
চট্টগ্রাম নগরীর চকবাজার এলাকায় একা ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন প্রায় ৬৫ বছর বয়সী এক বৃদ্ধা। বাড়ির ঠিকানা জানতে চাইলে শুধু বলছিলেন, ‘মিরপুর বাড়ি’। এর বাইরে জেলা, থানা কিংবা গ্রামের নাম কিছুই বলতে পারছিলেন না। সঙ্গে ছিল না কোনো পরিচয়পত্র, মোবাইল ফোন বা এমন কোনো কাগজপত্র, যা দেখে তার পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব।
বৃদ্ধার কাছ থেকে পাওয়া বিচ্ছিন্ন কয়েকটি তথ্যই শেষ পর্যন্ত তাকে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দিতে সহায়তা করে। ‘মিরপুর’ ও ‘কুলাউড়া’—এই দুটি শব্দ এবং কয়েকজন স্বজনের নামকে সূত্র ধরে অনুসন্ধানে নামে চট্টগ্রামের চকবাজার থানা পুলিশ। একপর্যায়ে সম্ভাব্য এলাকার সন্ধান পেতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক চ্যাটবট চ্যাটজিপিটির সহায়তা নেওয়া হয়। এআইয়ের দেওয়া সম্ভাব্য সূত্র যাচাই করতে যোগাযোগ করা হয় হবিগঞ্জের বাহুবল থানায়। সেখান থেকেই মেলে পাঁচ দিন আগে করা একটি নিখোঁজ সাধারণ ডায়েরি (জিডি)। পরে নিশ্চিত হওয়া যায়, চট্টগ্রামে পাওয়া ওই বৃদ্ধাই সেই নিখোঁজ রহিমা খাতুন।
ঘটনাটি ঘটে বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) রাতে। ওই রাত ৮টার দিকে চট্টগ্রাম নগরের চকবাজার এলাকায় এক বৃদ্ধাকে একা ঘোরাফেরা করতে দেখে এক পথচারী তাকে থানায় নিয়ে যান। এরপর পুলিশ তার পরিচয় ও ঠিকানা জানার চেষ্টা করে।
চকবাজার থানার সেকেন্ড অফিসার এসআই মো. ফিরোজ আলম মুন্সি জানান, পথচারী বৃদ্ধাকে থানায় নিয়ে এসে বলেন, তাকে রাস্তায় একা ঘুরতে দেখা গেছে। কোথায় তার বাড়ি কিংবা কীভাবে তিনি সেখানে এসেছেন—এ বিষয়ে স্পষ্ট কোনো তথ্য দিতে পারছিলেন না তিনি।
পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে বৃদ্ধা নিজের নাম বলেন রহিমা। বয়স আনুমানিক ৬৫ বছর। কিন্তু বাড়ির ঠিকানা জানতে চাইলে বারবার একই কথা বলছিলেন—‘মিরপুর বাড়ি’।
পুলিশ ধীরে ধীরে কথা বলে তার কাছ থেকে আরও কিছু তথ্য বের করার চেষ্টা করে। একপর্যায়ে তিনি জানান, তার মেয়ের নাম রুপবানু এবং মেয়ের জামাইয়ের বাড়ি কুলাউড়া এলাকায়। তার দুই ছেলের নাম কদর আলী ও আরব আলী। স্বামী অসুস্থ হয়ে বিছানায় পড়ে আছেন বলেও জানান তিনি।
তবে এর বেশি কিছু বলতে পারছিলেন না রহিমা।
পুলিশ কর্মকর্তা ফিরোজ আলমের কাছে বিষয়টি আরও জটিল হয়ে ওঠে ‘মিরপুর’ নামটি নিয়ে। কারণ দেশের বিভিন্ন এলাকায় মিরপুর নামে গ্রাম ও এলাকা রয়েছে। আবার কুলাউড়ার কথা বলায় সিলেট বিভাগের কোনো এলাকায় বৃদ্ধার বাড়ি হতে পারে বলে ধারণা করা হয়।
এরপরই অনুসন্ধানে ভিন্নধর্মী একটি পদ্ধতি কাজে লাগানোর কথা মাথায় আসে পুলিশের। বৃদ্ধার কাছ থেকে পাওয়া সব তথ্য চ্যাটজিপিটিতে দিয়ে সম্ভাব্য এলাকার সন্ধান করা হয়। তথ্য বিশ্লেষণের পর সিলেট অঞ্চলের সঙ্গে ভৌগোলিকভাবে সম্পর্কিত মিরপুর এলাকার একটি সম্ভাব্য সূত্র পাওয়া যায়।
তবে এআইয়ের দেওয়া তথ্যকে সরাসরি সত্য ধরে নেয়নি পুলিশ। সম্ভাব্য সূত্র হিসেবে সেটি যাচাই করতে বাহুবল থানায় যোগাযোগ করা হয়।
ফিরোজ আলম জানান, বাহুবল থানায় ফোন করে বৃদ্ধার নাম, বয়স, দুই ছেলের নাম, মেয়ের নাম এবং মিরপুর এলাকার কথা জানানো হয়। একই সঙ্গে অনুরোধ করা হয়, ওই এলাকায় এমন কোনো নারী নিখোঁজ হয়েছেন কি না, তা যাচাই করতে।
