বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ প্রকাশিত ‘গ্লোবাল ফিনডেক্স ডেটাবেজ ২০২৫’ প্রতিবেদনে বাংলাদেশের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি ও ডিজিটাল লেনদেন পরিস্থিতির একটি স্পষ্ট চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে ব্যাংক হিসাব, মোবাইল ফোনের ব্যবহার, ইন্টারনেট সংযোগ এবং ডিজিটাল আর্থিক লেনদেন–সংক্রান্ত বিভিন্ন সূচকের তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেট ব্যবহারের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়লেও আনুষ্ঠানিক আর্থিক সেবায় অংশগ্রহণ এবং ডিজিটাল লেনদেনে অগ্রগতি তুলনামূলকভাবে ধীরগতির। বিশেষ করে দৈনন্দিন কেনাকাটা ও সেবা গ্রহণে ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবহারে এখনো বড় একটি অংশ পিছিয়ে রয়েছে।
বর্তমানে দেশের মানুষ দোকানে বা অনলাইনে কেনাকাটায় মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস), ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করছেন। সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন ফি ও বিল পরিশোধ, ব্যক্তি পর্যায়ের অর্থ লেনদেন এবং সরকারি বেতন-ভাতা গ্রহণেও এসব ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহৃত হচ্ছে। তবুও সামগ্রিক অংশগ্রহণ প্রত্যাশার তুলনায় কম।
বিশ্বব্যাংকের হিসাব বলছে, বাংলাদেশের প্রাপ্তবয়স্ক জনগোষ্ঠীর মাত্র ৪৩ শতাংশের কোনো না কোনো আনুষ্ঠানিক আর্থিক হিসাব রয়েছে—যা ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বা এমএফএস প্ল্যাটফর্মে খোলা। অন্যদিকে ডিজিটাল লেনদেনে যুক্ত আছেন মাত্র ৩৪ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিক।
তথ্য অনুযায়ী, দেশে ৮২ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের হাতে মোবাইল ফোন রয়েছে এবং প্রায় ৪৪ শতাংশ মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করেন। অর্থাৎ মোট জনসংখ্যার অর্ধেকেরও কম ইন্টারনেট সুবিধার আওতায় রয়েছে। আবার যাঁরা ইন্টারনেট ব্যবহার করেন, তাঁদের সবাই ডিজিটাল আর্থিক লেনদেনে যুক্ত নন।
ডিজিটাল লেনদেনের ক্ষেত্রে আঞ্চলিক ও প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশ পিছিয়ে রয়েছে। ভারতে প্রাপ্তবয়স্ক জনগোষ্ঠীর ৮৯ শতাংশের ব্যাংক হিসাব রয়েছে এবং ৪৮ শতাংশ মানুষ ডিজিটাল লেনদেন করেন। চীনে এই হার আরও বেশি—সেখানে প্রায় ৮৯ শতাংশ মানুষ ডিজিটাল মাধ্যমে অর্থ লেনদেন করেন।
এ ছাড়া থাইল্যান্ডে ৮৩ শতাংশ, মালয়েশিয়ায় ৭৭ শতাংশ, তুরস্কে ৭১ শতাংশ, ভিয়েতনামে ৬২ শতাংশ, শ্রীলঙ্কায় ৪৭ শতাংশ এবং ইন্দোনেশিয়ায় ৪৩ শতাংশ মানুষ ডিজিটাল লেনদেনে যুক্ত। প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের চেয়েও পিছিয়ে রয়েছে নেপাল (২৮ শতাংশ) ও পাকিস্তান (২৫ শতাংশ)।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে আরও উঠে এসেছে, ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থায় নারী ও স্বল্প আয়ের জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ তুলনামূলকভাবে কম। একই চিত্র দেখা যায় সঞ্চয় ও ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রেও।
বাংলাদেশে মাত্র ১১ শতাংশ মানুষ আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থায় সঞ্চয় করেন এবং মাত্র ১৩ শতাংশ মানুষ ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ গ্রহণ করেন। যেখানে চীনে ৬৭ শতাংশ, থাইল্যান্ডে ৫৪ শতাংশ, মালয়েশিয়ায় ৫২ শতাংশ এবং ভিয়েতনামে ৪৫ শতাংশ মানুষ আনুষ্ঠানিক মাধ্যমে সঞ্চয় করেন। ভারতের ক্ষেত্রে এই হার ২৭ শতাংশ, শ্রীলঙ্কায় ২৩ শতাংশ এবং পাকিস্তানে ১৩ শতাংশ।
ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রেও চীন এগিয়ে রয়েছে—সেখানে ৪১ শতাংশ মানুষ আনুষ্ঠানিক ঋণ সুবিধা নেন। থাইল্যান্ড ও শ্রীলঙ্কায় এই হার ১৮ শতাংশ, আর মালয়েশিয়া ও ভারতে ১৫ শতাংশ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেট ব্যবহারের বিস্তৃত ভিত্তিকে কাজে লাগিয়ে ডিজিটাল আর্থিক সেবার পরিধি আরও বাড়ানো জরুরি। বিশেষ করে গ্রামীণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে ডিজিটাল ব্যাংকিং এবং এমএফএস সেবা সহজলভ্য করা গেলে আর্থিক অন্তর্ভুক্তিতে বড় ধরনের অগ্রগতি সম্ভব।
প্রতিবেদনে দেখা যায়, নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে গত এক দশকে ডিজিটাল লেনদেনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। ২০১৪ সালে যেখানে প্রাপ্তবয়স্ক জনগোষ্ঠীর মাত্র ৩৪ শতাংশ ডিজিটাল লেনদেন করতেন, ২০২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬২ শতাংশে। তবে নারী ও কম আয়ের জনগোষ্ঠীর মধ্যে ব্যাংক হিসাবধারীর সংখ্যা এখনও কম থাকায় তাঁদের ডিজিটাল লেনদেনের হারও তুলনামূলকভাবে নিচে।
দক্ষিণ এশিয়ায় ব্যাংক হিসাবধারী নারীদের মাত্র অর্ধেক ডিজিটাল লেনদেন করেন, যেখানে পুরুষদের ক্ষেত্রে এই হার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ। দক্ষিণ এশিয়া ছাড়া বিশ্বের প্রায় সব অঞ্চলে ব্যাংক হিসাবধারীদের মধ্যে ডিজিটাল লেনদেনের অংশগ্রহণ তুলনামূলকভাবে বেশি।
বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ায় গত এক বছরে মাত্র ৫৭ শতাংশ হিসাবধারী ডিজিটাল মাধ্যমে লেনদেন করেছেন, অথচ অন্যান্য অঞ্চলে এই হার ৮০ শতাংশেরও বেশি।
এ বিষয়ে বিকাশের করপোরেট কমিউনিকেশনস প্রধান শামসুদ্দিন হায়দার ডালিম বলেন, “মোবাইল আর্থিক সেবার কারণে ডিজিটাল লেনদেন এখন দেশের কোটি মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক সময়ে বিকাশসহ বিভিন্ন এমএফএস প্ল্যাটফর্মে চালু হওয়া ন্যানো ডিজিটাল ঋণ ও ডিপিএস সেবাও জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। সম্মিলিত উদ্যোগ অব্যাহত থাকলে এই খাত আরও বিস্তৃত করা সম্ভব।”