Dhaka ০৮:৫৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬, ১১ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম :
অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী শেরে বাংলা একে ফজলুল হকের জন্মদিন আজ এবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আ গুন বাংলাদেশ ও জাপানের অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব জোরদারে গুরুত্বারোপ প্রধানমন্ত্রীর ঘূর্ণিঝড় ‘অর্ণব’ ঘিরে সতর্কতা, সমুদ্রবন্দরে ২ নম্বর সংকেত সিলেট থেকে বদলি হলেন এসএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার এনামুল হক একই দিনে জন্ম, একই দিনে পুকুরে ডুবে মৃত্যু দুই ভাই-বোনের ভেনেজুয়েলায় ফিরলেন নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী ‘নির্বাসিত’ মাচাদো জাপানে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ‘জীবনের প্রথম দেশের বাইরে যাচ্ছি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে’ প্রেমের ফাঁদে ফেলে আপত্তিকর ছবি ও ভিডিও ধারণ, অতঃপর…

অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী শেরে বাংলা একে ফজলুল হকের জন্মদিন আজ

অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী শেরে বাংলা খ্যাত একে ফজলুল হকের জন্মদিন আজ ২৬ অক্টোবর সোমবার । এ. কে. ফজলুক হক ১৮৭৩ সালে ২৬ অক্টোবর বরিশাল জেলার রাজাপুর থানার সাতুরিয়া গ্রামে মামার বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি কাজী মুহম্মদ ওয়াজেদ এবং সাইদুন্নেসা খাতুনের একমাত্র পুত্র ছিলেন।তিনি প্রধান মন্ত্রী হয়ে নিপীড়িত মুসলমানদেরকে হিন্দু জমিদারদের করাল গ্রাস থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন। এ ছাড়া তিনি অবৈতনিক শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করেন। যার ফলে বাঙালি মুসলমানরা শিক্ষার আলো দেখতে পেয়েছিলেন । ১৯১৩ সালে মাত্র ৩৯ বছর বয়সে এ. কে. ফজলুক হক বঙ্গীয় আইন পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯১৫ সালে পুনরায় ঢাকা বিভাগ থেকে বঙ্গীয় আইন পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯১৩ থেকে ১৯১৬ সাল পর্যন্ত তিনি এ পরিষদের সভায় মোট ১৪৮ বার বক্তৃতা করেন। ১৪৮ বার বক্তৃতার ভেতর ১২৮ বার তিনি দাড়িয়ে ছিলেন মুসলমানদের শিক্ষা সম্পর্কে বক্তৃতা দেওয়ার জন্য। তার অদম্য চেষ্টার ফলে ১৯১৬ সালেকলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় কারমাইকেল ও টেইলার হোস্টেল স্থাপন করা হয়েছিল।
শেরেবাংলা তখন শিক্ষামন্ত্রী। তিনি লক্ষ্য করলেন মুসলমান শিক্ষার্থীরা পরীক্ষা দেয় কিন্তু পাশ করে না । তিনি তদন্ত কমিটি গঠন করলেন,কেন শিক্ষার্থীরা পাশ করছে না । তদন্তে বেরিয়ে আসলো হিন্দু শিক্ষকরা মুসলমান নাম দেখলেই ঘেচাং করে দিতেন । আর ফেল করেই তারা হারিয়ে যেতো । সে কারণেই উচ্চ শিক্ষায় মুসলিম শিক্ষার্থী খুঁজে পাওয়া যেতো না । এভাবেই ইচ্ছা থাকা সত্বেও শিক্ষা ক্ষেত্রে মুসলমানরা পিছিয়ে পড়ে । শেরেবাংলা শিক্ষার্থীদের নাম বাদ দিয়ে নতুন পদ্ধতিতে রুল নাম্বার দিয়ে পরীক্ষা নেওয়ার ব্যবস্থা করলেন । এতে প্রত্যাশিত সাফল্য পাওয়া যায় । যা এখনও বহাল আছে ।
নতুন পদ্ধতি প্রয়োগের প্রথম বছরেই ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হন হুমায়ুন কবির, যিনি পরবর্তীতে ভারতের শিক্ষামন্ত্রী হয়েছিলেন ।
