সিলেটের ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শিক্ষানবিশ এক চিকিৎসকের ওপর হামলার ঘটনার জেরে ঘোষিত অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছেন ইন্টার্ন চিকিৎসকরা। রোববার দুপুরে মেডিকেল কলেজের মূল ফটকের সামনে তারা আনুষ্ঠানিকভাবে এই সিদ্ধান্তের কথা জানান।
হাসপাতাল প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনায় বসে দাবি বাস্তবায়নের আশ্বাস পাওয়ার পরই কর্মসূচি স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। গত শুক্রবার রাতে হামলার ঘটনার পর নিরাপত্তা নিশ্চিতসহ বিভিন্ন দাবিতে শিক্ষানবিশ চিকিৎসকরা কর্মবিরতিতে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন। ইন্টার্ন চিকিৎসক ডা. মোহাম্মদ সাদিক জানান, সোমবার সকাল থেকে তারা নিয়মিত দায়িত্বে ফিরবেন।
বৈঠকে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের পক্ষ থেকে আট দফা দাবি উত্থাপন করা হয়। এসব দাবির মধ্যে রয়েছে—হাসপাতালের প্রতিটি ভর্তি ইউনিটে পুরুষ ও নারী ওয়ার্ডের জন্য আলাদা করে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত আনসার নিয়োগ, প্রতি ঘণ্টা পরপর ওয়ার্ডভিত্তিক টহল টিমের কার্যক্রম, রাতের বেলায় জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় অন-কল নিরাপত্তা ফোর্স প্রস্তুত রাখা এবং রোগীর সঙ্গে সর্বোচ্চ দুইজন স্বজন থাকার বিধান কার্যকর করা।
এছাড়া মৌসুমভেদে পৃথক ভিজিটিং সময়সূচি নির্ধারণ, ইন্টার্ন চিকিৎসকদের সঙ্গে সবসময় মিডলেভেল চিকিৎসকের উপস্থিতি নিশ্চিত করা—বিশেষ করে ভর্তি কার্যক্রমের দিনগুলোতে—এবং প্রতি মাসে হাসপাতাল পরিচালকের সঙ্গে শিক্ষানবিশ চিকিৎসকদের নিয়মিত সভার ব্যবস্থার দাবিও জানানো হয়।
চিকিৎসকদের অভিযোগ, অনেক সহকারী রেজিস্ট্রার ইন্টার্নশিপ চলাকালীন প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও দিকনির্দেশনা দিতে পর্যাপ্ত উদ্যোগ নেন না। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের আরও সচেতন ও দায়িত্বশীল হওয়ার দাবি তোলা হয়। পাশাপাশি হাসপাতালের নিরাপত্তায় নিয়োজিত পুলিশ সদস্যদের ভূমিকা আরও কার্যকর করা, আনসার ও আউটসোর্সিং কর্মীদের নিয়মিত ওয়ার্ড পরিবর্তনের মাধ্যমে দায়িত্ব বণ্টন এবং ওষুধ কোম্পানির অবাধ প্রবেশ সীমিত করার দাবিও অন্তর্ভুক্ত ছিল।
কর্মবিরতির সময় বিভিন্ন ওয়ার্ডে শিক্ষানবিশ চিকিৎসক না থাকায় সীমিত আকারে অন্য চিকিৎসক ও কর্মচারীরা সেবা কার্যক্রম চালিয়ে যান। তবে রোগীর স্বজনদের ভাষ্য, এতে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হয় এবং ভোগান্তি বেড়ে যায়।
ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল উমর রাশেদ মুনির জানান, সেবার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হয়েছে। তিনি বলেন, ইন্টার্ন চিকিৎসকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে এবং এরই অংশ হিসেবে হাসপাতালের গুরুত্বপূর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে সার্বক্ষণিক আনসার মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
উল্লেখ্য, শুক্রবার রাতে হাসপাতালের চতুর্থ তলার চার নম্বর সার্জারি ওয়ার্ডে ছাতক থেকে আগত এক নারী রোগী তীব্র ব্যথা নিয়ে ভর্তি হন। ওই সময় দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষানবিশ চিকিৎসক অন্য ওয়ার্ডে রোগী দেখায় কিছুটা দেরি হয়। এ নিয়ে রোগীর স্বজনদের সঙ্গে বাকবিতণ্ডার একপর্যায়ে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, কয়েকজন স্বজন শিক্ষানবিশ চিকিৎসকের ওপর চড়াও হন এবং এক নারী ইন্টার্ন চিকিৎসককে শারীরিকভাবে হেনস্তা করা হয়। একপর্যায়ে একজন স্বজন হাতে ধাতব ক্রাচ নিয়ে মারধর ও ভাঙচুরের চেষ্টা করেন।
ঘটনার পর পুলিশ তিনজনকে আটক করে। তারা হলেন—সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার কৈতক গ্রামের শিমুল আহমদ, তার স্ত্রী নাজিরা সিদ্দিকা এবং দৌলতপুর গ্রামের জাবেদ মিয়া। কোতোয়ালী থানার ওসি মাইনুল জাকির জানান, কোনো পক্ষ মামলা না করায় শনিবার বিকেলে ৫৪ ধারায় তাদের আদালতে পাঠানো হয়েছে।