নির্বাচনী মাঠে থাকছে কড়া নিরাপত্তা ১ লাখ সেনা ও ৯ লাখ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য প্রস্তুত

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে সারাদেশে প্রায় ৯ লাখ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন। মোট ৮ লাখ ৯৭ হাজার ১১৭ জন সদস্য নির্বাচনী নিরাপত্তায় মোতায়েন থাকবেন বলে জানিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

এই বিশাল নিরাপত্তা ব্যবস্থার অংশ হিসেবে থাকবে সেনাবাহিনীর ১ লাখ, নৌবাহিনীর ৫ হাজার, বিমান বাহিনীর ৩ হাজার ৭৩০ জন (এর মধ্যে স্থলভাগে দায়িত্ব পালন করবেন ১ হাজার ২৫০ জন)। এ ছাড়া বাংলাদেশ পুলিশের ১ লাখ ৪৯ হাজার ৪৪৩ জন, আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর ৫ লাখ ৭৬ হাজার ৩১৪ জন, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের ৩৭ হাজার ৪৫৩ জন, কোস্ট গার্ডের ৩ হাজার ৫৮৫ জন, র‍্যাবের ৭ হাজার ৭০০ জন এবং সহায়ক বাহিনী হিসেবে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের ১৩ হাজার ৩৯০ জন সদস্য মাঠে থাকবেন।

সোমবার সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির ২০তম সভা শেষে এসব তথ্য জানান স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। তাঁর সভাপতিত্বেই সভাটি অনুষ্ঠিত হয়।

সভায় দেশের সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরাপত্তা পরিকল্পনা, নির্বাচনকালীন সমন্বয় সেল গঠন, নির্বাচনকে অবাধ, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ করতে করণীয়, অপারেশন ডেভিল হান্ট ফেইজ-২ এর অগ্রগতি, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার এবং মাদকবিরোধী কার্যক্রমসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পর্যালোচনা করা হয়।

স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার একটি গ্রহণযোগ্য ও উৎসবমুখর পরিবেশে জাতীয় নির্বাচন আয়োজন করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। এ লক্ষ্য অর্জনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রেখে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করাকে সরকার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছে। এজন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সব বাহিনীর সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করছে।

তিনি জানান, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দুই ধাপে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন করা হবে। ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা, মোবাইল টহল ও স্ট্রাইকিং ফোর্স পরিচালনাসহ সব কার্যক্রম সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তার তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হবে। এ বিষয়ে ৬ জানুয়ারি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে একটি পরিপত্র জারি করা হয়েছে।

নির্বাচন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ রাখতে ‘ইন এইড টু সিভিল পাওয়ার’-এর আওতায় সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা পুলিশ, বিজিবি, আনসার-ভিডিপি, কোস্ট গার্ড এবং বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তা করবেন। প্রথম ধাপে বর্তমানে মোতায়েন থাকা বাহিনী দায়িত্ব পালন অব্যাহত রাখবে। দ্বিতীয় ধাপে ভোটকেন্দ্রভিত্তিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ৮ থেকে ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সাত দিনের জন্য বাহিনী মোতায়েন থাকবে।

পুলিশ, আনসার ও ভিডিপির পাশাপাশি সেনাবাহিনী, বিজিবি, কোস্ট গার্ড ও র‍্যাবের সমন্বয়ে একটি কেন্দ্রীয় আইনশৃঙ্খলা সমন্বয় সেল গঠন করা হবে, যেখানে প্রতিটি বাহিনীর প্রতিনিধি থাকবে।

জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী আরও বলেন, নির্বাচন ও গণভোট উপলক্ষে জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ একটি বিশেষ টিম সার্বক্ষণিকভাবে কাজ করবে। এই টিম নির্বাচন সংক্রান্ত অভিযোগ তাৎক্ষণিকভাবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও স্থানীয় সমন্বয় সেলে পাঠাবে, যাতে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া যায়।

নিরাপত্তার মাত্রা বিবেচনায় জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সমন্বয় সেলের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে সশস্ত্র বাহিনীসহ বিভিন্ন বাহিনী মোতায়েন থাকবে। পাশাপাশি অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, সন্ত্রাসী গ্রেপ্তার, গোয়েন্দা তথ্যভিত্তিক অভিযান ও তল্লাশি চৌকি কার্যক্রম জোরদার করা হবে।

তিনি জানান, এবারের নির্বাচনে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা বা ভোটে বাধা দেওয়ার চেষ্টা হলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থা নিতে পারবে। দেশে মোট ভোটকেন্দ্র রয়েছে ৪২ হাজার ৭৬১টি। এর মধ্যে অধিক গুরুত্বপূর্ণ ৮ হাজার ৭৮০টি, গুরুত্বপূর্ণ ১৬ হাজার ৫৪৮টি এবং সাধারণ কেন্দ্র ১৭ হাজার ৪৩৩টি

অধিক ও গুরুত্বপূর্ণ ভোটকেন্দ্রে পুলিশ সদস্যদের ব্যবহারের জন্য থাকছে ২৫ হাজার বডি ওয়ার্ন ক্যামেরা। পাশাপাশি প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনের প্রস্তুতিও নেওয়া হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নির্বাচনসংক্রান্ত প্রশিক্ষণ ২০ জানুয়ারির মধ্যে সম্পন্ন হবে, যা এ ধরনের প্রশিক্ষণের প্রথম আয়োজন।

নির্বাচনী নিরাপত্তায় প্রযুক্তির ব্যবহারও বাড়ছে। এবারের নির্বাচনে বিভিন্ন বাহিনীর মোট ৪১৮টি ড্রোন ব্যবহৃত হবে। এর মধ্যে সেনাবাহিনীর ২০০টি, বিজিবির ১০০টি, পুলিশের ৫০টি, নৌবাহিনীর ১৬টি, র‍্যাবের ১৬টি, কোস্ট গার্ডের ২০টি এবং আনসার ও ভিডিপির ১৬টি ড্রোন পরিকল্পিতভাবে ব্যবহার করা হবে। পাশাপাশি ডগ স্কোয়াডও কাজে লাগানো হবে।

নির্বাচন ব্যবস্থাপনায় সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হবে ‘নির্বাচন সুরক্ষা অ্যাপ–২০২৬’, যা এনটিএমসি প্রস্তুত করেছে। এই অ্যাপের মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, রিটার্নিং কর্মকর্তা ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কন্ট্রোল রুম তাৎক্ষণিকভাবে যুক্ত থাকবে।

এ ছাড়া দুর্গম এলাকায় ব্যালট ও নির্বাচনী কর্মকর্তা পরিবহনে বিমান বাহিনীর হেলিকপ্টার ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। নির্বাচন বিঘ্নিত করতে পারে এমন দুষ্কৃতকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং ভোটের আগে চার দিন সারাদেশে নিবিড় টহল পরিচালিত হবে।

স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জানান, অপারেশন ডেভিল হান্ট ফেইজ-২ অভিযানে গত ১৩ ডিসেম্বর থেকে ১৭ জানুয়ারি পর্যন্ত প্রায় ২০ হাজার জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অভিযানে বিপুল পরিমাণ আগ্নেয়াস্ত্র, গোলাবারুদ ও বিস্ফোরক উদ্ধার করা হয়েছে। একই সময়ে মামলা ও ওয়ারেন্টভিত্তিক গ্রেপ্তারের সংখ্যা ছাড়িয়েছে ৫৩ হাজার। অপরাধ দমনে চেকপোস্ট ও টহল আরও জোরদার করা হয়েছে।