শেরেবাংলা বাংলার কৃষকদের জমিদার ও সুদখোর মহাজনদের হাত থেকে রক্ষার জন্য ঋণ সালিশি বোর্ড গঠন করেছিলেন । যে কারণে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চালু করা মাইক্রো ক্রেডিট সিস্টেম বা সুদের ব্যবসা মাঠেমারা যায়।
লাহোর প্রস্তাব উত্থাপন,জমিদারি প্রথা উচ্ছেদ,ঋণ শালিসি বোর্ডের প্রবর্তন এবং শিক্ষার ক্ষেত্রে বাংলার অবহেলিত মুসলমানদের উজ্জীবিত করার প্রয়াসের কারণে শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক এ দেশের সাধারণ মানুষের হৃদয়ে মহানায়কের মর্যাদায় ভূষিত ছিলেন ।
জমিদারদের হাত থেকে বাংলার কৃষকদের বাঁচানোর মতো বিশাল অবদান থাকার পরও ফজলুল হকের রাজনীতির কোনো ধারাবাহিকতা ছিল না । কোনো একটি রাজনৈতিক বিশ্বাসে তিনি দীর্ঘদিন স্হির থাকতে পারতেন না । ক্ষমতার রাজনীতির পাকে পড়ে তিনি বারবার নিজের মত বদলিয়েছেন,রাজনীতির বাঁক ঘুরিয়ে দিয়েছেন । তার মতো জনপ্রিয় নেতার এই অস্হিরমতি রাজনীতি বাঙালি মুসলমানের জাতি হিসেবে অত্মবিকাশে স্বভাবতই বড় রকমের প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়িয়েছে । আজকের বাঙালি মুসলমানের দোদুল্যমান চরিত্র নির্মাণে তার নেতাদের এই অস্হিরমতি রাজনীতি যে একটা বড় ভূমিকা রেখেছে,তাতে কোনো সন্দেহ নাই । ফজলুল হক নিখিল ভারত কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক ও নিখিল ভারত মুসলিম লীগের সভাপতি পর্যন্ত হয়েছিলেন । কিন্তু তার অস্হিরমতি রাজনীতি তাকে শেষ পর্যন্ত সর্বভারতীয় নেতা না বানিয়ে স্রেফ প্রাদেশিক নেতা হওয়ার মধ্যে আটকে রেখেছিল ।
যে ফজলুল হক লাহোর প্রস্তাব উত্থাপন করেছিলেন,সেই তিনি কিছুদিন পর মুসলিম লীগ ছেড়ে দিয়ে উগ্র সাম্প্রদায়িক,আজকের বিজেপির ভাবগুরু শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির সাথে মিলেমিশে কোয়ালিশন সরকার গঠন করেছিলেন ।
১৯৫৪ সালে পূর্ব বাংলার মুখ্যমন্ত্রী হয়ে ফজলুল হক একবার কলকাতায় যান এবং সেখানে আবেগাপ্লুত হয়ে যা বলেন,তা মোটেই একজন কুশলী রাজনীতিকের লক্ষণ নয় । সেখানে তিনি অখণ্ড বাংলার পক্ষে মত দেন এবং প্রকারান্তরে মুসলিম জাতীয়তাবাদের ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেন । ১৯৫৪ সালের ৩ মে কলকাতায় তাকে প্রদত্ত সংবর্ধনার জবাবে তিনি বলেন:”একটি দেশের রাজনৈতিক বিভাগে আমি বিশ্বাস করি না । প্রকৃতপক্ষে হিন্দুস্তান ও পাকিস্তান-এই দুটি বিভেদাত্মক শব্দের সঙ্গে আমি এখন পর্যন্ত সুপরিচিত হতে পারিনি ।–যারা আমার এই সোনার দেশকে দুভাগ করেছে,তারা দেশের দুশমন । আমার মতে,পাকিস্তান বলতে কিছুই বোঝায় না । এই শব্দটি বিভ্রান্তি সূচনা করার ও স্বার্থসিদ্ধির একটি পন্হা মাত্র”।
পাকিস্তান সরকার ওই বক্তব্যের জন্য তাকে রাষ্ট্রদ্রোহী বলেছিল,তাকে গৃহবন্দী করে রেখেছিল ।
তাইতো দেখি ফজলুল হক পাকিস্তান আন্দোলনের নেতা হতে পারেননি । সেই নেতৃত্ব চলে যায় নাজিমুদ্দীন,সোহরাওয়ার্দী ও আবুল হাশিমের কাছে ।
আবুল মুনসুর আহমদ তাঁর “আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর” বইয়ে আশ্চর্য প্রফুল্ল চন্দ্রের সাথে একটা কথোপকথন উল্লেখ করেছেন। আলাপের একপর্যায়ে প্রফুল্ল চন্দ্র বলেন—
“শোন মনসুর, আমি রাজনীতি বুঝি না। রাজনীতির ব্যাপারে নাকও গলাই না। কিন্তু আমার অনুরোধ হক মিনিস্ট্রির বিরুদ্ধে তোমরা যে অনাস্থা দিয়েছে, অবিলম্বে তা প্রত্যাহার কর।”
এই কথার জবাবে মুনসুর আহমদ তাকে অনেক যুক্তি দেখান যে কিভাবে ফজলুল হকের কারণে কৃষক প্রজা পার্টি ভাঙনের মুখে। নির্বাচনী ইস্তেহারও পালন করা হচ্ছে না। আরও অনেক কিছু। কিন্তু প্রফুল্ল রায় উত্তরে বলেন—

