যেন কোনো ক্লান্ত দীর্ঘশ্বাসের ভঙ্গিতে ঘোষণাটা এলো। আর তা ছিল এক ‘আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘশ্বাস’। ঘোষণাটি হলো, আগামী বছরের একুশে বইমেলা বাতিল করা হবে। অথচ ফেব্রুয়ারির বার্ষিক এই উৎসব ঢাকায় ১৯৫২-র ভাষা শহীদদের স্মৃতিকে পবিত্র করে রাখে। ওই ঘোষণার কারণ হিসেবে অন্তর্বর্তী সরকারের যে ব্যাখ্যা ছিল, তা ভঙ্গুর। তেমনি তা ছিল অস্বচ্ছ যুক্তির আড়ালে এক গভীর সাংস্কৃতিক উদাসীনতাকে আড়াল করার প্রয়াস।
কিন্তু রাজনৈতিক বিভ্রান্তির বাইরেও খবরটি আমার কাছে ছিলো একান্তই অন্যকিছু, যা মন-মননে এক অস্থির কম্পন ছড়িয়ে দেয়। চিন্তাটি আমাকে ছিটকে দিলো নব্বইয়ের দশকের জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের দিনগুলোয়, এক উজ্জ্বল স্মৃতিতে। মনে পড়ে গেলো, একদিন বইমেলায় আমার বন্ধু রায়হানের সঙ্গে দেখা করার পরিকল্পনা ও পরবর্তী ঘটনা।
আমরা তখন ছিলাম এক স্বঘোষিত, নির্ঘুম বোহেমিয়ান পাঠকগোষ্ঠীর সদস্য। কালি, কফি আর অর্থের অন্তহীন অনুসন্ধানে এক অদ্ভুত ভ্রাতৃত্বে বাঁধা ছিলাম আমরা। আমাদের দেখা-সাক্ষাতের সময় কখনও নির্দিষ্ট হতো না; চুক্তিটা ছিল খুবই সহজ- বিকেলের শেষ আলোয় বাংলা একাডেমির ফটকের আশেপাশে গিয়ে একে অন্যকে খুঁজে নিতে হবে।
মনে পড়ে সেই বৈচিত্রময় ভিড়ের রঙিন বইমেলার কথা; চারদিকে নতুন মুদ্রিত বইয়ের গন্ধ, হাজারো কণ্ঠের সমবেত গুঞ্জন। তারপরই যেন পেটে একধরনের শঙ্কা জমে উঠলো। স্মরণ করতে চেষ্টা করি, মনের ভেতরে চলতে থাকা সেই কোরিওগ্রাফি, যার মাধ্যমে বিপুল জনস্রোতের ভেতরে আমরা কীভাবে একে-অন্যকে খুঁজে নিতাম। এই যে সুক্ষ্ম অন্তরঙ্গতা, সামাজিক আচার-ভদ্রতার সম্মিলন- সবই তো হয়েছিল স্মার্টফোন ছাড়াই।
সেই স্নায়ুর বোঝাপড়াগুলো কীভাবে করতাম আমরা- এখন খুবই মনে পড়ে। কিন্তু সেই সময়টা আর নেই, সব অন্তরঙ্গতা, মানসিক যন্ত্রণা থেকে মুক্তির ছোট ছোট অনুষঙ্গ, সবই এখন ঢাকা পড়ে গেছে ডিজিটাল জালে। আগের সেই সুক্ষ্ম অন্তরঙ্গতা, মানসপটের অসাধারণ মেলবন্ধন, সবকিছু যেন ছেঁটে ফেলা হয়েছে। এসব কিছু কেবল ভুলেই যাইনি; হারিয়ে ফেলেছি এক দক্ষতা। হারিয়ে ফেলেছি—হারিয়ে যাওয়ার শিল্পে আমাদের সাবলীলতা।
অন্ধকারের দিকে খোলা দরজা
