
পাবনার ঈশ্বরদীতে সরকারি আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী এসব ঘর বরাদ্দ পাওয়ার পর অন্যের কাছে হস্তান্তর বা বিক্রির সুযোগ না থাকলেও উপজেলার মুলাডুলি ইউনিয়নের বহরপুর আশ্রয়ণ প্রকল্পে প্রকাশ্যেই ঘর কেনাবেচা চলছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা গেছে, বহরপুর আশ্রয়ণ প্রকল্পে নির্মিত ২০৮টি ঘরের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ঘরে বরাদ্দপ্রাপ্তরা বসবাস করছেন না। স্থানীয়দের দাবি, এসব ঘরের অনেকগুলো ৪০ হাজার থেকে ৮০ হাজার টাকার বিনিময়ে অন্যদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। কোনো কোনো ঘর একাধিকবার বিক্রি কিংবা ভাড়া দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
বাসিন্দাদের কয়েকজনের ভাষ্য, স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নিয়ে ঘরের দখল বুঝিয়ে দেওয়ার ঘটনা নিয়মিত ঘটেছে। তাদের দাবি, ঘর বিক্রির অর্থের বড় একটি অংশ চলে গেছে একটি স্থানীয় প্রভাবশালী চক্রের কাছে।
এ ঘটনায় উপজেলা জামায়াতের আইনবিষয়ক সম্পাদক হাফিজুর রহমান হাফিজ মেম্বারের নামও অভিযোগের সঙ্গে উঠে এসেছে। বাসিন্দাদের অভিযোগ, তার প্রভাব কাজে লাগিয়ে শফিকুল ইসলাম, রাজীব হোসেন ও পাপিয়া সুলতানা ওরফে পলিসহ কয়েকজন ঘর হস্তান্তরের মধ্যস্থতা করেছেন।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন হাফিজ মেম্বার। তার দাবি, একটি ঘর খালি থাকার খবর পেয়ে টুটুল নামে এক ব্যক্তিকে সেটি পাওয়ার ক্ষেত্রে সহযোগিতা করেছিলেন তিনি। কোনো অর্থ লেনদেনের সঙ্গে তিনি জড়িত নন বলেও দাবি করেন। তার ভাষ্য, অন্যরা তার নাম ব্যবহার করে সুবিধা নিয়ে থাকতে পারে।
অন্যদিকে, পাপিয়া সুলতানা পলি পরিচয় গোপন রেখে কথা বলার সময় দাবি করেন, তিনি নিজেই বরাদ্দপ্রাপ্তদের কাছ থেকে তিনটি ঘর নিয়েছেন। প্রতিবেদকের কাছে একটি ঘর দেওয়ার প্রস্তাবও দেন তিনি এবং এর জন্য ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা লাগবে বলে জানান। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এভাবে শতাধিক ঘর বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
রাজীব হোসেনও ঘর হাতবদলের বিষয়টি স্বীকার করেছেন বলে জানা গেছে। তার দাবি, কয়েকজন বাসিন্দা প্রকল্প ছেড়ে চলে যাওয়ার পর তাদের ঘরগুলো খালি পড়ে আছে। এসব ঘরের একটি ৫০ হাজার টাকার বিনিময়ে অন্য কাউকে দেওয়ার ব্যবস্থা করা সম্ভব বলেও তিনি জানান।
প্রকল্পের কয়েকজন বাসিন্দা জানান, আকলিমা খাতুন মারা যাওয়ার পর তার বরাদ্দ পাওয়া ঘরটি অনিক হোসেন কিনে সেখানে বসবাস করছেন। অনিকের দাবি, ঘরটির সঙ্গে জমির কাগজপত্রও তিনি পেয়েছেন।
চায়না বেগম জানান, তার আত্মীয় তরিকুল ইসলামের বরাদ্দ পাওয়া ঘরে তিনি দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করছেন। এর বিনিময়ে ৪০ হাজার টাকা পরিশোধ করেছেন বলে জানান তিনি।
এ ছাড়া নুর ইসলাম ৬০ হাজার টাকার বিনিময়ে জান্নাত আরার বরাদ্দ পাওয়া ঘর নিয়েছেন বলেও জানা গেছে। স্থানীয়দের দাবি, এ ধরনের আরও বহু লেনদেন হয়েছে। তাদের অভিযোগ, ঘরের প্রকৃত বরাদ্দপ্রাপ্তরা বিক্রির অর্থের সামান্য অংশ পেলেও বড় অংশ মধ্যস্থতাকারীদের হাতে গেছে।
শুধু ঘর বেচাকেনা নয়, প্রকল্পের অবকাঠামোগত সমস্যার কথাও জানিয়েছেন সেখানে থাকা বাসিন্দারা। তাদের অভিযোগ, পয়ঃনিষ্কাশন ও পানি নিষ্কাশনের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। সামান্য বৃষ্টিতেই বিভিন্ন স্থানে কাদাপানি জমে চলাচল কঠিন হয়ে পড়ে।
এ ছাড়া প্রকল্প এলাকায় কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত হওয়ায় অনেকে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হয়েছেন বলে জানান স্থানীয়রা। তাদের আরও অভিযোগ, মাদকাসক্তদের আনাগোনা ও মাদক ব্যবসাসহ বিভিন্ন অনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে প্রকল্পের পরিবেশ দিন দিন অনিরাপদ হয়ে উঠছে।
ঈশ্বরদী উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা সেহাব উদ্দিন সরকার বলেন, প্রকল্পের অনেক ঘরে বরাদ্দপ্রাপ্তরা না থাকায় সেগুলো নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা হচ্ছে না। কোথাও কোথাও পানি ও কাদা জমে থাকার বিষয়টিও তিনি স্বীকার করেন। সমস্যাগুলো সমাধানে দ্রুত উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
ঘর হস্তান্তর ও বিক্রির অভিযোগের বিষয়ে ঈশ্বরদী উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) আসাদুজ্জামান সরকার জানান, বিষয়টি প্রশাসনের নজরে এসেছে। নীতিমালা লঙ্ঘন করে যারা আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর অন্যের কাছে হস্তান্তর বা বিক্রি করেছেন, তাদের একটি তালিকা তৈরি করে জেলা প্রশাসকের কাছে পাঠানো হয়েছে।
তিনি জানান, আইনগত প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট দলিল বাতিলের কাজ শেষ হওয়ার পর ঘরগুলোর বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
এসি ল্যান্ডের ভাষ্য, যারা এসব ঘর কিনেছেন তাদের অধিকাংশই ভূমিহীন হওয়ায় মানবিক বিষয় বিবেচনায় তাদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তবে ঘর কেনাবেচার সঙ্গে জড়িত মধ্যস্থতাকারী ও অনৈতিক লেনদেনকারীদের বিষয়ে তদন্ত করে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে ঈশ্বরদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হাসান মোহাম্মদ শোয়াইবের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।