বিশ্বসংগীতের সর্বোচ্চ সম্মান গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ডসের ৬৮তম আসরে মর্যাদাপূর্ণ অ্যালবাম অব দ্য ইয়ার পুরস্কারের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ব্যাড বানি, কেন্ড্রিক লামার ও লেডি গাগা। তাদের সামনে রয়েছে ইতিহাস গড়ার সুযোগ। পুরস্কার বিশ্লেষকদের মতে, তিন তারকার যেকোনও একজন এটি জিতে নিতে পারেন। তাদের কেউই আগে কখনও এই স্বীকৃতি পাননি।
গত বছর ‘কাউবয় কার্টার’ অ্যালবামের জন্য প্রথমবারের মতো পুরস্কারটি জিতেছেন বিয়ন্সে।
কানাডিয়ান গায়ক জাস্টিন বিবারের ‘সোয়াগ’, আমেরিকান গায়িকা সাবরিনা কার্পেন্টারের “ম্যান’স বেস্ট ফ্রেন্ড”, আরঅ্যান্ডবি তারকা লিয়ন টমাসের ‘মাট’, হিপ-হপ যুগল ক্লিপসের ‘লেট গড সর্ট এম আউট’ ও র্যাপার টাইলার দ্য ক্রিয়েটরের ‘ক্রোমাকোপিয়া’ মনোনীত হলেও অ্যালবাম অব দ্য ইয়ার বিভাগে কিছুটা পিছিয়ে। তবে গ্র্যামির ইতিহাসে অদ্ভুত ও চমকপ্রদ সিদ্ধান্তের নজির কম নয়। তাই জাস্টিন বিবার কিংবা সাবরিনা কার্পেন্টারের ট্রফি জয়ের সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো– মনোনীতদের মধ্যে যিনিই জিতুন না কেন, সেটি হবে অ্যালবাম অব দ্য ইয়ার বিভাগে তার প্রথম জয়।
ত্রিমুখী হাড্ডহাড্ডি লড়াই
অ্যালবাম অব দ্য ইয়ার বিভাগে ব্যাড বানি, কেন্ড্রিক লামার ও লেডি গাগার মধ্যে টানটান প্রতিযোগিতা হবে বলে মনে করেন পুরস্কার বিশ্লেষকরা। পুয়ের্তো রিকোর র্যাপার ব্যাড বানির ‘দেবি তিরার মাস ফতোস’ হতে পারে গ্র্যামির ৬৮ বছরের ইতিহাসে অ্যালবাম অব দ্য ইয়ার পুরস্কার জয়ী প্রথম স্প্যানিশ ভাষার অ্যালবাম। যদি ‘জিএনএক্স’ এই পুরস্কার জিততে পারে তাহলে প্রথম একক পুরুষ র্যাপার হিসেবে ইতিহাস গড়বেন আমেরিকার কেন্ড্রিক লামার। সর্বশেষ ২১ বছর আগে অ্যালবাম অব দ্য ইয়ার স্বীকৃতি পেয়েছে কোনও র্যাপ অ্যালবাম। গ্র্যামির ইতিহাসে এই বিভাগে হিপ-হপ সংগীতশিল্পী লরিন হিল ও হিপ-হপ জুটি আউটকাস্টের দুই সদস্য এই সম্মান পেয়েছেন। ‘মেহেম’ অ্যালবাম অব দ্য ইয়ার জিতলে প্রথমবার এমন সাফল্য পাবেন আমেরিকান গায়িকা লেডি গাগা। দুই দশকের বেশি সময়ের ক্যারিয়ারে তিনি এখনও গ্র্যামির ‘বিগ ফোর’ পুরস্কারের কোনোটিই পাননি।
অনেক পুরস্কার বিশ্লেষকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, অ্যালবাম অব দ্য ইয়ার ট্রফি উঠতে পারে কেন্ড্রিক লামারের হাতে। গত বছর ‘নট লাইক আস’ গানের জন্য পাঁচটি গ্র্যামি জিতেছেন তিনি।
গ্র্যামির অ্যালবাম অব দ্য ইয়ার বিভাগে কেন্ড্রিক লামার ও লেডি গাগা এর আগে পাঁচবার করে মনোনীত হয়েছেন। কিন্তু একবারও এই কাঙ্ক্ষিত সোনালি গ্র্যামোফোন জিততে পারেননি তারা।