‘অ্যা ফিল্ট লাইক টু গেটিং লস্ট’ বইয়ে লেখিকা রেবেকা সলনিট লিখেছেন, অজানার জন্য দরজাটা খোলা রাখো, সেই অন্ধকারের দিকেই খোলা দরজা। গুরুত্বপূর্ণ জিনিসগুলো সেখান থেকেই আসে।’ আমাদের স্মার্টফোন-পূর্ব যুগের সমন্বয়গুলো ছিলো ঠিক সেই দরজাটি খোলা রাখারই অনুশীলন।
রায়হানের সঙ্গে দেখা করার চুক্তিটা কোনো ডিজিটাল মানচিত্রে বসানো পিন ছিলো না- তা ছিলো এক ধরনের বিশ্বাসে ভর করা লম্ফন। এতে দরকার হতো অজানাকে মেনে নেওয়ার একটা ক্ষমতা। ছোট ছোট, কিন্তু সৃজনশীল উদ্বেগকে ধারণ করার স্বস্তি।
যদি সে দেরি করে? যদি আমরা একে অন্যকে খুঁজেই না পাই? এই অনিশ্চয়তায় ছিল না কোনো ত্রুটি বরং সেটাই ছিল গভীর অনুভূতির এক অপূর্ব অভিজ্ঞতা। সেই অজানা, যেখান থেকে হঠাৎ জন্মাতো অনিয়ন্ত্রিত পথ চলার শক্তি; বা ধরা দিত নীরব ধৈর্যের ভেতর জমে ওঠা ‘পর্যবেক্ষণ’। এখন সেই জ্ঞানগত ক্ষয় স্পষ্ট।
এ বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে আমেরিকান একাডেমিক ও ভিডিও গেম ডিজাইনার ইয়ান বোগোস্ট ‘Pruned cognitive skill’-এর কথা বলেছেন। অর্থাৎ আমাদের মস্তিষ্কের কিছু দক্ষতা যেন ছাঁটাই হয়ে গেছে। তার মতে, স্মার্টফোনগুলো আমাদের scaffolding বা স্বাধীনভাবে করতে পারার দক্ষতা কেড়ে নিয়েছে। আগে যে ভরসার খুঁটিগুলোতে আমাদের ‘অভ্যাস ও প্রক্রিয়া’ দাঁড়িয়ে থাকত—তা এখন বাহ্যিকভাবে সম্পন্ন হচ্ছে।
অর্থাৎ আগে আমরা নিজের স্মৃতি, অভ্যাস, পারিপার্শ্বিক ইঙ্গিত, মাটির গন্ধ- এসব ব্যবহার করে পথ খুঁজেছি; আর আজ ডিজিটাল ম্যাপে ক্লিক করলেই পাওয়া যায়। ফলে অনিশ্চত পথে নিজেদের সামলানোর দক্ষতা আমাদের মস্তিষ্ক থেকে ধীরে ধীরে ক্ষয় পাচ্ছে।
সেই মানসিক শক্তি কিংবা দৈনন্দিন অনিশ্চয়তা সামলে পথ খুঁজে নেওয়ার যে ক্ষমতা- নীরবে শুকিয়ে এসেছে। সলনিট যে ‘blue of distance’-এর কথা বলেছেন; সেই নীল অপেক্ষার, সম্ভাবনার, অজানা আকাঙ্ক্ষার রঙ—আমরা তা বিনিময় করে নিয়েছি জিপিএসের (global positioning system) নির্বীজ, নিখুঁত ছোট্ট নীল বিন্দুর সঙ্গে।
আমরা এখন জানি ঠিক কোথায় দাঁড়িয়ে আছি, কিন্তু হারিয়ে ফেলেছি—কোথায় পৌঁছাতে পারতাম, সেই অনুভূতিটুকু।
