Dhaka ০২:০৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ১০ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জামায়াতের বাধায় গোপনে সাঈদীর মামলার বাদীর দাফন, কবর খুঁড়লেন স্ত্রী-মেয়ে-বোন

যুদ্ধাপরাধের দায়ে দন্ডপ্রাপ্ত দেলোয়ার হোসেন সাঈদীর মামলার বাদী ও রাষ্ট্রপক্ষের অন্যতম প্রধান সাক্ষী বীর মুক্তিয্দ্ধো মানিক পশারীর দাফনে বাধা প্রদান করেছে জামায়াত নেতাকর্মীরা। বাধার মুখে মৃত্যুর ১৭ ঘণ্টা পর গভীর রাতে অনেকটা গোপনে দাফন সম্পনন হয় এই মুক্তিযোদ্ধার। আর কেউ উপস্থিত না থাকায় মৃতের স্ত্রী, মেয়ে ও বোন মানিক পশারির কবর খুঁড়েন।

শনিবার (২৪ অক্টোবর) রাত ২টার দিকে পিরোজপুর সদর উপজেলার শংকরপাশা ইউনিয়নের চিতলিয়া গ্রামে মানিক পশারীর বাড়িতে তার মরদেহ দাফন সম্পন্ন করে পুলিশ।

এর আগে শনিবার সকাল ১০টার দিকে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় পলাতক থাকা অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। পরে একইদিন দুপুর ১২টায় পিরোজপুর সদর উপজেলা পরিষদ চত্বরে মানিক পশারীর মরদেহ এলে জেলা জামায়াতের নেতাকর্মীদের তোপের মুখে পড়ে। জামায়াত নেতা মানিক পশারিকে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা আখ্যা দিয়ে তার লাশ দাফনে বাধা প্রদান করে। পরে পুলিশের সহায়তায় মরদেহ সরিয়ে নেওয়া হয় পুলিশ লাইনসে। সেখানে বিকেল ৫টার দিকে গার্ড অব অনার শেষে নিশ্চিদ্র নিরাপত্তায় লাশ ঘিরে রাখে সদর থানা পুলিশ।

পরে রাত ১টার দিকে সদর থানা পুলিশ মরদেহ নিয়ে বাড়িতে পৌঁছে। রাতে মানিক পশারীর স্ত্রী, মেয়ে ও বোনসহ পরিবারের অন্য সদস্যরা মিলে কবর খুঁড়ে রাত ২টার দিকে দাফন কাজ শেষ করা হয়। এসময় কিছু স্থানীয়রা উপস্থিত ছিলেন।

মানিক পশারীর বোন বলেন, আমার ভাইরে টুঙ্গিপাড়া দিয়া পিরোজপুর আনার পর ওখানে ঝামেলা হইছে। একবার মোরা কবর খুঁড়ছি, সেই কবর লোকজনে আবার ভরাট করে ফেলছে। আবার মোরা কবর খুঁড়ছি এবং পুলিশ লাশ আনার পরে মোরাই মাডি দিছি। কোনো পুরুষ মানুষ আয় নাই।

পিরোজপুর জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি আব্দুর রাজ্জাক বলেন, মানিক পশারীর লাশ দাফনে পিরোজপুর জেলা জায়ামাতের নেতা এবং অঙ্গ সংগঠনের কোনো নেতা বাঁধা সৃষ্টি করেনি। জামায়াতে ইসলামীর নেতারা লাশের রাজনীতি করে না। তাই পিরোজপুর সদর থানা পুলিশকে পুরোপুরি সহায়তা করে লাশ দাফন কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে।

আরও পড়ুনঃ  প্রকাশ্যে গুলি করে যুবদল কর্মীকে হ ত্যা

তবে এরআগে পিরোজপুর জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি আব্দুর রাজ্জাক বলেন, মানিক পশারী ‘ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা’। তাঁকে পিরোজপুরের মাটিতে দাফন করতে দেওয়া হবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

পিরোজপুর সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো: শরিফুল ইসলাম বলেন, পুলিশের নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে মানিক পশারীর লাশ দাফন সম্পন্ন করা হয়েছে। কবরের পাশে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।

মানিক পশারী (৮৭) পিরোজপুর সদর উপজেলার শংকরপাশা ইউনিয়নের চিতলিয়া গ্রামের ৭ নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা। তিনি জামায়াত নেতা দেলোয়ার হোসেন সাঈদীর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতা বিরোধী অপরাধের মামলার বাদী ও রাষ্ট্রপক্ষের অন্যতম প্রধান সাক্ষী ছিলেন। ২০২৪ সালে আগস্টে ছাত্র জনতার গণঅভ্যুত্থানের পরে তিনি যশোরে ও গোপালগঞ্জে টুঙ্গিপাড়ায় তার মেয়ের জামাইয়ের কাছে আশ্রয় নেন। মানিক গত ২ মাস ধরে অসুস্থ হয়ে মৃত্যুবরণ করেন।

উল্লেখ্য, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ২০০৯ সালে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে মানিক পশারী একটি মামলা দায়ের করেন। এই মামলায় ট্রাইব্যুনালে ২০১৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি মাওলানা সাঈদীকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। ২০১৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর সুপ্রিম কোর্টের আপীল বিভাগ তার মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেন। কারাবন্দী থাকা অবস্থায় হাসপাতালে ২০২৩ সালের ১৪ আগস্ট মাওলানা সাঈদী মারা যান।

