Dhaka ০২:১৬ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২৬, ১৪ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম :
টম ক্রুজের পদবি বাদ দিলেন মেয়ে সুরি, মায়ের মধ্যনাম ‘নোয়েল’ এখন তার শেষ নাম সীমান্তের প্রান্তিক জনপদে শিক্ষার প্রদীপ জ্বালাচ্ছে গুচ্ছগ্রাম বিদ্যালয়: প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ কালীগঞ্জে বিধবা ও প্রতিবন্ধী পরিবারের সম্পত্তি জবর দখলের অভিযোগে সংবাদ সম্মেলন ডোপ টেস্টে ইতিবাচক ফল, অভিযুক্তের ৫ মাসের জেল সহ জরিমানা আদমদীঘি থানা পুলিশের বিশেষ অভিযানে নারী সহ গ্রেপ্তার-৮!! ভূরুঙ্গামারীতে যৌথ অভিযানে ১৫ ফুটের গাঁজাগাছসহ মাদককারবারি গ্রেপ্তার রাজশাহীতে পদ্মা নদীতে নৌকাডুবি বঙ্গভবনে কার্যক্রম শুরু করেছেন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি Coronavirus disease 2019 ভারতের পর এবার চীনে গেলেন মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট

পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের চূড়ান্ত পর্বে বাংলাদেশ

  • Reporter Name
  • Update Time : ০১:৩১:০৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৯ এপ্রিল ২০২৬
  • ৫০১ Time View

পারমাণবিক শক্তি! শুনলেই কেমন যেন ভীতি কাজ করে। পারমাণবিক শক্তি ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন তামাম দুনিয়ায় অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি প্রক্রিয়া। ৩৩তম দেশ হিসেবে এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত হলো বাংলাদেশ। পাবনার ঈশ্বরদীতে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের চুল্লিপাত্রে গতকাল মঙ্গলবার জ্বালানি বা ইউরেনিয়াম প্রবেশ করানোর মাধ্যমে শুরু হয়েছে যাত্রা। সবার আশা, নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার ধাপ পেরিয়ে আগামী ফেব্রুয়ারিতে পূর্ণাঙ্গ বিদ্যুৎ উৎপাদনে যেতে পারে কেন্দ্রের প্রথম ইউনিটটি। 

আর্থিক বিবেচনায় বাংলাদেশের একক প্রকল্প হিসেবে সবচেয়ে বড় এটি। এখানে আর্থিক, কারিগরি ও প্রযুক্তিগত সব সহযোগিতা করছে রাশিয়া। প্রায় এক লাখ ১৪ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন এই প্রকল্পের ৯০ শতাংশ অর্থ ঋণ দিচ্ছে রাশিয়া, যেটি ২৮ বছরের মধ্যে পরিশোধ করতে হবে। বিদ্যুৎকেন্দ্রটির স্বাভাবিক আয়ুষ্কাল ৬০ বছর। এই সময়ে এখান থেকে মিলবে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ। তবে প্রয়োজনীয় মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ সাপেক্ষে আরও ৩০ বছর পর্যন্ত কেন্দ্রটির আয়ু বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। কেন্দ্রটিতে একবার জ্বালানি লোড করার পর তা দিয়ে চলবে টানা দেড় বছর। ফলে অন্যান্য বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো তেল, গ্যাস কিংবা কয়লা কেনার কোনো ঝক্কি-ঝামেলা নেই। দেড় বছর পর এক-তৃতীয়াংশ করে জ্বালানি পরিবর্তন করতে হবে। 

এদিকে, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পের ভেতরে গতকাল আনুষ্ঠানিকভাবে জ্বালানি লোডিং কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন ডাক ও টেলিযোগাযোগ, তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম। এই আয়োজনে ভার্চুয়ালি যুক্ত হন আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি কমিশনের মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রসি। প্রধান অতিথির বক্তব্যে মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম বলেন, ‘আজ বাংলাদেশের জন্য ঐতিহাসিক দিন। এই পারমাণবিক কেন্দ্র ঢাকা ও মস্কোর মধ্যকার ঐতিহাসিক সম্পর্ক আরও এগিয়ে নেবে। একাত্তরে রাশিয়া আমাদের সঙ্গে যে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল সে বন্ধুত্বের ধারা এখনও বজায় রয়েছে। রূপপুর প্রকল্পে জ্বালানি লোডিংয়ের মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিনের পথপরিক্রমার গৌরবময় যাত্রার পথ আরও প্রশস্ত হলো। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সুযোগ্য নেতৃত্বে বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে, রূপপুরে আজকের এই জ্বালানি লোডিং উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে সে ধারাবাহিকতার স্বাক্ষর রাখল।’ 