এবারের গ্র্যামিতে ইউনিভার্সাল মিউজিক গ্রুপের প্রতিনিধিত্ব করছেন কেন্ড্রিক লামার ও লেডি গাগা। পুয়ের্তো রিকোর প্রতিষ্ঠান রিমাস এন্টারটেইনমেন্টের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ ব্যাড বানি।
গ্র্যামির ইতিহাসে ‘অ্যালবাম অব দ্য ইয়ার’ বিভাগের সংক্ষিপ্ত তালিকায় এবারই প্রথম জায়গা পেয়েছে তিনটি র্যাপ অ্যালবাম। ব্যাড বানির ‘দেবি তিরার মাস ফতোস’-এর মাধ্যমে কেবল দ্বিতীয়বার পুরোপুরি স্প্যানিশ-ভাষার একটি অ্যালবাম এই পুরস্কারের সংক্ষিপ্ত তালিকায় স্থান পেয়েছে। প্রথমটি ছিল ২০২২ সালে প্রকাশিত ব্যাড বানির অ্যালবাম ‘উন ভেরানো সিন তি’।
পুরস্কার বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ ব্যাড বানির পক্ষে সমর্থন বাড়াতে পারে। নিজের সাম্প্রতিক ট্যুরে যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডে কোনও কনসার্ট করেননি তিনি। তার আশঙ্কা ছিল, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অভিবাসনবিরোধী অভিযানের অংশ হিসেবে ফেডারেল এজেন্টরা কনসার্টে আসা ভক্তদের গ্রেফতার করতে পারে। অনেকে মনে করেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অভিবাসনবিরোধী অবস্থানের প্রতিবাদ হিসেবেই গ্র্যামির ভোটাররা ব্যাড বানির পক্ষে থাকবেন। যদিও আগামী ৮ ফেব্রুয়ারি সুপার বোল হাফটাইম শোতে সংগীত পরিবেশনের জন্য তার নির্বাচিত হওয়া সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। সমালোচকদের একাংশের দাবি, ন্যাশনাল ফুটবল লিগ (এনএফএল) চ্যাম্পিয়নশিপ ম্যাচের বিনোদন অংশ ইংরেজি ভাষার হওয়া উচিত।
কে-পপের সম্ভাবনা
গ্র্যামির ‘বিগ ফোর’ পুরস্কার ভাবা হয় অ্যালবাম অব দ্য ইয়ার, রেকর্ড অব দ্য ইয়ার, সং অব দ্য ইয়ার ও সেরা নতুন শিল্পী বিভাগ চারটিকে। এগুলোর অন্তত একটির সংক্ষিপ্ত তালিকায় জায়গা করে নেওয়া প্রথম কে-পপ আইডল এখন কোরিয়ান মেয়েদের ব্যান্ড ব্ল্যাকপিঙ্কের অন্যতম সদস্য রোজে। আমেরিকান সংগীতশিল্পী ব্রুনো মার্সের সঙ্গে তার দ্বৈত গান ‘আপাতে’ মনোনীত হয়েছে রেকর্ড অব দ্য ইয়ার ও সং অব দ্য ইয়ার বিভাগে। আশির দশকে প্রকাশিত আমেরিকান গায়িকা টনি বাসিলের কালজয়ী ‘মিকি’ গানে এটি অনুপ্রাণিত। সেরা পপ দ্বৈত/দলীয় পারফরম্যান্স বিভাগেও মনোনয়ন পেয়েছে ‘আপাতে’।
সং অব দ্য ইয়ার বিভাগে কে-পপের মধ্যে লড়াই হচ্ছে। ‘আপাতে’র সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে নেটফ্লিক্সের অ্যানিমেটেড ছবি ‘কেপপ ডিমন হান্টার্স’-এর গান ‘গোল্ডেন’। এটি মোট তিনটি মনোনয়ন পেয়েছে। সেরা সং রিটেন ফর ভিজ্যুয়াল মিডিয়া বিভাগেও আছে এই গান। এটি গেয়েছেন দক্ষিণ কোরিয়ান-আমেরিকান গায়িকা ইজেই, রেই আমি, আমেরিকান র্যাপার অড্রে নুনা। গানটি তৈরি