আরও পড়ুনঃ  ৮ বছর পর ওসমানী থেকে ফের শুরু হচ্ছে বিদেশি এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট

“তুমি যা বললে সবই রাজনীতির কথা। আমি রাজনীতির কথা বলছি না। আমি বলছি বাংগালী জাতির ভবিষ্যতের কথা। সমস্ত রাজনীতিক সত্যের উপর আরেকটা বড় সত্য আছে। সেটা বাংগালী জাতির অস্তিত্ব। বাংগালী জাতির ভবিষ্যৎ অস্তিত্ব নির্ভর করে হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের উপর। ফজলুল হক এই ঐক্যের প্রতীক। আমি কংগ্রেসীদের ভারতীয় জাতীয়তা বুঝি না। আমি বুঝি বাংগালীর জাতীয়তা। এ জাতীয়তা প্রতিষ্ঠা করতে পারে একমাত্র ফজলুল হক। ফজলুল হক মাথার চুল থেকে পায়ের নখ পর্যন্ত খাঁটি বাংগালী। সেই সংগে ফজলুল হক মাথার চুল থেকে পায়ের নখ পর্যন্ত খাঁটি মুসলমান। খাঁটি বাংগালীত্বের সাথে খাঁটি মুসলমানত্বের এমন অপূর্ব সমন্বয় আমি আর দেখি নাই। ফযলুল হক আমার ছাত্র বলে এ কথা বলছি না। সত্য বলেই এ কথা বলছি। খাঁটি বাংগালীত্ব ও খাঁটি মুসলমানত্বের সমন্বয়ই ভবিষ্যৎ বাংগালীর জাতীয়তা। ফযলুল হক ঐ সমন্বয়ের প্রতীক। এ প্রতীক তোমরা ভেংগো না। ফযলুল হকের অমর্যাদা তোমরা করো না।
শোন মনসুর আমি বলছি, বাংগালী যদি ফযলুল হকের মর্যাদা না দেয়, তবে বাংগালীর বরাতে দুঃখ আছে।” ( সূত্র: আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর-আবুল মনসুর আহমদ , খোশরোজ কিতাব মহল, ঢাকা, অধ্যায় ১২, কৃষক-প্রজা পার্টির ভূমিকা,পৃষ্ঠা: ১৩৪।)

