নির্বাচন ঘিরে অস্থিতিশীলতার শঙ্কা: নিরাপত্তা বিশ্লেষণে বহুমাত্রিক ষড়যন্ত্রের আভাস
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে কেন্দ্র করে দেশকে অস্থিতিশীল করার একটি পরিকল্পিত ও বহুস্তরীয় ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নের আশঙ্কা প্রকাশ করেছে বিভিন্ন নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থা। সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিকল্পনার মূল উদ্দেশ্য হলো নির্বাচন প্রক্রিয়া ব্যাহত করা, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে সহিংস রূপ দেওয়া এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পুরো নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলা।
নিরাপত্তা সূত্রগুলো বলছে, সীমান্তের ওপার থেকে পরিচালিত কিছু অপশক্তি, পলাতক রাজনৈতিক-প্রশাসনিক ব্যক্তি এবং উগ্রবাদী সংগঠনের একটি নেটওয়ার্ক এ পরিকল্পনার সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে। অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে উসকানিমূলক প্রচারণা, ভুয়া ভিডিও ছড়ানো এবং বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচারের মাধ্যমে মাঠপর্যায়ে উত্তেজনা তৈরির চেষ্টা চলছে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে। অর্থের বিনিময়ে সশস্ত্র গ্রুপ সক্রিয় করার ঝুঁকিও উড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে না।
‘ক্রিটিক্যাল ফেজ’ ও সম্ভাব্য নাশকতা
গোয়েন্দা তথ্যে জানা গেছে, নির্বাচনের আগে একটি ঝুঁকিপূর্ণ সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে, যাকে ‘ক্রিটিক্যাল ফেজ’ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এ সময়ে টার্গেট কিলিং, সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টি, রাজনৈতিক সমাবেশে হামলা এবং গুজব ছড়িয়ে মনস্তাত্ত্বিক চাপ তৈরির অপচেষ্টা হতে পারে।
বিশ্লেষণে আরও উঠে এসেছে—প্রথম ধাপে প্রধান বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যে ছোট সংঘর্ষকে বড় সহিংসতায় রূপ দেওয়ার চেষ্টা হতে পারে। মিছিল বা সমাবেশে হামলা, স্পর্শকাতর ইস্যু ব্যবহার এবং নারী নির্যাতনের মতো ঘটনা উসকে দিয়ে পরিস্থিতি ঘোলাটে করার আশঙ্কা করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন স্থানে অনলাইন গুজবের মাধ্যমে কর্মীদের মধ্যে বিভাজন তৈরির লক্ষণ দেখা যাচ্ছে বলেও দাবি করা হয়েছে।
উগ্রবাদী নেটওয়ার্ক ও পলাতক সদস্যদের সতর্কতা
গোয়েন্দা সংস্থাগুলো জানিয়েছে, অতীতে উগ্রবাদে জড়িয়ে পড়া কিছু তরুণকে পুনরায় সক্রিয় করার পরিকল্পনার তথ্য পাওয়া গেছে। বিশেষ করে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠনের পলাতক সদস্যদের ঘিরে উচ্চ সতর্কতা জারি করা হয়েছে। এদের কেউ কেউ বিদেশে অবস্থান করে সমন্বয় করছে এবং সীমান্তপথে অনুপ্রবেশের ঝুঁকি রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ধর্মীয় আবেগ, আন্তর্জাতিক মুসলিম ইস্যু এবং রাজনৈতিক অসন্তোষকে কাজে লাগিয়ে তরুণদের প্রভাবিত করার অপচেষ্টার কথাও উঠে এসেছে বিশ্লেষণে। অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, এনক্রিপ্টেড যোগাযোগ এবং বিচ্ছিন্ন সেলভিত্তিক (‘লোন উলফ’) কৌশল ব্যবহারের ফলে তাদের শনাক্ত করা কঠিন হয়ে উঠছে।
সীমান্তপথে অনুপ্রবেশের আশঙ্কা
নিরাপত্তা মূল্যায়নে বলা হয়েছে, সীমান্তবর্তী কয়েকটি এলাকা বিশেষ ঝুঁকিতে রয়েছে। সেখানে অবৈধ অস্ত্র, বিস্ফোরক এবং প্রশিক্ষিত হামলাকারী ঢুকিয়ে নাশকতা ঘটানোর চেষ্টা হতে পারে। এ কারণে সংশ্লিষ্ট সীমান্ত অঞ্চলে বাড়তি নজরদারি, ড্রোন পর্যবেক্ষণ ও থার্মাল ইমেজিং প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে।
সম্ভাব্য টার্গেট কিলিং ও রাজনৈতিক অস্থিরতা
উদীয়মান রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও আন্দোলনের সামনের সারির ব্যক্তিদের ওপর হামলার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া হয়নি। এমন হামলা ঘটলে একদিকে নেতৃত্বে শূন্যতা তৈরি হবে, অন্যদিকে দায় প্রতিপক্ষের ওপর চাপিয়ে সংঘাত বাড়ানো সহজ হবে—এমন বিশ্লেষণ দিয়েছে সংশ্লিষ্ট মহল। ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের নিরাপত্তা জোরদারের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
ডিজিটাল ‘মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ’
গোয়েন্দারা মনে করছেন, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম এই ষড়যন্ত্রের বড় মাধ্যম। ভুয়া হামলার ভিডিও, বানোয়াট ব্যালট ছিনতাই দৃশ্য কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় তৈরি ভুয়া অডিও ছড়িয়ে জনমনে আতঙ্ক তৈরির চেষ্টা চলছে। এ ধরনের সাইবার অপপ্রচার মোকাবিলায় বিশেষায়িত ইউনিটকে সক্রিয় রাখা হয়েছে।
রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা প্রস্তুতি
নির্বাচন ঘিরে সরকার ব্যাপক নিরাপত্তা বলয় গড়ে তুলেছে। সেনাবাহিনী, পুলিশ, র্যাব, আনসার, বিজিবি ও কোস্ট গার্ডসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিপুলসংখ্যক সদস্য মাঠে থাকবে। ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে সিসিটিভি, ড্রোন নজরদারি, ডগ স্কোয়াড ও বডি-ওর্ন ক্যামেরা ব্যবহারের পরিকল্পনাও রয়েছে।
আন্তর্জাতিক সতর্কতা ও নাগরিক সচেতনতা
বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় কয়েকটি দেশ তাদের নাগরিকদের জন্য নিরাপত্তা সতর্কতা জারি করেছে। সন্দেহজনক বস্তু, গুজব বা উসকানিমূলক তথ্য দেখলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানাতে বলা হয়েছে। বিশেষ করে নির্বাচনের আগের ৭২ ঘণ্টাকে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সময় হিসেবে ধরা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতামত
নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, সম্ভাব্য ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করতে গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার, সীমান্ত সতর্কতা বৃদ্ধি এবং জনসচেতনতা বাড়ানো জরুরি। গুজব যাচাই ছাড়া শেয়ার না করা এবং সন্দেহজনক তৎপরতা দ্রুত জানানো—এসব পদক্ষেপ বড় ধরনের নাশকতা প্রতিরোধে সহায়ক হতে পারে।