স্মার্টফোন যে দক্ষতা দিয়েছে, তার সঙ্গে লুকোনো খরচও এসেছে। গবেষকেরা একে বলেন ‘ডিজিটাল কগনিটিভ অ্যাট্রফি’ বা অতি ডিজিটাল আসক্তির কারণে স্নায়ু দুর্বল হয়ে পড়া। একুশে বইমেলায় দেখা-সাক্ষাতের মানসিক জটিলতাগুলো আসলে এই বৃহত্তর জ্ঞানগত পরিবর্তনের ক্ষুদ্র প্রতিরূপ।
হারিয়ে যাওয়ার এক চলচ্চিত্রিক পুনর্গঠন
যদি আমি নব্বই দশকের মাঝামাঝি বইমেলায় আমাদের সেই সমন্বয় প্রক্রিয়াকে একটি চলচ্চিত্রদৃশ্য হিসেবে দেখাতে করতে চাইতাম, তবে তা হতো হারিয়ে যাওয়া অনিশ্চয়তার প্রতি নিবেদিত এক প্রেমপত্র। প্রথম শটেই ধরা পড়ত মেলামাঠের প্রশস্ত, জনারণ্যভরা প্যানোরামা; মানুষের ঢেউ, স্টলের পর স্টল।
তারপর ক্যামেরা অনুসরণ করত আমার সেই তরুণ বয়সের ছায়াটিকে, যা ট্র্যাকিং-শটের নির্ভুল দৃষ্টি নয়; বরং একজন খুঁজে বেড়ানো তরুণের সীমাবদ্ধ, মানবিক দৃষ্টিকোণ। যে চেষ্টা করছে তার সেই মধ্যরাতি পাঠকগোষ্ঠীর আরেক সদস্যকে খুঁজে পেতে।
ক্যামেরা ধীরে ধীরে ভিড়ের মুখের ওপর দিয়ে সরে যেত—সলনিটের সেই blue of distance-এর অনুভূতি জাগিয়ে তুলত, অর্থাৎ খোঁজার আর পাওয়ার মাঝে যে টানটান, নেশাময় অনুভূতিটা। খোঁজাটা সেখানে কোনো সঙ্কট নয়, বরং গল্পের স্বাভাবিক উত্তেজনা।
কখনও হয়তো আমি কোনো এক স্টলের পাশে দাঁড়িয়ে থাকতাম, ধৈর্য নিয়ে পৃথিবীকে দেখতাম। অবশ্য এই ‘ধৈর্য’ এখন আমাদের কাছে প্রায় অপরিচিত। সেই অপেক্ষার মধ্যে হয়তো থাকতো নতুন কোনো প্রকাশক আবিষ্কার করা, কিংবা গার্সিয়া মার্কেস নিয়ে কোনো অচেনা মানুষের সঙ্গে আলাপে জড়িয়ে পড়ার বিস্ময়।
আর রায়হান আর আমি যখন ভিড়ের মধ্যে অবশেষে একে-অন্যকে খুঁজে পেতাম, দু’জনের মাথা নেড়ে স্বীকৃতির দৃশ্য চূড়ান্ত মুহূর্ত সৃষ্টি করতো, যেখানে ধৈর্য আর ভাগাভাগি করা মনের মানচিত্র ভিন্ন আঙ্গিক সৃষ্টি করতো। এই অনুভূতি বর্তমানের কোনো স্মার্টফোনে ক্ষুদে বার্তায় অর্জিত হয় না। বরং উপস্থিতির মাধ্যমে দুজনের ছোট্ট গোপন মনে জেগে উঠত অনুভূতির এক বিজয়গাঁথা।
ধৈর্য ও স্মৃতিলুপ্তির বিদ্যা