Tag :
জনপ্রিয় পোস্ট

অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী শেরে বাংলা একে ফজলুল হকের জন্মদিন আজ

অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী শেরে বাংলা একে ফজলুল হকের জন্মদিন আজ

Update Time : ০৬:৫০:৫৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬

অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী শেরে বাংলা খ্যাত একে ফজলুল হকের জন্মদিন আজ ২৬ অক্টোবর সোমবার । এ. কে. ফজলুক হক ১৮৭৩ সালে ২৬ অক্টোবর বরিশাল জেলার রাজাপুর থানার সাতুরিয়া গ্রামে মামার বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি কাজী মুহম্মদ ওয়াজেদ এবং সাইদুন্নেসা খাতুনের একমাত্র পুত্র ছিলেন।তিনি প্রধান মন্ত্রী হয়ে নিপীড়িত মুসলমানদেরকে হিন্দু জমিদারদের করাল গ্রাস থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন। এ ছাড়া তিনি অবৈতনিক শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করেন। যার ফলে বাঙালি মুসলমানরা শিক্ষার আলো দেখতে পেয়েছিলেন । ১৯১৩ সালে মাত্র ৩৯ বছর বয়সে এ. কে. ফজলুক হক বঙ্গীয় আইন পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯১৫ সালে পুনরায় ঢাকা বিভাগ থেকে বঙ্গীয় আইন পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯১৩ থেকে ১৯১৬ সাল পর্যন্ত তিনি এ পরিষদের সভায় মোট ১৪৮ বার বক্তৃতা করেন। ১৪৮ বার বক্তৃতার ভেতর ১২৮ বার তিনি দাড়িয়ে ছিলেন মুসলমানদের শিক্ষা সম্পর্কে বক্তৃতা দেওয়ার জন্য। তার অদম্য চেষ্টার ফলে ১৯১৬ সালেকলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় কারমাইকেল ও টেইলার হোস্টেল স্থাপন করা হয়েছিল।
শেরেবাংলা তখন শিক্ষামন্ত্রী। তিনি লক্ষ্য করলেন মুসলমান শিক্ষার্থীরা পরীক্ষা দেয় কিন্তু পাশ করে না । তিনি তদন্ত কমিটি গঠন করলেন,কেন শিক্ষার্থীরা পাশ করছে না । তদন্তে বেরিয়ে আসলো হিন্দু শিক্ষকরা মুসলমান নাম দেখলেই ঘেচাং করে দিতেন । আর ফেল করেই তারা হারিয়ে যেতো । সে কারণেই উচ্চ শিক্ষায় মুসলিম শিক্ষার্থী খুঁজে পাওয়া যেতো না । এভাবেই ইচ্ছা থাকা সত্বেও শিক্ষা ক্ষেত্রে মুসলমানরা পিছিয়ে পড়ে । শেরেবাংলা শিক্ষার্থীদের নাম বাদ দিয়ে নতুন পদ্ধতিতে রুল নাম্বার দিয়ে পরীক্ষা নেওয়ার ব্যবস্থা করলেন । এতে প্রত্যাশিত সাফল্য পাওয়া যায় । যা এখনও বহাল আছে ।
নতুন পদ্ধতি প্রয়োগের প্রথম বছরেই ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হন হুমায়ুন কবির, যিনি পরবর্তীতে ভারতের শিক্ষামন্ত্রী হয়েছিলেন ।
শেরেবাংলা বাংলার কৃষকদের জমিদার ও সুদখোর মহাজনদের হাত থেকে রক্ষার জন্য ঋণ সালিশি বোর্ড গঠন করেছিলেন । যে কারণে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চালু করা মাইক্রো ক্রেডিট সিস্টেম বা সুদের ব্যবসা মাঠেমারা যায়।
লাহোর প্রস্তাব উত্থাপন,জমিদারি প্রথা উচ্ছেদ,ঋণ শালিসি বোর্ডের প্রবর্তন এবং শিক্ষার ক্ষেত্রে বাংলার অবহেলিত মুসলমানদের উজ্জীবিত করার প্রয়াসের কারণে শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক এ দেশের সাধারণ মানুষের হৃদয়ে মহানায়কের মর্যাদায় ভূষিত ছিলেন ।
