পড়েছে, সেই অনুযায়ী ফলাফল এসেছে। আমাদের মূল্যায়নে কোনো বৈষম্য হয়নি।’
তিনি জানান, এবার ইংরেজি ও গণিত বিষয়ে বেশি শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছে। বিশেষ করে মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থীরা ইংরেজি ও গণিতে তুলনামূলক দুর্বল হওয়ায় তাদের মধ্যে ফেল করার হার বেশি।
সারাদেশের শিক্ষা বোর্ডগুলোর মধ্যেও পাসের হারে সিলেট রয়েছে পিছনের সারিতে। এবার ঢাকা বোর্ডে পাসের হার ৭১ দশমিক ৬৩ শতাংশ, রাজশাহীতে ৬৩ দশমিক ৬৭ শতাংশ, কুমিল্লায় ৬৫ দশমিক ৪২ শতাংশ, যশোরে ৬৬ দশমিক ২৭ শতাংশ, চট্টগ্রামে ৫৯ দশমিক ৪৮ শতাংশ, বরিশালে ৬০ দশমিক ৩৫ শতাংশ, সিলেটে ৫৮ দশমিক ৩৩ শতাংশ, দিনাজপুরে ৫৮ দশমিক ০৫ শতাংশ এবং ময়মনসিংহে ৫৭ দশমিক ৩৯ শতাংশ।
তবে পাসের হার কমলেও সিলেট শিক্ষা বোর্ডে এবার জিপিএ-৫ বেড়েছে। গত বছর জিপিএ-৫ পেয়েছিল ৩ হাজার ৬১৪ জন। এ বছর তা বেড়েছে ২২২টি। ২০২২ সালে জিপিএ-৫ পেয়েছিল ৭ হাজার ৫৬৫ জন, ২০২৩ সালে ৫ হাজার ৪৫২ জন এবং ২০২৪ সালে ৫ হাজার ৪৭১ জন।
সিলেট শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এবার ৯৭৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ৮৯ হাজার ৪২১ জন পরীক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয়। এর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে ৫১ হাজার ৯৫৭ জন। পরীক্ষার্থীদের মধ্যে ছাত্রী ছিল ৫৩ হাজার ৮৯১ জন এবং ছাত্র ৩৫ হাজার ৫৩০ জন।
এবার জিপিএ-৫ ও পাসের হারে ছাত্রীদের ফলাফল তুলনামূলক ভালো। মেয়েদের পাসের হার ৫৬ দশমিক ৭৮ শতাংশ এবং ছেলেদের ৫৬ দশমিক ১২ শতাংশ।
বিভাগভিত্তিক ফলাফলে বিজ্ঞান বিভাগে পাসের হার ৮০ দশমিক ৩২ শতাংশ। এ বিভাগে জিপিএ-৫ পেয়েছে ৩ হাজার ৬০৮ জন। ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে পাসের হার ৬৪ দশমিক ০৩ শতাংশ এবং জিপিএ-৫ পেয়েছে ১০৮ জন। মানবিক বিভাগে পাসের হার ৪৮ দশমিক ১৬ শতাংশ এবং জিপিএ-৫ পেয়েছে ১২০ জন।
সিলেট শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এবার ৯টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শতভাগ পরীক্ষার্থী উত্তীর্ণ হয়েছে।
জেলাভিত্তিক ফলাফলে পাসের হারে এগিয়ে রয়েছে সুনামগঞ্জ এবং জিপিএ-৫ প্রাপ্তিতে এগিয়ে মৌলভীবাজার।
সিলেট জেলায় এবার পরীক্ষার্থী ছিল ৩৫ হাজার ৩৩১ জন। এর মধ্যে ছাত্র ১৪ হাজার ৩২১ জন এবং ছাত্রী ২১ হাজার ১০ জন। জেলার ৩৬৭টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের জন্য পরীক্ষা কেন্দ্র ছিল ৯৪টি।
মৌলভীবাজারে পরীক্ষার্থী ছিল ১৯ হাজার ৯১৩ জন। এর মধ্যে ছাত্র ৭ হাজার ৬৩১ জন ও ছাত্রী ১২ হাজার ২৮২ জন। জেলার ১৯৮টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা ৩৭টি কেন্দ্রে পরীক্ষায় অংশ নেয়।
সুনামগঞ্জে পরীক্ষার্থী ছিল ১৮ হাজার ৩৮৩ জন। তাঁদের মধ্যে ছাত্র ৭ হাজার ৫১৫ জন এবং ছাত্রী ১০ হাজার ৮৬৮ জন। জেলার ২৩৪টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য পরীক্ষা কেন্দ্র ছিল ৪৫টি।
হবিগঞ্জে পরীক্ষার্থী ছিল ১৫ হাজার ৭৯৪ জন। এর মধ্যে ছাত্র ৬ হাজার ৬৩ জন এবং ছাত্রী ৯ হাজার ৭৩১ জন। জেলার ১৭৪টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা ৪৯টি কেন্দ্রে পরীক্ষায় অংশ নেয়।
ফলাফলের এই চিত্রে সিলেট শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার কমার কারণ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে পরীক্ষা কেন্দ্রে কঠোর নজরদারি, ইংরেজি ও গণিতে শিক্ষার্থীদের দুর্বলতা এবং শিক্ষার মান—এসব বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।