Tag :
জনপ্রিয় পোস্ট

জামায়াতের বাধায় গোপনে সাঈদীর মামলার বাদীর দাফন, কবর খুঁড়লেন স্ত্রী-মেয়ে-বোন

Update Time : ১২:০৭:৫৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬

যুদ্ধাপরাধের দায়ে দন্ডপ্রাপ্ত দেলোয়ার হোসেন সাঈদীর মামলার বাদী ও রাষ্ট্রপক্ষের অন্যতম প্রধান সাক্ষী বীর মুক্তিয্দ্ধো মানিক পশারীর দাফনে বাধা প্রদান করেছে জামায়াত নেতাকর্মীরা। বাধার মুখে মৃত্যুর ১৭ ঘণ্টা পর গভীর রাতে অনেকটা গোপনে দাফন সম্পনন হয় এই মুক্তিযোদ্ধার। আর কেউ উপস্থিত না থাকায় মৃতের স্ত্রী, মেয়ে ও বোন মানিক পশারির কবর খুঁড়েন।

শনিবার (২৪ অক্টোবর) রাত ২টার দিকে পিরোজপুর সদর উপজেলার শংকরপাশা ইউনিয়নের চিতলিয়া গ্রামে মানিক পশারীর বাড়িতে তার মরদেহ দাফন সম্পন্ন করে পুলিশ।

এর আগে শনিবার সকাল ১০টার দিকে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় পলাতক থাকা অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। পরে একইদিন দুপুর ১২টায় পিরোজপুর সদর উপজেলা পরিষদ চত্বরে মানিক পশারীর মরদেহ এলে জেলা জামায়াতের নেতাকর্মীদের তোপের মুখে পড়ে। জামায়াত নেতা মানিক পশারিকে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা আখ্যা দিয়ে তার লাশ দাফনে বাধা প্রদান করে। পরে পুলিশের সহায়তায় মরদেহ সরিয়ে নেওয়া হয় পুলিশ লাইনসে। সেখানে বিকেল ৫টার দিকে গার্ড অব অনার শেষে নিশ্চিদ্র নিরাপত্তায় লাশ ঘিরে রাখে সদর থানা পুলিশ।

পরে রাত ১টার দিকে সদর থানা পুলিশ মরদেহ নিয়ে বাড়িতে পৌঁছে। রাতে মানিক পশারীর স্ত্রী, মেয়ে ও বোনসহ পরিবারের অন্য সদস্যরা মিলে কবর খুঁড়ে রাত ২টার দিকে দাফন কাজ শেষ করা হয়। এসময় কিছু স্থানীয়রা উপস্থিত ছিলেন।

মানিক পশারীর বোন বলেন, আমার ভাইরে টুঙ্গিপাড়া দিয়া পিরোজপুর আনার পর ওখানে ঝামেলা হইছে। একবার মোরা কবর খুঁড়ছি, সেই কবর লোকজনে আবার ভরাট করে ফেলছে। আবার মোরা কবর খুঁড়ছি এবং পুলিশ লাশ আনার পরে মোরাই মাডি দিছি। কোনো পুরুষ মানুষ আয় নাই।

পিরোজপুর জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি আব্দুর রাজ্জাক বলেন, মানিক পশারীর লাশ দাফনে পিরোজপুর জেলা জায়ামাতের নেতা এবং অঙ্গ সংগঠনের কোনো নেতা বাঁধা সৃষ্টি করেনি। জামায়াতে ইসলামীর নেতারা লাশের রাজনীতি করে না। তাই পিরোজপুর সদর থানা পুলিশকে পুরোপুরি সহায়তা করে লাশ দাফন কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে।

আরও পড়ুনঃ  গোয়াইনঘাটে ৩৬০০ কেজি ভারতীয় চোরাই জিরা উদ্ধার, আটক ২

তবে এরআগে পিরোজপুর জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি আব্দুর রাজ্জাক বলেন, মানিক পশারী ‘ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা’। তাঁকে পিরোজপুরের মাটিতে দাফন করতে দেওয়া হবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

পিরোজপুর সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো: শরিফুল ইসলাম বলেন, পুলিশের নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে মানিক পশারীর লাশ দাফন সম্পন্ন করা হয়েছে। কবরের পাশে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।

মানিক পশারী (৮৭) পিরোজপুর সদর উপজেলার শংকরপাশা ইউনিয়নের চিতলিয়া গ্রামের ৭ নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা। তিনি জামায়াত নেতা দেলোয়ার হোসেন সাঈদীর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতা বিরোধী অপরাধের মামলার বাদী ও রাষ্ট্রপক্ষের অন্যতম প্রধান সাক্ষী ছিলেন। ২০২৪ সালে আগস্টে ছাত্র জনতার গণঅভ্যুত্থানের পরে তিনি যশোরে ও গোপালগঞ্জে টুঙ্গিপাড়ায় তার মেয়ের জামাইয়ের কাছে আশ্রয় নেন। মানিক গত ২ মাস ধরে অসুস্থ হয়ে মৃত্যুবরণ করেন।

উল্লেখ্য, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ২০০৯ সালে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে মানিক পশারী একটি মামলা দায়ের করেন। এই মামলায় ট্রাইব্যুনালে ২০১৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি মাওলানা সাঈদীকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। ২০১৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর সুপ্রিম কোর্টের আপীল বিভাগ তার মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেন। কারাবন্দী থাকা অবস্থায় হাসপাতালে ২০২৩ সালের ১৪ আগস্ট মাওলানা সাঈদী মারা যান।