জমিদারদের হাত থেকে বাংলার কৃষকদের বাঁচানোর মতো বিশাল অবদান থাকার পরও ফজলুল হকের রাজনীতির কোনো ধারাবাহিকতা ছিল না । কোনো একটি রাজনৈতিক বিশ্বাসে তিনি দীর্ঘদিন স্হির থাকতে পারতেন না । ক্ষমতার রাজনীতির পাকে পড়ে তিনি বারবার নিজের মত বদলিয়েছেন,রাজনীতির বাঁক ঘুরিয়ে দিয়েছেন । তার মতো জনপ্রিয় নেতার এই অস্হিরমতি রাজনীতি বাঙালি মুসলমানের জাতি হিসেবে অত্মবিকাশে স্বভাবতই বড় রকমের প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়িয়েছে । আজকের বাঙালি মুসলমানের দোদুল্যমান চরিত্র নির্মাণে তার নেতাদের এই অস্হিরমতি রাজনীতি যে একটা বড় ভূমিকা রেখেছে,তাতে কোনো সন্দেহ নাই । ফজলুল হক নিখিল ভারত কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক ও নিখিল ভারত মুসলিম লীগের সভাপতি পর্যন্ত হয়েছিলেন । কিন্তু তার অস্হিরমতি রাজনীতি তাকে শেষ পর্যন্ত সর্বভারতীয় নেতা না বানিয়ে স্রেফ প্রাদেশিক নেতা হওয়ার মধ্যে আটকে রেখেছিল ।
যে ফজলুল হক লাহোর প্রস্তাব উত্থাপন করেছিলেন,সেই তিনি কিছুদিন পর মুসলিম লীগ ছেড়ে দিয়ে উগ্র সাম্প্রদায়িক,আজকের বিজেপির ভাবগুরু শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির সাথে মিলেমিশে কোয়ালিশন সরকার গঠন করেছিলেন ।
১৯৫৪ সালে পূর্ব বাংলার মুখ্যমন্ত্রী হয়ে ফজলুল হক একবার কলকাতায় যান এবং সেখানে আবেগাপ্লুত হয়ে যা বলেন,তা মোটেই একজন কুশলী রাজনীতিকের লক্ষণ নয় । সেখানে তিনি অখণ্ড বাংলার পক্ষে মত দেন এবং প্রকারান্তরে মুসলিম জাতীয়তাবাদের ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেন । ১৯৫৪ সালের ৩ মে কলকাতায় তাকে প্রদত্ত সংবর্ধনার জবাবে তিনি বলেন:”একটি দেশের রাজনৈতিক বিভাগে আমি বিশ্বাস করি না । প্রকৃতপক্ষে হিন্দুস্তান ও পাকিস্তান-এই দুটি বিভেদাত্মক শব্দের সঙ্গে আমি এখন পর্যন্ত সুপরিচিত হতে পারিনি ।–যারা আমার এই সোনার দেশকে দুভাগ করেছে,তারা দেশের দুশমন । আমার মতে,পাকিস্তান বলতে কিছুই বোঝায় না । এই শব্দটি বিভ্রান্তি সূচনা করার ও স্বার্থসিদ্ধির একটি পন্হা মাত্র”।
পাকিস্তান সরকার ওই বক্তব্যের জন্য তাকে রাষ্ট্রদ্রোহী বলেছিল,তাকে গৃহবন্দী করে রেখেছিল ।
তাইতো দেখি ফজলুল হক পাকিস্তান আন্দোলনের নেতা হতে পারেননি । সেই নেতৃত্ব চলে যায় নাজিমুদ্দীন,সোহরাওয়ার্দী ও আবুল হাশিমের কাছে ।
আবুল মুনসুর আহমদ তাঁর “আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর” বইয়ে আশ্চর্য প্রফুল্ল চন্দ্রের সাথে একটা কথোপকথন উল্লেখ করেছেন। আলাপের একপর্যায়ে প্রফুল্ল চন্দ্র বলেন—
“শোন মনসুর, আমি রাজনীতি বুঝি না। রাজনীতির ব্যাপারে নাকও গলাই না। কিন্তু আমার অনুরোধ হক মিনিস্ট্রির বিরুদ্ধে তোমরা যে অনাস্থা দিয়েছে, অবিলম্বে তা প্রত্যাহার কর।”
এই কথার জবাবে মুনসুর আহমদ তাকে অনেক যুক্তি দেখান যে কিভাবে ফজলুল হকের কারণে কৃষক প্রজা পার্টি ভাঙনের মুখে। নির্বাচনী ইস্তেহারও পালন করা হচ্ছে না। আরও অনেক কিছু। কিন্তু প্রফুল্ল রায় উত্তরে বলেন—