এই পুরো আচারটাই দাঁড়িয়ে এক গভীর ও অন্তর্নিহিত অনিশ্চয়তার স্বস্তির ওপর। এটা নির্ভর করে দিশাহীনতায় জন্মানো এক যৌথ মনের ভূগোলের ওপর- যার ভিত্তি শুধুই পরিচিত মুখ, অভিজ্ঞতা আর পারস্পরিক বোঝাপড়ায়; কোনো ডিজিটাল স্থানাঙ্ক এখানে কাজ করবে না। পুরো চিত্রপটে যে ধৈর্য লুকায়িত আছে, যেটিকে শেরি টার্কল ‘সাত মিনিটের নিয়ম’ হিসেবে ব্যখ্যা করেছেন। কোনো আলোচনায় আকর্ষণ আছে কিনা তা বোঝার জন্য সাত মিনিট সময়ের উদাহরণ টেনেছেন তিনি। আজকাল কোনো কাজে ধৈর্য প্রদর্শন বা নির্দিষ্ট সময় উপেক্ষা করার বিষয়টি কমই মানা হয়। কারণ এখন মানুষ অপেক্ষার শূন্য মুহূর্তেই স্মার্টফোনে ফিরে যায়।
আমাদের স্মৃতিও ঠিক একইরকম গভীরভাবে রূপান্তরিত হয়েছে। আমরা এখন ‘গুগল ইফেক্ট’-এর সঙ্গে বাস করি, যেখানে আমরা তথ্য মনে করার জন্য কম চেষ্টা করি। যা ইতোমধ্যেই মনের বাইরে সংরক্ষিত আছে। আমরা আমাদের অতীতকেও গুরুত্বহীন করে তুলেছি; ঠিক যেমন আমরা আমাদের দিকনির্দেশনার বোধকেও জীবনের কেন্দ্রে রাখি না।
চূড়ান্ত, বন্ধ দরজা
একুশে বইমেলা ছিল কেবল একটি বাজার নয়- এটি হারিয়ে যাওয়া শিল্পের এক নাট্যমঞ্চ। News of the World সিনেমায় যেমন সমবেতভাবে পত্রিকা পাঠের দৃশ্য দেখা যায়- যা ছিল একটি অদ্ভূত রূপান্তরের প্রক্রিয়া; যেখানে গল্পগুলো কেবল পড়া নয়, জীবনের সঙ্গে যাপিতও হয়।
অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্তে যে শঙ্কা আমি অনুভব করেছিলাম, তা সেই বন্ধ দরজার ঠান্ডা থেকেই জন্ম নিয়েছিল। সিদ্ধান্তটি হয়তো যৌক্তিক বোধ তৈরি করবে না, কিন্তু আমার প্রতিক্রিয়া অনুধাবনযোগ্য। এটা একইসঙ্গে আমাদের পরিত্যক্ত জ্ঞানগত দৃশ্যপটের; হারিয়ে যাওয়া মনের মানচিত্রের জন্য শোক।
সলনিট প্রশ্ন তোলেন, আপনি কীভাবে খুঁজবেন সেই জিনিসটি- যার প্রকৃতি আপনার সম্পূর্ণ অজানা? এটাই হারিয়ে যাওয়া মনোজগতের অন্তর্নিহিত দার্শনিক প্রশ্ন। আমরা এমন একটি বিশ্ব তৈরি করেছি, যেখানে আমাদের আর কখনও সেই প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে না। আর এভাবেই আমরা খুঁজে দেখার সক্ষমতা হারিয়েছি।
সম্ভবত অগ্রগতির পথ প্রযুক্তিকে প্রত্যাখ্যান করা নয়, বরং মাঝে মাঝে তা সচেতনভাবে ভুলে যাওয়া হয়। ফোন ছাড়াই ভিড়ের মধ্যে পা দেওয়া; কোনো সময় ও স্থান ঠিক করা এবং মধ্যবর্তী সেই ভয়ঙ্কর, সুন্দর সম্ভাবনার সঙ্গে মিলিত হওয়া…সেই হারিয়ে যাওয়ার শিল্পেই আমরা সত্যিকার অর্থেই নিজেদের খুঁজে পাই।
লেখক- নীতি বিশ্লেষক এবং উদ্যোক্তা