অদম্য ইচ্ছাশক্তির নাম আরিফিন শুভ। সময়ের স্রোতে যে তরুণ একদিন পকেটে সামান্য টাকা আর চোখভরা স্বপ্ন নিয়ে ঢাকায় এসেছিলেন, তিনিই আজ ঢালিউডের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য নায়কদের একজন। জন্মদিনে ফিরে তাকালে তাঁর জীবন যেন সংগ্রাম, অপেক্ষা আর নিজের ওপর বিশ্বাস রাখার এক দীর্ঘ যাত্রার গল্প।
আজ থেকে প্রায় দুই দশক আগে ময়মনসিংহ থেকে ঢাকায় পা রাখেন আরিফিন শুভ। লক্ষ্য একটাই—অভিনেতা হওয়া। শুরুতে নবাবপুরের একটি মেসে ঠাঁই নেন। কাজের সন্ধানে ছুটেছেন এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায়। কখনো খেয়ে, কখনো না খেয়ে দিন কাটিয়েছেন। বাস্তবতা দ্রুতই কঠিন হয়ে ওঠে। অর্থের টানাপোড়েনে কিছুদিনের মধ্যেই ঢাকায় থাকা অসম্ভব হয়ে পড়ে। বাধ্য হয়ে ফিরে যান ময়মনসিংহে।
কিন্তু স্বপ্ন থেমে থাকেনি। কিছুদিন পর বিটিভির একটি ফ্যাশন শোতে অংশ নেওয়ার সুযোগ আসে। তখনো ঢাকায় যাওয়ার মতো অর্থ ছিল না। বন্ধুরাই ভরসা হয়ে পাশে দাঁড়ান। সবার কাছ থেকে জোগাড় হয় মাত্র ২৫৭ টাকা। সেই সামান্য টাকাই হয়ে ওঠে তাঁর জীবনের মোড় ঘোরানো সম্বল। ওই ২৫৭ টাকা নিয়েই আবার ট্রেনে চড়ে ঢাকায় ফেরেন শুভ। সেখান থেকেই শুরু হয় তাঁর নতুন পথচলা।
ঢাকায় ফিরে প্রথমে র্যাম্প মডেলিং শুরু করেন তিনি। পাশাপাশি কাজ করেন রেডিওতে আরজে হিসেবেও। ধীরে ধীরে বিনোদন অঙ্গনে পরিচিত মুখ হয়ে উঠতে থাকেন। ২০০৭ সালে একটি টুথপেস্টের বিজ্ঞাপনচিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে প্রথম বড় পরিসরে আলোচনায় আসেন শুভ। বিজ্ঞাপনের পর নাটকে নিয়মিত কাজ শুরু করেন, আর অল্প সময়ের মধ্যেই দর্শকের নজর কাড়েন তাঁর অভিনয় দক্ষতা।
অভিনয়ের আগে পথটা সহজ ছিল না। একসময় প্রোডাকশন ইউনিটে সহকারী পরিচালক হিসেবেও কাজ করেছেন শুভ। নিজের সংগ্রামের দিনের কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, শুটিং সেটে পরিচালকের নির্দেশ পালন করা থেকে শুরু করে শিল্পীদের প্রয়োজনীয় কাজ করা—সবই করতে হতো। কিন্তু সেখানেই থেমে থাকেননি তিনি।
মডেলিংয়ের অভিজ্ঞতাও ছিল বৈচিত্র্যময়। এক শুটিংয়ের স্মৃতি তুলে ধরে শুভ একবার বলেছিলেন, একটি বিজ্ঞাপনে যেখানে মূল চরিত্রে ছিলেন অন্য একজন, সেখানে তিনি ছিলেন “ছাগলের তিন নম্বর বাচ্চা।” তবু তাঁর স্বপ্ন ছিল বড়—সেই জায়গা থেকেই উঠে এসে আজ তিনি বড় পর্দার নায়ক।