আরও পড়ুনঃ  আজ বিশ্ব দারিদ্র্য বিমোচন দিবস: বাংলাদেশে ৪ বছরে দরিদ্র মানুষ বেড়েছে ৮০ লাখ, ঝুঁকিতে সোয়া ৬ কোটি

“তুমি যা বললে সবই রাজনীতির কথা। আমি রাজনীতির কথা বলছি না। আমি বলছি বাংগালী জাতির ভবিষ্যতের কথা। সমস্ত রাজনীতিক সত্যের উপর আরেকটা বড় সত্য আছে। সেটা বাংগালী জাতির অস্তিত্ব। বাংগালী জাতির ভবিষ্যৎ অস্তিত্ব নির্ভর করে হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের উপর। ফজলুল হক এই ঐক্যের প্রতীক। আমি কংগ্রেসীদের ভারতীয় জাতীয়তা বুঝি না। আমি বুঝি বাংগালীর জাতীয়তা। এ জাতীয়তা প্রতিষ্ঠা করতে পারে একমাত্র ফজলুল হক। ফজলুল হক মাথার চুল থেকে পায়ের নখ পর্যন্ত খাঁটি বাংগালী। সেই সংগে ফজলুল হক মাথার চুল থেকে পায়ের নখ পর্যন্ত খাঁটি মুসলমান। খাঁটি বাংগালীত্বের সাথে খাঁটি মুসলমানত্বের এমন অপূর্ব সমন্বয় আমি আর দেখি নাই। ফযলুল হক আমার ছাত্র বলে এ কথা বলছি না। সত্য বলেই এ কথা বলছি। খাঁটি বাংগালীত্ব ও খাঁটি মুসলমানত্বের সমন্বয়ই ভবিষ্যৎ বাংগালীর জাতীয়তা। ফযলুল হক ঐ সমন্বয়ের প্রতীক। এ প্রতীক তোমরা ভেংগো না। ফযলুল হকের অমর্যাদা তোমরা করো না।
শোন মনসুর আমি বলছি, বাংগালী যদি ফযলুল হকের মর্যাদা না দেয়, তবে বাংগালীর বরাতে দুঃখ আছে।” ( সূত্র: আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর-আবুল মনসুর আহমদ , খোশরোজ কিতাব মহল, ঢাকা, অধ্যায় ১২, কৃষক-প্রজা পার্টির ভূমিকা,পৃষ্ঠা: ১৩৪।)