আরও পড়ুনঃ  মে মাস থেকে চালু হচ্ছে সিলেটের শাহজালাল সার কারখানা

প্রধানমন্ত্রীর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ বলেন, আজকের দিনটি বাংলাদেশের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ। রূপপুর প্রকল্পের মাধ্যমে বিজ্ঞানভিত্তিক উন্নয়ন দেশকে একটা শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়েছে। প্রযুক্তিগত দিক দিয়ে বাংলাদেশ আরও একধাপ এগিয়ে গেল। তিনি বলেন, রূপপুরে দেশের জ্বালানি খাতে নতুন দিগন্তের সৃষ্টি হলো। 

রুশ পরমাণু শক্তি করপোরেশনের (রোসাটম) মহাপরিচালক আলেক্সি লিখাচেভ বলেন, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে বাংলাদেশকে যেভাবে সহযোগিতা করা হয়েছে, ভবিষ্যতেও সেভাবে পাশে থাকব। নিরাপত্তা নিয়ে বাংলাদেশের মানুষকে আশ্বস্ত করতে চাই। সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ও সর্বোচ্চ মানদণ্ড বজায় রাখা হয়েছে। নিরাপদ পারমাণবিক কেন্দ্র থেকেই সরবরাহ করা হবে বিদ্যুৎ। এমনকি বর্জ্য ব্যবস্থাপনাসহ ভবিষ্যতের প্রয়োজনে সহযোগিতা থাকবে রোসাটমের।

স্বাগত বক্তব্যে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব আনোয়ার হোসেন বলেন, প্রযুক্তিগত রূপান্তরের সুযোগ এনে দিয়েছে রূপপুর। এই কেন্দ্র বাংলাদেশের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে আরও এগিয়ে নেবে। 
অনুষ্ঠানে রূপপুর প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ড. কবীর হোসেন, সাবেক প্রকল্প পরিচালক ড. শৌকত আকবর, বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. জাহেদুল হাসান প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

গতকাল রূপপুর প্রকল্পে জ্বালানি লোডিং উদ্বোধন হওয়ায় এই অঞ্চলের মানুষের মধ্যে বিদ্যুৎ নিয়ে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে। প্রবীণ শিক্ষক তাহেরুল ইসলাম বলেন, রূপপুর প্রকল্পে পরমাণু বিদ্যুৎ পাওয়ার যে পথ সুগম হলো তাতে আগামীতে বিদ্যুৎ সংকট থেকে কিছুটা হলেও রক্ষা পাওয়া যাবে। ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা আশাবাদী ভবিষ্যতে বিদ্যুতের অভাবে আর আমাদের অন্ধকারে থাকতে হবে না।’ 

কাজ করবে যেভাবে
২০২৩ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর আকাশপথে রাশিয়া থেকে ঢাকায় পৌঁছায় পারমাণবিক জ্বালানির প্রথম চালান। এরপর আসে আরও কয়েকটি চালান। বিশেষ নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে সড়কপথে অক্টোবরে রূপপুরে নিয়ে যাওয়া হয় জ্বালানি। এরপর এটি মজুত করে রাখা হয় রূপপুরে। অতিরিক্ত একটিসহ মোট ১৬৪টি বান্ডেল দেশে আনা হয়। রূপপুরে ব্যবহৃত প্রতিটি বান্ডেলে ৩১২টি জ্বালানি রড আছে।

পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জ্বালানি মূলত ইউরেনিয়াম থেকে তৈরি হয়। প্রথমে ইউরেনিয়াম অক্সাইড দিয়ে ছোট ট্যাবলেটের মতো জ্বালানি দানা (প্যালেট) বানানো হয়। এগুলোর ব্যাস সাধারণত ৮ থেকে ১৫ মিলিমিটার এবং দৈর্ঘ্য ১০ থেকে ১৫ মিলিমিটার। এমন অনেক জ্বালানি দানা প্রায় চার মিটার দীর্ঘ ধাতব নলের ভেতরে সাজিয়ে তৈরি হয় জ্বালানি রড। আবার নির্দিষ্ট কাঠামোতে অনেক রড একসঙ্গে যুক্ত করলে তৈরি হয় জ্বালানি বান্ডেল বা ফুয়েল অ্যাসেমব্লি।

আরও পড়ুনঃ  ইসলামী ব্যাংক আজ শেয়ারের মূল্যবৃদ্ধির শীর্ষে

বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য এই জ্বালানি বান্ডেল চুল্লির কেন্দ্রে বসানো হবে। রূপপুরের প্রথম ইউনিটে একসঙ্গে ব্যবহার করা হবে ১৬৩টি বান্ডেল। একবার জ্বালানি বসালে প্রায় ১৮ মাস বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়। ব্যবহৃত জ্বালানিতে তেজস্ক্রিয় পদার্থ থাকে। তাই তা বিশেষ নিরাপত্তায় রাশিয়ায় নেওয়া হবে। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার নজরদারিতে প্রতিটি জ্বালানি বান্ডেলের হিসাব থাকবে।
বিদ্যুৎকেন্দ্রটি মূলত ‘নিউক্লিয়ার ফিশন’ বা নিউকিয়াস বিভাজন প্রক্রিয়ায় কাজ করবে। রি-অ্যাক্টরে ইউরেনিয়াম জ্বালানি লোড করা হলে ইউরেনিয়ামের নিউকিয়াস বিভাজনের মাধ্যমে প্রচুর তাপশক্তি উৎপন্ন হবে।

এই তাপশক্তি দিয়ে পানিকে উচ্চচাপে বাষ্পে পরিণত করে টারবাইন ঘোরানো হয়, যা থেকে বিদ্যুৎ উৎপন্ন হবে। এটি একটি স্বয়ংক্রিয় ও নিয়ন্ত্রিত চেইন রি-অ্যাকশন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে চলে।
রি-অ্যাক্টরের ডিজাইন অনুযায়ী, ১৬৩টি ফুয়েল অ্যাসেমব্লি রি-অ্যাক্টর কোরে স্থাপন করতে হবে, যার জন্য সময় লাগবে ৩০ দিন। এ প্রক্রিয়া অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা নির্দেশিকা অনুসরণ করে সম্পন্ন করতে হয়। বিশেষ তদারকি ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রতিটি ধাপ পর্যবেক্ষণ করা হয়। জ্বালানি লোডিং শেষে শুরু হবে ফিজিক্যাল স্টার্টআপ। পরে ধাপে ধাপে উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি চলবে নিরাপত্তাবিষয়ক নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা। সব মিলিয়ে জাতীয় গ্রিডে পূর্ণ সমতায় বিদ্যুৎ পেতে সময় লাগবে প্রায় ১০ মাস।

নির্মাণ চুক্তি অনুযায়ী, তিন বছরের জ্বালানি সরবরাহ করবে রাশিয়া। অর্থাৎ এই সময়ে জ্বালানি আমদানি নিয়ে কোনো চিন্তা নেই। এরপর বাংলাদেশকে জ্বালানি তথা ইউরেনিয়াম আমদানি করতে হবে। তবে সেই জ্বালানি দুই বছর পর পর পরিবর্তন করলেই চলবে। শুরুতে প্রতি ইউনিটের খরচ ৬ টাকা ধরা হলেও অভ্যন্তরীণ সূত্র বলছে, এখন দাম পড়বে ১২ টাকা।

