
দক্ষিণ-পশ্চিম ইউরোপের দেশ পর্তুগালে প্রকৃতির এক বিস্ময় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে শত শত প্রাচীন জলপাই গাছ। বছরের পর বছর নয়, বরং হাজার হাজার বছর ধরে টিকে থাকা এসব গাছ আজও জীবিত এবং অনেক গাছ নিয়মিত ফলও দিচ্ছে।
গবেষকদের ধারণা, পর্তুগালের কয়েকটি জলপাই গাছের বয়স দুই হাজার বছরেরও বেশি। এর মধ্যে কোনো কোনো গাছের বয়স তিন হাজার বছর ছাড়িয়ে গেছে। দীর্ঘ এই সময়ের মধ্যে অসংখ্য সভ্যতার উত্থান-পতন, যুদ্ধ, রাজনৈতিক পরিবর্তন ও সামাজিক রূপান্তরের সাক্ষী হয়েছে এসব গাছ।
পর্তুগালের ইউনিভার্সিটি অব ট্রাস-ওস-মন্টেস অ্যান্ড আল্টো দৌরো (ইউটিএডি) পরিচালিত গবেষণায় দেশটির প্রাচীন জলপাই গাছগুলোর বয়স ও দীর্ঘায়ু নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছে।
গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, পর্তুগালের সবচেয়ে প্রাচীন জলপাই গাছগুলোর একটি রয়েছে বেজা জেলার ভিডিগুেইরার হারদাদে দো পেসো এস্টেটে। ‘অলিভেইরা দো পেসো’ নামে পরিচিত এই গাছটির বয়স ২০২১ সালের মূল্যায়ন অনুযায়ী ৩ হাজার ৭০০ বছরেরও বেশি।
এত দীর্ঘ সময় ধরে টিকে থাকা এই গাছ শুধু বৈজ্ঞানিক গবেষণার বিষয় নয়, স্থানীয় মানুষের কাছেও এটি ঐতিহাসিক ও প্রাকৃতিক ঐতিহ্যের প্রতীক। ২০২৪ সালের পর্তুগিজ ‘ট্রি অব দ্য ইয়ার’ প্রতিযোগিতায়ও গাছটি তৃতীয় স্থান অর্জন করে।
পর্তুগালের আরেকটি বিখ্যাত প্রাচীন জলপাই গাছ হলো ‘অলিভেইরা দো মুচাও’। আব্রান্তেস পৌরসভায় থাকা এই গাছটির বয়স আনুমানিক ৩ হাজার ৩৫০ বছর।
গবেষকদের মতে, গাছটি ফিনিশীয়, সেল্টিবেরীয় ও রোমান সভ্যতার সময়েরও সাক্ষী। হাজার বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও গাছটি এখনো জীবিত এবং জলপাই উৎপাদন করে যাচ্ছে।
২০২২ সালের ইউরোপিয়ান ‘ট্রি অব দ্য ইয়ার’ প্রতিযোগিতায় প্রাচীন এই গাছটি পঞ্চম স্থান অর্জন করেছিল।
শুধু একটি বা দুটি এলাকায় নয়, পর্তুগালের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে রয়েছে শত শত পুরোনো জলপাই গাছ।
সান্তা ইরিয়া দে আজোয়ায় রয়েছে প্রায় ২ হাজার ৮৫০ বছরের পুরোনো একটি জলপাই গাছ। এ ছাড়া মনসারাজ, এস্ত্রেমোজ, মন্তেমোর-ও-নোভো, লাগোয়া, বেজা, ভিলামৌরা ও এভোরাসহ বিভিন্ন এলাকায় এমন প্রাচীন গাছের সন্ধান পাওয়া গেছে।
পোর্তোর সেরালভেস পার্কেও রয়েছে উল্লেখযোগ্য বয়সের জলপাই গাছ। এসব গাছের অনেকগুলো এখনো জীবিত থাকায় বিজ্ঞানীদের কাছে এগুলো বিশেষ আগ্রহের বিষয় হয়ে উঠেছে।
জলপাই গাছের দীর্ঘায়ুর পেছনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যগুলোর একটি হলো এর পুনরুজ্জীবিত হওয়ার ক্ষমতা।
গবেষকদের মতে, একটি গাছের কাণ্ডের পুরোনো বা ক্ষতিগ্রস্ত অংশ নষ্ট হয়ে গেলেও সেখান থেকে নতুন কুঁড়ি, শাখা ও গাছের অংশ তৈরি হতে পারে। ফলে মূল কাণ্ডের কোনো অংশ দুর্বল হয়ে পড়লেও গাছটি নতুনভাবে বেড়ে ওঠার সুযোগ পায়।
এ ছাড়া ভূমধ্যসাগরীয় আবহাওয়ার সঙ্গে জলপাই গাছ সহজেই মানিয়ে নিতে পারে। দীর্ঘ সময় বৃষ্টি না হলেও খরা সহ্য করার ক্ষমতা এবং প্রচণ্ড গরমের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার বৈশিষ্ট্য তাদের দীর্ঘজীবী হতে সহায়তা করে।
ইউটিএডির গবেষক হোসে লুইস লুজাডা, যিনি প্রাচীন জলপাই গাছের বয়স নির্ধারণের একটি বিশেষ পদ্ধতি তৈরি করেছেন, মনে করেন পরিবেশের পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার অসাধারণ সক্ষমতার কারণে জলপাই গাছ প্রকৃতির অন্যতম সফল দীর্ঘজীবী উদ্ভিদ।
প্রাচীন এসব জলপাই গাছের বয়স নির্ধারণের জন্য প্রচলিত পদ্ধতির পাশাপাশি হোসে লুইস লুজাডার উদ্ভাবিত ও পেটেন্ট করা একটি বিশেষ গাণিতিক পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে।
এ ক্ষেত্রে গাছের কাণ্ডের ব্যাস, পরিধি, উচ্চতা এবং অন্যান্য শারীরিক বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য বয়স নির্ণয় করা হয়। পর্তুগালের পাশাপাশি স্পেন ও ফ্রান্সের পুরোনো গাছের বয়স নির্ধারণেও এই পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে।
হাজার হাজার বছর ধরে পৃথিবীর পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে টিকে থাকা এসব জলপাই গাছ এখন শুধু জীববৈজ্ঞানিক গবেষণার বিষয় নয়, বরং পর্তুগালের প্রাকৃতিক ও ঐতিহাসিক ঐতিহ্যেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
মানুষের বহু প্রজন্মের জীবন পেরিয়ে আজও যেসব গাছ সবুজ রয়েছে এবং ফল দিচ্ছে, সেগুলো প্রকৃতির অসাধারণ সহনশীলতা ও পুনর্জীবন ক্ষমতার এক অনন্য উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।