২০১০ সালে খিজির হায়াত খান পরিচালিত ‘জাগো’ সিনেমার মাধ্যমে বড় পর্দায় অভিষেক হয় আরিফিন শুভর। এরপর ২০১২ সালে মোস্তফা কামাল রাজ পরিচালিত ‘ছায়াছবি’তে অভিনয় করেন তিনি, যদিও সিনেমাটি মুক্তি পায়নি। সেই ছবিতে তাঁর সহশিল্পী ছিলেন পূর্ণিমা। এরপর আর পেছনে তাকাতে হয়নি। একে একে অভিনয় করেন ‘পূর্ণদৈর্ঘ্য প্রেমকাহিনী’, ‘ভালোবাসা জিন্দাবাদ’, ‘অগ্নি’, ‘তারকাঁটা’, ‘কিস্তিমাত’, ‘ছুঁয়ে দিলে মন’, ‘আয়নাবাজি’, ‘ধ্যাততেরিকি’, ‘ঢাকা অ্যাটাক’, ‘মিশন এক্সট্রিম’, ‘মুজিব: একটি জাতির রূপকার’, ‘নীলচক্র’ ও ‘নূর’–এর মতো আলোচিত সিনেমায়।
বহুমাত্রিক চরিত্রে নিজেকে ভেঙে–গড়ে অভিনয় করার ক্ষমতার মাধ্যমে শুভ ধীরে ধীরে জায়গা করে নেন ঢালিউডের প্রথম সারিতে। ২০১৭ সালে ‘ঢাকা অ্যাটাক’ সিনেমায় অনবদ্য অভিনয়ের জন্য তিনি অর্জন করেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের সেরা অভিনেতার সম্মান—যা তাঁর ক্যারিয়ারের এক বড় স্বীকৃতি।
দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও কাজ করেছেন শুভ। কিংবদন্তি নির্মাতা শ্যাম বেনেগালের পরিচালনায় ‘মুজিব’ সিনেমায় অভিনয় করা তাঁর অভিনয়জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। সাম্প্রতিক সময়ে বলিউডের ওয়েব সিরিজ ‘জ্যাজ সিটি’তেও অভিনয় করে নতুন দর্শকের কাছে পরিচিত হয়েছেন তিনি।
জন্মদিন নিয়ে খুব বেশি আনুষ্ঠানিকতা পছন্দ করেন না আরিফিন শুভ। তবে ‘মুজিব’ সিনেমার শুটিং চলাকালে মুম্বাইয়ে কাটানো একটি জন্মদিন তাঁর কাছে আজও বিশেষ স্মৃতি হয়ে আছে। সে অভিজ্ঞতা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ময়মনসিংহ থেকে ২৫৭ টাকা নিয়ে ঢাকায় আসা সেই ছেলেটির জন্য একদিন মুম্বাইয়ের শুটিং সেটে জন্মদিন উদ্যাপন হবে—এই ভাবনাই তাঁর কাছে স্বপ্নের মতো লেগেছিল।
বর্তমানে ‘মালিক’ সিনেমার শুটিং নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন শুভ। এর পাশাপাশি অনম বিশ্বাস পরিচালিত ‘ঠিকানা বাংলাদেশ’ ছবির শুটিংও শেষ করেছেন তিনি, যেখানে তাঁর সহশিল্পী নুসরাত ফারিয়া।
২৫৭ টাকা নিয়ে ট্রেনে চড়ে ঢাকায় আসা সেই তরুণের গল্প কেবল একজন অভিনেতার সফল হওয়ার গল্প নয়। এটি অধ্যবসায়, আত্মবিশ্বাস আর স্বপ্নকে আঁকড়ে ধরে এগিয়ে যাওয়ার এক জীবন্ত উদাহরণ। আরিফিন শুভ প্রমাণ করেছেন—সাফল্য কখনো হঠাৎ আসে না; আসে সময়, শ্রম আর নিজের ওপর বিশ্বাস রাখার মধ্য দিয়ে। জন্মদিনে তাঁর এই দীর্ঘ পথচলার গল্প তাই নতুন প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণারই আরেক নাম।