
মায়ের মৃত্যুর পর পাওনা পেনশনের টাকা তুলতে গিয়ে ঘুষ ও হয়রানির শিকার হয়েছিলেন ১৭ বছর বয়সী শাহেদ শরীফ আহমেদ। পাসপোর্ট করতে গিয়েও তাকে ভোগ করতে হয়েছে নানা হয়রানি। এসব অভিজ্ঞতা থেকেই নিজের কোডিং দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে বন্ধু সাইফ কবিরকে সঙ্গে নিয়ে তৈরি করেন ‘ঘুষ.সাইট’ (ghush.site)।
গত ২১ আগস্ট চালু হওয়া এই ওয়েবসাইটে সাধারণ মানুষ সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সেবায় ঘুষ দাবি, হয়রানি ও অনিয়মের অভিজ্ঞতা জানাতে পারছেন। চালুর মাত্র নয় দিনের মধ্যেই এতে ৯ হাজার ৬৬৫টি অভিযোগ জমা পড়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। এসব অভিযোগে দাবিকৃত ঘুষের আনুমানিক পরিমাণ ৩২১ থেকে ৩৩২ কোটি টাকা।
এই প্ল্যাটফর্মে জমা পড়া অভিযোগের প্রভাবও ইতোমধ্যে দেখা যাচ্ছে। ময়মনসিংহের সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয়ে এক শিক্ষকের পরিবারের পাওনা টাকা ছাড় করতে ঘুষ দাবির অভিযোগে দুই কর্মচারীকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে।
শোকজ পাওয়া দুই কর্মচারী হলেন সদর উপজেলা শিক্ষা কার্যালয়ের হিসাব সহকারী এ এইচ এম নাদিরুল হাসান সবুজ এবং অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর মুহাম্মদ মজিবুর রহমান। সোমবার (৩১ আগস্ট) সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মনিকা পারভীন তাদের নোটিশ দেন। নোটিশে তিন কার্যদিবসের মধ্যে ঘুষ দাবি ও হয়রানির অভিযোগের বিষয়ে লিখিত ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে।
শাহেদের বাবা ও সাবেক ব্যাংক কর্মকর্তা শরীফুল ইসলাম শামীম জানান, ময়মনসিংহের আজমতপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক আমিনা খাতুন ২০২২ সালের ডিসেম্বরে মারা যান। এরপর তাঁর জমাকৃত প্রভিডেন্ট ফান্ডের প্রায় সাত লাখ টাকা তুলতে গিয়ে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে হয়রানির মুখে পড়তে হয়।
শরীফুল ইসলাম শামীমের অভিযোগ, ট্রেজারি অফিসে ১০ হাজার টাকা, জেলা শিক্ষা অফিসে ২০ হাজার টাকা এবং উপজেলা শিক্ষা অফিসে আট হাজার টাকা—মোট ৩৮ হাজার টাকা দিতে বাধ্য হন তিনি।
এরপর কল্যাণ তহবিলের দুই লাখ টাকা এবং চাকরিরত অবস্থায় মৃত্যুর সরকারি অনুদানের আট লাখ টাকা ছাড় করাতে আবারও এক লাখ টাকা ঘুষ দাবি করা হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি। টাকা না দিলে ফাইল আটকে রাখার হুমকি দেওয়া হয়েছিল বলেও জানান তিনি।
বিষয়টি শাহেদকে গভীরভাবে ভাবিয়ে তোলে। নিজের অভিজ্ঞতাকে অন্যদের অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত করে ঘুষ ও অনিয়মের চিত্র সামনে আনার উদ্যোগ নেন তিনি। বন্ধু সাইফ কবিরকে সঙ্গে নিয়ে তৈরি করেন ‘ঘুষ.সাইট’।
শাহেদ জানান, তাদের উদ্দেশ্য কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে ব্যক্তিগতভাবে অভিযুক্ত করা নয়। বরং দেশের বিভিন্ন দপ্তরে ঘুষ, হয়রানি ও অনিয়মের যে অভিজ্ঞতা সাধারণ মানুষকে প্রতিনিয়ত মোকাবিলা করতে হয়, সেসব তথ্য সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে আনা।
অভিযোগগুলো যাচাই-বাছাইয়ের জন্য চার সদস্যের একটি দল কাজ করছে। আইনি জটিলতা এড়াতে যাচাই না হওয়া অভিযোগে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নাম প্রকাশ করা হচ্ছে না।
সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) ময়মনসিংহ জেলা শাখার সহসভাপতি শরীফুজ্জামান টিটু বলেন, ঘুষের কারণে নাগরিক সেবা বাধাগ্রস্ত হয়। প্রযুক্তির মাধ্যমে এসব অভিযোগের তথ্য সংগ্রহের উদ্যোগ দুর্নীতি প্রতিরোধে সহায়ক হতে পারে।
ময়মনসিংহের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) আবদুল্লাহ আল মামুন জানান, তরুণদের এই উদ্যোগ পুলিশের নজরে এসেছে। কোনো অনিয়ম বা ঘুষের তথ্য পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) ময়মনসিংহের সহকারী পরিচালক রাজু মো. সারওয়ার হোসেনও জানান, ঘুষ দাবির বিষয়ে ভুক্তভোগীরা দুদকে অভিযোগ করতে পারেন। অভিযোগের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় অনুসন্ধান ও অভিযান চালানো হতে পারে।
মাত্র ১৭ বছর বয়সে ব্যক্তিগত ভোগান্তিকে শক্তিতে পরিণত করে শাহেদ যে উদ্যোগ নিয়েছেন, তা ইতোমধ্যেই আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ‘ঘুষ.সাইট’ কতটা কার্যকরভাবে সরকারি সেবায় ঘুষ ও অনিয়মের চিত্র তুলে ধরতে পারে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।