শুরুর গল্প
দেশে পারমাণবিক বিদ্যুতের প্রাথমিক ধারণা আসে ষাটের দশকে। ১৯৬২ সালে সম্ভাব্য ১২টি স্থান মূল্যায়নের পর পাবনার রূপপুরকে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের জন্য উপযুক্ত স্থান হিসেবে নির্বাচন করা হয়। পরবর্তীকালে ১৯৭৭ সালে ফরাসি প্রতিষ্ঠান ‘সফরাটমে’র মাধ্যমে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা হলেও তৎকালীন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার কারণে আটকে যায় প্রকল্পটি। তবে এই উদ্যোগ বাংলাদেশের পারমাণবিক বিদ্যুৎ কর্মসূচির ভিত্তি প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
এ ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন ১৯৮১ সালে ইনস্টিটিউট অব নিউক্লিয়ার সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি প্রতিষ্ঠা করে এবং ১৯৮৬ সালে ঢাকার সাভারে ৩ মেগাওয়াট ক্ষমতার গবেষণা রিঅ্যাক্টর চালু করে।

আরও পড়ুনঃ  বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদিরের (ডানে) সঙ্গে গতকাল সোমবার ভারতের হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মার সাক্ষাৎ

১৯৯৫ সালের জাতীয় জ্বালানি নীতিতে পারমাণবিক শক্তিকে একটি সম্ভাবনাময় বিকল্প জ্বালানি উৎস হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ২০১১ সালে বাংলাদেশ ও রাশিয়ার মধ্যে রূপপুরে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের জন্য একটি আন্তঃরাষ্ট্রীয় সহযোগিতা চুক্তি সই হয়। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের জন্য ২০১৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন এবং রাশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত পরমাণু সংস্থা রসাটমের মধ্যে আরেকটি চুক্তি হয়। ওই চুক্তিতে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ, যন্ত্রপাতি সরবরাহ ও স্থাপন, কমিশনিং, পরীক্ষামূলক পরিচালনা, জনবলের প্রশিক্ষণ এবং প্রাথমিক পর্যায়ে তিন বছরের পারমাণবিক জ্বালানি সরবরাহ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে রোসাটমের মহাপরিচালকের সাক্ষাৎ
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে গতকাল সকালে সচিবালয়ে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পরমাণু শক্তি সংস্থা রোসাটমের মহাপরিচালক অ্যালেক্সি লিখাচেভ। প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন জানান, বৈঠকে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পের অগ্রগতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। প্রকল্পের সফল বাস্তবায়নে রাশিয়ার কারিগরি ও প্রযুক্তিগত সহায়তার প্রশংসা করেন প্রধানমন্ত্রী। রোসাটম মহাপরিচালক অ্যালেক্সি লিখাচেভ বাংলাদেশের পারমাণবিক সক্ষমতা অর্জনের যাত্রায় রাশিয়ার পক্ষ থেকে পূর্ণ সহযোগিতার আশ্বাস দেন। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্পের অবশিষ্ট কাজ শেষ করার বিষয়েও তিনি আশা প্রকাশ করেন।

Tag :
About Author Information

টম ক্রুজের পদবি বাদ দিলেন মেয়ে সুরি, মায়ের মধ্যনাম ‘নোয়েল’ এখন তার শেষ নাম

পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের চূড়ান্ত পর্বে বাংলাদেশ

Update Time : ০১:৩১:০৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৯ এপ্রিল ২০২৬

পারমাণবিক শক্তি! শুনলেই কেমন যেন ভীতি কাজ করে। পারমাণবিক শক্তি ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন তামাম দুনিয়ায় অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি প্রক্রিয়া। ৩৩তম দেশ হিসেবে এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত হলো বাংলাদেশ। পাবনার ঈশ্বরদীতে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের চুল্লিপাত্রে গতকাল মঙ্গলবার জ্বালানি বা ইউরেনিয়াম প্রবেশ করানোর মাধ্যমে শুরু হয়েছে যাত্রা। সবার আশা, নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার ধাপ পেরিয়ে আগামী ফেব্রুয়ারিতে পূর্ণাঙ্গ বিদ্যুৎ উৎপাদনে যেতে পারে কেন্দ্রের প্রথম ইউনিটটি। 