করেছেন ইজেই ও মার্ক সনেনব্লিক। সেরা রিমিক্সড রেকর্ডিং, নন-ক্লাসিক্যাল বিভাগে মনোনীত হয়েছে ডেভিড গেট্টার ‘গোল্ডেন’ রিমিক্স। গ্র্যামির সামনের সারির যেকোনও একটি বিভাগে মনোনীত হওয়া প্রথম অ্যানিমেটেড ব্যান্ড হান্টার/এক্স। ২০০৫ সালে ব্রিটিশ সংগীতশিল্পী ডেমন আলবার্নের ভার্চুয়াল ব্যান্ড গরিলাজের ‘ফিল গুড ইঙ্ক’ গ্র্যামির সেরা পপ কোলাবোরেশন পুরস্কার জিতেছে।
সেরা নতুন শিল্পী বিভাগে আরঅ্যান্ডবি ও সোল শিল্পী লিয়ন থমাসকে এগিয়ে রাখা হচ্ছে। তিনি মোট ছয়টি গ্র্যামির জন্য মনোনীত হয়েছেন, যার মধ্যে ‘মাট’-এর জন্য অ্যালবাম অব দ্য ইয়ার বিভাগের মনোনয়ন রয়েছে। তার প্রতিদ্বন্দ্বীদের মধ্যে অন্যতম ব্রিটিশ সোল-পপ গায়িকা অলিভিয়া ডিন ও পপ শিল্পী অ্যালেক্স ওয়ারেন।
গ্র্যামির ভোটার
২০২৪ সালের ৩১ আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের ৩০ আগস্ট পর্যন্ত প্রকাশিত গান, সুর-সংগীত ও শিল্পীদের মধ্য থেকে ৯৫টি বিভাগে সেরাদের পুরস্কার দেওয়া হবে এবারের আসরে। গ্র্যামির আয়োজক রেকর্ডিং অ্যাকাডেমির প্রায় ১৫ হাজার সদস্যের ভোটে বিজয়ী তালিকা চূড়ান্ত হয়েছে। গত বছরের ১২ ডিসেম্বর থেকে নতুন বছরের ৫ জানুয়ারি পর্যন্ত চূড়ান্ত ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। গ্র্যামি বিজয়ীদের নির্বাচন করেছেন বিভিন্ন দেশের কণ্ঠশিল্পী, গীতিকবি, সুরকার, সংগীত পরিচালক, প্রযোজক, সংগীত প্রকৌশলী ও গান-বাজনার সঙ্গে যুক্ত পেশাদার ব্যক্তিরা। ভোটাধিকার প্রয়োগের জন্য তাদের অবশ্যই সংগীতশিল্পে সক্রিয় থাকার পাশাপাশি বার্ষিক ১৫০ ডলার সাবস্ক্রিপশন ফি দিতে হয়।
নাচে-গানে মাতাবেন যারা
লালগালিচার আনুষ্ঠানিকতা শেষে জাঁকজমকপূর্ণ মঞ্চে থাকছে সংগীতশিল্পীদের বর্ণিল পরিবেশনা। অনুষ্ঠানে গাইবেন লেডি গাগা, সাবরিনা কার্পেন্টার, জাস্টিন বিবার, ব্ল্যাকপিঙ্ক ব্যান্ডের রোজে, ব্রুনো মার্স, টাইলার দ্য ক্রিয়েটর, ক্লিপস ও ফ্যারেল উইলিয়ামস। প্রয়াত অজি অসবোর্নের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে সংগীত পরিবেশন করবেন পোস্ট ম্যালোন, স্ল্যাশ ও চ্যাড স্মিথ। প্রয়াত ডি’অ্যাঞ্জেলো ও রবার্টা ফ্ল্যাকের প্রতি সম্মান জানিয়ে গাইবেন লরিন হিল। প্রয়াতদের স্মরণে সম্মিলিত পরিবেশনায় অংশ নেবেন রেবা ম্যাকএন্টায়ার, ব্র্যান্ডি ক্লার্ক ও লুকা নেলসন।
সেরা নতুন শিল্পী বিভাগে মনোনীত সবাই সংগীত পরিবেশন করবেন অনুষ্ঠানে। তারা হলেন– আরঅ্যান্ডবি সংগীতশিল্পী লিয়ন টমাস, ব্রিটিশ তারকা অলিভিয়া ডিন ও লোলা ইয়াং, মেয়েদের ব্যান্ড ক্যাটস আই, পপতারকা অ্যাডিসন রেই, অ্যালেক্স ওয়ারেন, সোম্বার, দ্য ম্যারিয়াস। আয়োজকরা জানিয়েছে, ঘোষিত তালিকার বাইরে কয়েকজন চমকপ্রদ অতিথির উপস্থিতি থাকবে।
