সাহিত্য-স্মৃতিকথায় ষাটের দশকের প্রতিচ্ছবি

আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ একজন বহুমাত্রিক মানুষ। সুনিপুন সংগঠক, সুবক্তা, সাবলীল-সুদক্ষ উপস্থাপক, অনুষ্ঠান পরিচালক, পরিবেশ আন্দোলন কর্মী, লেখক এমন অসংখ্য পরিচয়ে প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি স্বতন্ত্র। তার সবগুলো পরিচয়ের মধ্যে সবচেয়ে কম চর্চিত বোধহয় লেখক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ! বহুমাত্রিক জীবনের নানা অধ্যায়, দৃষ্টিভঙ্গি, দর্শন, পারিপার্শ্বিকতাকে পর্যবেক্ষণে উঠিয়ে এনে তিনি নির্মাণ করেছেন এক সমৃদ্ধ লেখনির জগত। গল্প, কবিতা, উপন্যাসে লেখক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের বিচরণ যৎসামান্য হলেও স্মৃতিকথায় তার বিচরণ উজ্জ্বল, সাবলীল, অনন্য।

বর্ণাঢ্য জীবন অতিক্রম করা এই কর্মবীরের জীবনকে দেখার ধরণ, চারপাশের মানুষগুলোকে পর্যবেক্ষণ সর্বপরি সময়টাকে বিশদ করে দেখার সমন্বয়ে তার স্মৃতিকথাগুলো কেবল সাহিত্যই নয়, হয়ে উঠেছে সময়ের আয়না।

বাঙালির জীবনে নানা কারণেই ৬০ এর দশক তাৎপর্যপূর্ণ। বাংলার সাহিত্যাকাশেও এসময় জ্বলজ্বলে অবস্থান ছিল একঝাঁক উজ্জ্বল নক্ষত্রের। কণ্ঠস্বর নামক এক সাহিত্যপত্রিকা অথবা বলা ভালো এক স্বপ্ন ঘিরে সাহিত্যচর্চায় ছিল যাদের সমান্তরাল পথচলা। কণ্ঠস্বর নামক সেই সাহিত্য পত্রিকা কে ঘিরেই স্মৃতিকথামূলক বই ‘ভালোবাসার সাম্পান’ লিখেছেন আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। তার সম্পাদনায় অদম্য তরুণের ভালোবাসার এই সাম্পানে চড়ে বসা যেন টাইম মেশিনে চড়ে ৬০ এর দশকের ঐ সময়টাতে ফেরত যাওয়া।

“কোথা লিখে রাখি এত প্রিয় নাম যারা পাশাপাশি একদা ছিলাম!”

মহাদেব সাহার লেখা লাইন দুটো দিয়ে সূচিপত্রের আগে একটা বিশেষ পাতা দেয়া হয়েছে ভালোবাসার সাম্পানে। উদ্দাম তারুণ্যের উম্মাতাল সময়টাকে ঘিরেই লেখকের এই উপলব্ধি। তবে তিনি যে নিপুণতায়, শব্দের ঝংকারে সময়টাকে এই বইতে তুলে ধরেছেন তা পাঠককে ঐ উম্মাতাল সময়ে নিশ্চিতভাবেই নিয়ে যেতে পেরেছে এবং একই সঙ্গে ঐ সময়ের প্রধানতম লেখক কবিদের সাথে গাঢ় পরিচয় করিয়ে দিতে পেরেছে।

পত্রিকা প্রকাশের অভিজ্ঞতা, প্রকাশের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থসংস্থান বা তৈরি লেখকগুচ্ছ কিছুই ছিল না তবু সাহস আর স্বপ্নকে সম্বল করে একদল তরুণের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছিল ৬০ দশকের জনপ্রিয়তম সাহিত্য পত্রিকা।

লেখক বইটিতে উল্লেখ করেছেন ‘তবু যত দীন আর নিঃস্বই আমরা হই না কেন, একটা জায়গায় আমাদের শক্তি কিন্তু সবার উপরে।…….আমরা ভোরের আলোর মত অপরিমেয়। আকাশের তারার মতো, পাখির মতো, সমূদ্রের ঢেউয়ের মতো, সৈকতের বালুর মতো আমরা অন্তহীন, অগণ্য। সেজন্য আমাদের পত্রিকা আপসহীনতার পত্রিকা, দুঃসাহস আর বিদ্রোহের পত্রিকা।’