আর্থিক বিবেচনায় বাংলাদেশের একক প্রকল্প হিসেবে সবচেয়ে বড় এটি। এখানে আর্থিক, কারিগরি ও প্রযুক্তিগত সব সহযোগিতা করছে রাশিয়া। প্রায় এক লাখ ১৪ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন এই প্রকল্পের ৯০ শতাংশ অর্থ ঋণ দিচ্ছে রাশিয়া, যেটি ২৮ বছরের মধ্যে পরিশোধ করতে হবে। বিদ্যুৎকেন্দ্রটির স্বাভাবিক আয়ুষ্কাল ৬০ বছর। এই সময়ে এখান থেকে মিলবে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ। তবে প্রয়োজনীয় মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ সাপেক্ষে আরও ৩০ বছর পর্যন্ত কেন্দ্রটির আয়ু বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। কেন্দ্রটিতে একবার জ্বালানি লোড করার পর তা দিয়ে চলবে টানা দেড় বছর। ফলে অন্যান্য বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো তেল, গ্যাস কিংবা কয়লা কেনার কোনো ঝক্কি-ঝামেলা নেই। দেড় বছর পর এক-তৃতীয়াংশ করে জ্বালানি পরিবর্তন করতে হবে। 

এদিকে, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পের ভেতরে গতকাল আনুষ্ঠানিকভাবে জ্বালানি লোডিং কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন ডাক ও টেলিযোগাযোগ, তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম। এই আয়োজনে ভার্চুয়ালি যুক্ত হন আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি কমিশনের মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রসি। প্রধান অতিথির বক্তব্যে মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম বলেন, ‘আজ বাংলাদেশের জন্য ঐতিহাসিক দিন। এই পারমাণবিক কেন্দ্র ঢাকা ও মস্কোর মধ্যকার ঐতিহাসিক সম্পর্ক আরও এগিয়ে নেবে। একাত্তরে রাশিয়া আমাদের সঙ্গে যে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল সে বন্ধুত্বের ধারা এখনও বজায় রয়েছে। রূপপুর প্রকল্পে জ্বালানি লোডিংয়ের মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিনের পথপরিক্রমার গৌরবময় যাত্রার পথ আরও প্রশস্ত হলো। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সুযোগ্য নেতৃত্বে বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে, রূপপুরে আজকের এই জ্বালানি লোডিং উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে সে ধারাবাহিকতার স্বাক্ষর রাখল।’ 

আরও পড়ুনঃ  দেশের সব বিমা কোম্পানির নিবন্ধন নবায়নে মাশুল বাড়ছে, চলতি সপ্তাহে প্রজ্ঞাপনের সম্ভাবনা

প্রধানমন্ত্রীর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ বলেন, আজকের দিনটি বাংলাদেশের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ। রূপপুর প্রকল্পের মাধ্যমে বিজ্ঞানভিত্তিক উন্নয়ন দেশকে একটা শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়েছে। প্রযুক্তিগত দিক দিয়ে বাংলাদেশ আরও একধাপ এগিয়ে গেল। তিনি বলেন, রূপপুরে দেশের জ্বালানি খাতে নতুন দিগন্তের সৃষ্টি হলো। 

রুশ পরমাণু শক্তি করপোরেশনের (রোসাটম) মহাপরিচালক আলেক্সি লিখাচেভ বলেন, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে বাংলাদেশকে যেভাবে সহযোগিতা করা হয়েছে, ভবিষ্যতেও সেভাবে পাশে থাকব। নিরাপত্তা নিয়ে বাংলাদেশের মানুষকে আশ্বস্ত করতে চাই। সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ও সর্বোচ্চ মানদণ্ড বজায় রাখা হয়েছে। নিরাপদ পারমাণবিক কেন্দ্র থেকেই সরবরাহ করা হবে বিদ্যুৎ। এমনকি বর্জ্য ব্যবস্থাপনাসহ ভবিষ্যতের প্রয়োজনে সহযোগিতা থাকবে রোসাটমের।

স্বাগত বক্তব্যে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব আনোয়ার হোসেন বলেন, প্রযুক্তিগত রূপান্তরের সুযোগ এনে দিয়েছে রূপপুর। এই কেন্দ্র বাংলাদেশের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে আরও এগিয়ে নেবে। 
অনুষ্ঠানে রূপপুর প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ড. কবীর হোসেন, সাবেক প্রকল্প পরিচালক ড. শৌকত আকবর, বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. জাহেদুল হাসান প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

