অন্তর্বর্তী সরকারের কার্যক্রম, ড. ইউনূসের তত্ত্বের বিপরীতে

মানববন্ধনে বক্তব্য দিতে গিয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক পরিসরে ‘থ্রি জিরো’—শূন্য দারিদ্র্য, শূন্য বেকারত্ব ও শূন্য কার্বন নিঃসরণ—এই ধারণা তুলে ধরেছেন। তাঁর নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর জাতীয় পর্যায়ে এই তিনটি লক্ষ্য বাস্তবায়নে সরকার কী ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে, তা জানার পূর্ণ অধিকার জনগণের রয়েছে। তিনি মনে করেন, সরকারের মেয়াদ শেষ হলে একটি শ্বেতপত্র প্রকাশ করে এই তিন খাতে সরকারের কর্মকাণ্ড ও অর্জনের বিস্তারিত হিসাব জনসমক্ষে উপস্থাপন করা উচিত।

তিনি আরও বলেন, জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্র হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক ক্লিন এনার্জি দিবস যথাযথভাবে পালন করতে পারেনি, যা অত্যন্ত হতাশাজনক। এই দিবসের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে জনগণের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় যুক্ত ব্যক্তিদের কার্বন নিঃসরণ কমাতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে উদ্বুদ্ধ করা। কিন্তু এ ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকার কার্যকর কোনো ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। ইফতেখারুজ্জামান বলেন, যিনি নিজেই ‘থ্রি জিরো’ দর্শনের অন্যতম প্রবক্তা, তাঁর নেতৃত্বাধীন সরকার এই লক্ষ্যগুলো বাস্তবায়নে ব্যর্থ হওয়ায় তিনি ব্যক্তিগতভাবে বিব্রত বোধ করছেন।

আন্তর্জাতিকভাবে ঘোষিত ক্লিন এনার্জি দিবস উপলক্ষে গতকাল সোমবার সকালে সংসদ ভবনের সামনে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে টিআইবির উদ্যোগে আয়োজিত মানববন্ধনে এসব কথা বলেন তিনি। মানববন্ধনে টিআইবির পক্ষ থেকে আহ্বান জানানো হয়, অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ শেষে ‘থ্রি জিরো’ লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নে সরকারের দায়িত্ব ও কার্যক্রম কতটা ফলপ্রসূ ছিল, তার পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন জনগণের সামনে তুলে ধরতে হবে।

ইফতেখারুজ্জামান অভিযোগ করেন, শূন্য কার্বন নিঃসরণের ভিত্তি গড়ে তোলার মতো গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ থাকলেও অন্তর্বর্তী সরকার সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পারেনি। তিনি প্রশ্ন তোলেন, সরকার এমন কোনো উদ্যোগ নিয়েছে কি না, যা ভবিষ্যতে নির্বাচিত সরকার এগিয়ে নিতে পারত—এর সন্তোষজনক উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি। এই সম্ভাবনাময় সুযোগ কেন নষ্ট হলো, তার ব্যাখ্যা অন্তর্বর্তী সরকারকে দিতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

মানববন্ধনে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রণীত খসড়া জ্বালানি ও বিদ্যুৎ মহাপরিকল্পনা (ইপিএসএমপি ২০২৫) নিয়েও কঠোর সমালোচনা করেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক। তাঁর মতে, এই পরিকল্পনা মূলত জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর এবং এতে পরিচ্ছন্ন ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তরের জন্য কোনো সুস্পষ্ট রূপরেখা নেই। তিনি বলেন, এই খসড়া পরিকল্পনা প্রমাণ করে যে সরকার অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে একতরফাভাবে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, সরকারে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা জাতীয় নিরাপত্তা ও দেশের অস্তিত্বের প্রশ্নকে কতটা গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করছেন, তা নিয়ে গুরুতর সন্দেহ রয়েছে। এ ধরনের পরিকল্পনা দেশের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা ও জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলার ক্ষেত্রে উদ্বেগজনক বার্তা বহন করে।

ইফতেখারুজ্জামান বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের কর্মকাণ্ডের একটি বড় দুর্বলতা হলো অংশগ্রহণমূলক সিদ্ধান্ত গ্রহণের অভাব। তিনি ভবিষ্যতে নির্বাচিত সরকার গঠনকারীদের প্রতি আহ্বান জানান, যেন তারা নাগরিক সমাজ, সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ এবং অন্যান্য অংশীজনের মতামত নিয়ে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের নীতি ও পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করেন।

মানববন্ধনে টিআইবির ক্লিন এনার্জি প্রকল্পের সহসমন্বয়ক আশনা ইসলাম টেকসই উন্নয়ন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও সুশাসন বিষয়ে একটি ধারণাপত্র উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক ক্লিন এনার্জি দিবস বিশ্বব্যাপী নবায়নযোগ্য ও টেকসই জ্বালানিতে রূপান্তরের পক্ষে মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ।

ধারণাপত্রে টিআইবির পক্ষ থেকে বেশ কয়েকটি সুপারিশ তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা ধাপে ধাপে কমিয়ে জ্বালানি মিশ্রণে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ বাড়াতে রাজনৈতিক দলগুলোর সুস্পষ্ট অঙ্গীকার, খসড়া জ্বালানি ও বিদ্যুৎ মহাপরিকল্পনা চূড়ান্ত করার আগে নাগরিক সমাজ ও নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞদের মতামত গ্রহণ, ২০৫০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তরের মাধ্যমে ‘নেট-জিরো’ লক্ষ্য অর্জনে কার্যকর নীতি গ্রহণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে সহায়ক নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন এবং স্বার্থের দ্বন্দ্বমুক্ত থেকে প্রকল্প অনুমোদন ও চুক্তি সম্পাদন নিশ্চিত করা।

মানববন্ধনে ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশ, কর্মজীবী নারী, বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউয়েবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশন, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ, একশনএইড বাংলাদেশ, মিডিয়া রিসোর্স ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ (এমআরডিআই), বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটসহ বিভিন্ন সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা সংহতি প্রকাশ করেন। তাঁরা সবাই অন্তর্বর্তী সরকারের খসড়া জ্বালানি ও বিদ্যুৎ মহাপরিকল্পনার সমালোচনা করে অবিলম্বে এই নীতি থেকে সরে আসার দাবি জানান।