বইয়ের পরতে পরতে এই তরুণ তুর্কীদের এমন সাহসের গল্প চমৎকার গেঁথে তুলেছেন লেখক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। স্নিগ্ধ জীবনানুভূতি নিয়ে পত্রিকা প্রকাশের মত রূঢ় বাস্তব ও বৈষয়িক বিষয়ের মুখোমুখি হওয়ার গল্পটা পাঠক হিসেবে রোমাঞ্চিতও করেছে।

লেখক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের অন্যতম মুন্সিয়ানা মানুষকে পর্যবেক্ষণে এবং উপস্থাপনে। ভালোবাসার সাম্পানে লেখকের বর্ণনায় ৬০ দশকের সাহিত্য নক্ষত্রদের কে যেন ভিন্নরূপে দেখার সুযোগ। নির্মলেন্দু গুণকে নিয়ে লিখেছেন ‘আমাদের পরিচিত জগতে তার মতো এমন স্ব-স্বভাবী, স্বতন্ত্র ও জীবন্ত মানুষ আমি দেখিনি। …..জীবনের যে-কোনও বিষয়ের উচ্চারণে ছিলেন দুঃসাহসী ও অকপট। …আজীবন কবিতায় এই নগ্ন অলজ্জিত ও জ্বলন্ত মানুষটির ছবিই তিনি সততার সঙ্গে একেছেন” 

সাম্পানে যাদের দেখা পাওয়া যায় তাদের সবার সম্পর্কে এমন কাব্যিক বর্ণনা দিয়েছেন লেখক।

প্রথাগত সাহিত্যকে ভেঙে এক নতুন যুগ সৃষ্টির প্রামাণ্য দলিল কষ্ঠস্বর। কণ্ঠস্বর প্রকাশের এক একটি প্রচ্ছদ, এক একটি লেখা, কণ্ঠস্বরকে রঙিন করে তোলা, পাঠকের প্রতিক্রিয়া, সেই সময় প্রকাশিত অনন্যা সাহিত্য পত্রিকার গল্পগুলো পড়া, যেন তারিয়ে তারিয়ে ঐ যাত্রাপথটাকেই উপভোগ করা। ঐ সময়টিতে এই সম্পাদক এবং লেখকগোষ্ঠির ব্যক্তি জীবনের টুকরো ঘটনাগুলো সাম্পানকে আরো জীবন্ত করে তুলেছে।

বইয়ের শুরু থেকে প্রেক্ষাপটসহ বিস্তারিত বর্ণনা একটু একটু করে এগিয়ে নিয়ে গেলেও বইয়ের শেষটা তে এসে সামান্য একটু যেন অগোছালো। জনপ্রিয়তার তুঙ্গে থাকা পত্রিকাটির প্রকাশ বন্ধ করে দেয়ার যে সিদ্ধান্ত সম্পাদক নিয়েছিলেন সেই গল্পটা জানার আরো একটু তৃষ্ণা পাঠক হিসেবে থেকে গেল।

বইয়ের শেষে কণ্ঠস্বর নিয়ে মুনীর চৌধুরীর ভাষণের খানিকটা সংযুক্ত করে দেয়া হয়েছে। সেখানে তিনি বলেছেন ‘কণ্ঠস্বরগোষ্ঠীর সাহিত্য পূর্ব পাকিস্তানের সাহিত্যের প্রধানতম দুর্বলতাগুলোর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ সোচ্চার হয়ে উঠেছে। আমার বারবার মনে হয়েছে গ্রাম্যতা, কূপমণ্ডূকতা, আঞ্চলিকতা, অতিসরলতা-এসবই হচ্ছে আমাদের সাহিত্যের প্রধানতম দুর্বলতা। কণ্ঠস্বরগোষ্ঠী এসবের বিরুদ্ধে নাগরিকতা, বৈদগ্ধ্য, পরিশীলত মানস ও সংস্কৃতিপরায়ণতার ছাপ সাহিত্যের ক্ষেত্রে ফেলতে চেষ্টা করছে। এটা সর্বাংশে অভিনন্দনযোগ্য।’

স্বপ্ন, সাহস, বন্ধুতা, সাহিত্য, ইতিহাস, যূথবদ্ধতা, জাগ্রত বোধ, নতুনকে তৈরির এক অনন্য উদযাপন- আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের ভালোবাসার সাম্পান।