গতকাল রূপপুর প্রকল্পে জ্বালানি লোডিং উদ্বোধন হওয়ায় এই অঞ্চলের মানুষের মধ্যে বিদ্যুৎ নিয়ে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে। প্রবীণ শিক্ষক তাহেরুল ইসলাম বলেন, রূপপুর প্রকল্পে পরমাণু বিদ্যুৎ পাওয়ার যে পথ সুগম হলো তাতে আগামীতে বিদ্যুৎ সংকট থেকে কিছুটা হলেও রক্ষা পাওয়া যাবে। ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা আশাবাদী ভবিষ্যতে বিদ্যুতের অভাবে আর আমাদের অন্ধকারে থাকতে হবে না।’ 

কাজ করবে যেভাবে
২০২৩ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর আকাশপথে রাশিয়া থেকে ঢাকায় পৌঁছায় পারমাণবিক জ্বালানির প্রথম চালান। এরপর আসে আরও কয়েকটি চালান। বিশেষ নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে সড়কপথে অক্টোবরে রূপপুরে নিয়ে যাওয়া হয় জ্বালানি। এরপর এটি মজুত করে রাখা হয় রূপপুরে। অতিরিক্ত একটিসহ মোট ১৬৪টি বান্ডেল দেশে আনা হয়। রূপপুরে ব্যবহৃত প্রতিটি বান্ডেলে ৩১২টি জ্বালানি রড আছে।

পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জ্বালানি মূলত ইউরেনিয়াম থেকে তৈরি হয়। প্রথমে ইউরেনিয়াম অক্সাইড দিয়ে ছোট ট্যাবলেটের মতো জ্বালানি দানা (প্যালেট) বানানো হয়। এগুলোর ব্যাস সাধারণত ৮ থেকে ১৫ মিলিমিটার এবং দৈর্ঘ্য ১০ থেকে ১৫ মিলিমিটার। এমন অনেক জ্বালানি দানা প্রায় চার মিটার দীর্ঘ ধাতব নলের ভেতরে সাজিয়ে তৈরি হয় জ্বালানি রড। আবার নির্দিষ্ট কাঠামোতে অনেক রড একসঙ্গে যুক্ত করলে তৈরি হয় জ্বালানি বান্ডেল বা ফুয়েল অ্যাসেমব্লি।

আরও পড়ুনঃ  মে মাস থেকে চালু হচ্ছে সিলেটের শাহজালাল সার কারখানা

বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য এই জ্বালানি বান্ডেল চুল্লির কেন্দ্রে বসানো হবে। রূপপুরের প্রথম ইউনিটে একসঙ্গে ব্যবহার করা হবে ১৬৩টি বান্ডেল। একবার জ্বালানি বসালে প্রায় ১৮ মাস বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়। ব্যবহৃত জ্বালানিতে তেজস্ক্রিয় পদার্থ থাকে। তাই তা বিশেষ নিরাপত্তায় রাশিয়ায় নেওয়া হবে। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার নজরদারিতে প্রতিটি জ্বালানি বান্ডেলের হিসাব থাকবে।
বিদ্যুৎকেন্দ্রটি মূলত ‘নিউক্লিয়ার ফিশন’ বা নিউকিয়াস বিভাজন প্রক্রিয়ায় কাজ করবে। রি-অ্যাক্টরে ইউরেনিয়াম জ্বালানি লোড করা হলে ইউরেনিয়ামের নিউকিয়াস বিভাজনের মাধ্যমে প্রচুর তাপশক্তি উৎপন্ন হবে।

এই তাপশক্তি দিয়ে পানিকে উচ্চচাপে বাষ্পে পরিণত করে টারবাইন ঘোরানো হয়, যা থেকে বিদ্যুৎ উৎপন্ন হবে। এটি একটি স্বয়ংক্রিয় ও নিয়ন্ত্রিত চেইন রি-অ্যাকশন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে চলে।
রি-অ্যাক্টরের ডিজাইন অনুযায়ী, ১৬৩টি ফুয়েল অ্যাসেমব্লি রি-অ্যাক্টর কোরে স্থাপন করতে হবে, যার জন্য সময় লাগবে ৩০ দিন। এ প্রক্রিয়া অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা নির্দেশিকা অনুসরণ করে সম্পন্ন করতে হয়। বিশেষ তদারকি ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রতিটি ধাপ পর্যবেক্ষণ করা হয়। জ্বালানি লোডিং শেষে শুরু হবে ফিজিক্যাল স্টার্টআপ। পরে ধাপে ধাপে উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি চলবে নিরাপত্তাবিষয়ক নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা। সব মিলিয়ে জাতীয় গ্রিডে পূর্ণ সমতায় বিদ্যুৎ পেতে সময় লাগবে প্রায় ১০ মাস।