এরপর বাহুবল থানার এসআই মহসিন রেজা সৌরভ চকবাজার থানার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তিনি জানান, রহিমা খাতুন নামে এক নারী নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় বাহুবল থানায় একটি জিডি রয়েছে।
পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, রহিমা খাতুন ২২ আগস্ট সকাল ১১টার দিকে হবিগঞ্জের বাহুবল থানার কামারগাঁও এলাকা থেকে বাড়ির কাউকে কিছু না বলে বের হয়ে যান। দীর্ঘ সময় ধরে খোঁজাখুঁজি করেও তার সন্ধান না পেয়ে পাঁচ দিন পর, ২৭ আগস্ট, থানায় নিখোঁজ জিডি করেন তার ছেলে কদর আলী।
জিডিতে রহিমা খাতুনের বয়স ৬০ বছর উল্লেখ করা হয়। তাকে মানসিকভাবে অসুস্থ বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। তার স্বামীর নাম সুন্দর আলী। বাড়ি হবিগঞ্জের বাহুবল থানার কামারগাঁও এলাকার ৬ নম্বর মিরপুর ইউনিয়নে।
চকবাজার থানায় পাওয়া বৃদ্ধার দেওয়া তথ্যের সঙ্গে নিখোঁজ জিডির তথ্য মিলে যাওয়ায় পুলিশের সন্দেহ আরও জোরালো হয়। পরে তার ছবি ও অন্যান্য তথ্য পরিবারের সদস্যদের কাছে পাঠানো হয়। যাচাই-বাছাই শেষে পরিবারের সদস্যরা নিশ্চিত করেন, চট্টগ্রামে পাওয়া ওই বৃদ্ধাই রহিমা খাতুন।
এরপর ২৯ আগস্ট রহিমার স্বজনেরা চট্টগ্রামের চকবাজার থানায় এসে তাকে শনাক্ত করেন। প্রয়োজনীয় যাচাই শেষে তাকে পরিবারের সদস্যদের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
এ বিষয়ে বাহুবল থানার এসআই মহসিন রেজা সৌরভ বলেন, রহিমা খাতুন নিখোঁজ হওয়ার পর তার পরিবার পাঁচ দিন ধরে তাকে খুঁজছিল। পরে থানায় জিডি করা হয়। চট্টগ্রামের চকবাজার থানা থেকে একই নামের এক বৃদ্ধাকে পাওয়ার খবর আসার পর ছবি ও অন্যান্য তথ্য যাচাই করে পরিচয় নিশ্চিত করা হয়।
ঘটনাটি নিয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও বাংলাদেশ কম্পিউটার সোসাইটির কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সহসভাপতি রেজাউল করিম বলেন, এ ধরনের ঘটনায় এআইকে সহায়ক অনুসন্ধানী প্রযুক্তি হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে।
তার মতে, কোনো ব্যক্তি যদি ‘মিরপুর বাড়ি’, ‘কুলাউড়া’ কিংবা স্বজনদের নামের মতো বিচ্ছিন্ন তথ্য দেন, এআই সেসব তথ্য বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য ভৌগোলিক ও পারিবারিক সংযোগের ইঙ্গিত দিতে পারে। এতে তদন্তকারীদের অনুসন্ধানের ক্ষেত্র ছোট হয়ে আসে।
তবে এআইয়ের দেওয়া তথ্যকে কখনোই চূড়ান্ত সত্য হিসেবে নেওয়া উচিত নয় বলেও সতর্ক করেন তিনি। তার ভাষায়, ‘চ্যাটজিপিটি ঠিকানা খুঁজে দিয়েছে’ বলার চেয়ে বলা ভালো—চ্যাটজিপিটি পাওয়া বিচ্ছিন্ন তথ্য বিশ্লেষণ করে একটি সম্ভাব্য অনুসন্ধানী সূত্র বা এলাকার ইঙ্গিত দিয়েছে।
তিনি আরও বলেন, এআই কোনোভাবেই তদন্তকারীর বিকল্প নয়; বরং তদন্তকারীর জন্য এটি একটি শক্তিশালী সহায়ক প্রযুক্তি।
২২ আগস্ট বাড়ি থেকে নিখোঁজ হন রহিমা খাতুন। পাঁচ দিন ধরে পরিবারের সদস্যরা তাকে খুঁজে বেড়ান। ২৭ আগস্ট বাহুবল থানায় নিখোঁজ জিডি করা হয়। একই দিন রাতে চট্টগ্রামের চকবাজার এলাকায় পাওয়া যায় পরিচয়হীন ওই বৃদ্ধাকে।
বৃদ্ধার মুখে থাকা মাত্র কয়েকটি বিচ্ছিন্ন তথ্য, পুলিশের অনুসন্ধান এবং এআইয়ের দেওয়া একটি সম্ভাব্য সূত্র—সব মিলিয়ে শেষ পর্যন্ত রহিমার পরিচয় শনাক্ত হয়। ২৯ আগস্ট পরিবারের সদস্যরা চট্টগ্রামে এসে তাকে শনাক্ত করেন। পরে প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষে তাকে স্বজনদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়।