নতুন বিভাগ ও পরিমার্জন
১৯৫৯ সালের ৪ মে দেওয়া হয় প্রথম গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ডস। ন্যাশনাল একাডেমি অব রেকর্ডিং আর্টস অ্যান্ড সায়েন্সেসের এই আয়োজন এখন বিশ্বের সব সংগীতশিল্পীর কাছে সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত ও মর্যাদাসম্পন্ন পুরস্কার। এবারের আসরে নতুন যুক্ত করা হয়েছে সেরা অ্যালবাম প্রচ্ছদ ও সেরা ট্র্যাডিশনাল কান্ট্রি অ্যালবাম বিভাগ দুটি। সেরা কান্ট্রি অ্যালবাম বিভাগের নাম বদলে রাখা হয়েছে সেরা কন্টেমপোরারি কান্ট্রি অ্যালবাম। সেরা বক্সড অথবা স্পেশাল লিমিটেড এডিশন প্যাকেজ বিভাগটি আবারও সেরা রেকর্ডিং প্যাকেজ বিভাগে একীভূত করা হয়েছে।
পুরস্কার তুলে দেবেন যারা
গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ডসের জমকালো আয়োজনে বিজয়ীদের হাতে গ্রামোফোন আদলের ট্রফি তুলে দিতে মঞ্চে উঠবেন ব্রিটিশ সংগীতশিল্পী হ্যারি স্টাইলস, চার্লি এক্সসিএক্স, আমেরিকান গায়িকা-অভিনেত্রী কুইন লতিফা, টিয়ানা টেলর, চ্যাপেল রোন, লেইনি উইলসন, ক্যারোল কিং, র্যাপার ডোচি, কিউ-টিপ, আমেরিকান অভিনেতা জেফ গোল্ডব্লাম, কলম্বিয়ান গায়িকা ক্যারল জি, আমেরিকান কমেডিয়ান মার্সেলো হার্নান্দেজ, নিকি গ্লেজার।
বরাবরের মতো গ্র্যামি পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠান দুই ভাগে বিভক্ত থাকবে। যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসের পিকক থিয়েটারে ‘প্রিমিয়ার সিরিমনি’তে ৮০টি পুরস্কার বিতরণ করা হবে। রবিবার দুপুর ১২টা ৩০ মিনিটে (বাংলাদেশ সময় দিবাগত রাত ২টা ৩০ মিনিট) রেকর্ডিং অ্যাকাডেমির ইউটিউব চ্যানেল ও live.grammy.com ওয়েবসাইটে দেখা যাবে এই আয়োজন। রবিবার বিকাল ৩টায় (বাংলাদেশ সময় সোমবার ভোর ৫টা) থাকছে লালগালিচার জৌলুস।
যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসের ক্রিপ্টো ডটকম অ্যারেনায় মূল অনুষ্ঠান শুরু হবে বিকাল ৫টায় (বাংলাদেশ সময় সোমবার সকাল ৭টা)। ২৩তম বারের মতো এই ভেন্যুতে গ্র্যামির আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হবে। টানা ষষ্ঠবারের মতো অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করবেন দক্ষিণ আফ্রিকান কমেডিয়ান ট্রেভর নোয়া। তিনি জানিয়ে দিয়েছেন, এটাই তার শেষ গ্র্যামি সঞ্চালনা।
সিবিএস টেলিভিশন নেটওয়ার্ক অনুষ্ঠানটি যুক্তরাষ্ট্রে সরাসরি সম্প্রচার করবে। এছাড়া ওটিটি প্ল্যাটফর্ম প্যারামাউন্ট প্লাসে দেখা যাবে এই জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন। পরদিন বিভিন্ন বিজয়ীর অনুভূতি ও নির্বাচিত পরিবেশনা ইউটিউবে আপলোড করবে রেকর্ডিং অ্যাকাডেমি।