নির্মাণ চুক্তি অনুযায়ী, তিন বছরের জ্বালানি সরবরাহ করবে রাশিয়া। অর্থাৎ এই সময়ে জ্বালানি আমদানি নিয়ে কোনো চিন্তা নেই। এরপর বাংলাদেশকে জ্বালানি তথা ইউরেনিয়াম আমদানি করতে হবে। তবে সেই জ্বালানি দুই বছর পর পর পরিবর্তন করলেই চলবে। শুরুতে প্রতি ইউনিটের খরচ ৬ টাকা ধরা হলেও অভ্যন্তরীণ সূত্র বলছে, এখন দাম পড়বে ১২ টাকা।

শুরুর গল্প
দেশে পারমাণবিক বিদ্যুতের প্রাথমিক ধারণা আসে ষাটের দশকে। ১৯৬২ সালে সম্ভাব্য ১২টি স্থান মূল্যায়নের পর পাবনার রূপপুরকে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের জন্য উপযুক্ত স্থান হিসেবে নির্বাচন করা হয়। পরবর্তীকালে ১৯৭৭ সালে ফরাসি প্রতিষ্ঠান ‘সফরাটমে’র মাধ্যমে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা হলেও তৎকালীন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার কারণে আটকে যায় প্রকল্পটি। তবে এই উদ্যোগ বাংলাদেশের পারমাণবিক বিদ্যুৎ কর্মসূচির ভিত্তি প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
এ ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন ১৯৮১ সালে ইনস্টিটিউট অব নিউক্লিয়ার সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি প্রতিষ্ঠা করে এবং ১৯৮৬ সালে ঢাকার সাভারে ৩ মেগাওয়াট ক্ষমতার গবেষণা রিঅ্যাক্টর চালু করে।

আরও পড়ুনঃ  বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদিরের (ডানে) সঙ্গে গতকাল সোমবার ভারতের হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মার সাক্ষাৎ

১৯৯৫ সালের জাতীয় জ্বালানি নীতিতে পারমাণবিক শক্তিকে একটি সম্ভাবনাময় বিকল্প জ্বালানি উৎস হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ২০১১ সালে বাংলাদেশ ও রাশিয়ার মধ্যে রূপপুরে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের জন্য একটি আন্তঃরাষ্ট্রীয় সহযোগিতা চুক্তি সই হয়। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের জন্য ২০১৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন এবং রাশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত পরমাণু সংস্থা রসাটমের মধ্যে আরেকটি চুক্তি হয়। ওই চুক্তিতে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ, যন্ত্রপাতি সরবরাহ ও স্থাপন, কমিশনিং, পরীক্ষামূলক পরিচালনা, জনবলের প্রশিক্ষণ এবং প্রাথমিক পর্যায়ে তিন বছরের পারমাণবিক জ্বালানি সরবরাহ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে রোসাটমের মহাপরিচালকের সাক্ষাৎ
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে গতকাল সকালে সচিবালয়ে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পরমাণু শক্তি সংস্থা রোসাটমের মহাপরিচালক অ্যালেক্সি লিখাচেভ। প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন জানান, বৈঠকে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পের অগ্রগতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। প্রকল্পের সফল বাস্তবায়নে রাশিয়ার কারিগরি ও প্রযুক্তিগত সহায়তার প্রশংসা করেন প্রধানমন্ত্রী। রোসাটম মহাপরিচালক অ্যালেক্সি লিখাচেভ বাংলাদেশের পারমাণবিক সক্ষমতা অর্জনের যাত্রায় রাশিয়ার পক্ষ থেকে পূর্ণ সহযোগিতার আশ্বাস দেন। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্পের অবশিষ্ট কাজ শেষ করার বিষয়েও তিনি আশা প্রকাশ করেন।