Dhaka ০৪:০৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আজ ভাষা সৈনিক-লেখক দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফের জন্মদিন

শিক্ষাবিদ, দার্শনিক, লেখক ও জাতীয় অধ্যাপক দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফের ১২০তম জন্মদিন আজ (২৫ অক্টোবর)। ১৯০৬ সালের ২৫ অক্টোবর সুনামগঞ্জের তেঘরিয়া গ্রামে নানা মরমি কবি দেওয়ান হাছন রাজার বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। ভাষা আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা, দর্শনচর্চা, শিক্ষকতা ও লেখালেখির মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছেন।

 

দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফের বাবা দেওয়ান মোহাম্মদ আসফ ছিলেন দুহালিয়ার জমিদার। মা রওশন হুসেইন বানু ছিলেন হাছন রাজার জ্যেষ্ঠ কন্যা। শৈশব থেকেই জ্ঞানচর্চায় আগ্রহী আজরফ সুনামগঞ্জের বিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষে সিলেটের মুরারিচাঁদ কলেজ থেকে ১৯৩০ সালে কৃতিত্বের সঙ্গে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শনে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। ফারসি, আরবি, সংস্কৃত ও ইংরেজি ভাষায়ও তার দক্ষতা ছিল।

 

ভাষা আন্দোলনে সাহসী ভূমিকা

 

দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ ছিলেন ভাষা আন্দোলনের দৃঢ় সমর্থক ও সক্রিয় কর্মী। ১৯৪৮ সালে সিলেট থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক ‘নওবেলাল’ পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে তিনি বাংলা ভাষার দাবির পক্ষে লেখালেখি করেন। এ ভূমিকার কারণে ১৯৫৪ সালে তাকে সুনামগঞ্জ কলেজের অধ্যক্ষের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয় বলে বিভিন্ন জীবনীতে উল্লেখ রয়েছে। পরে অবশ্য তাকে ওই পদে পুনর্বহাল করা হয়।তিনি তমদ্দুন মজলিশের সভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সমাজচিন্তায় তার অবদান ছিল উল্লেখযোগ্য।

রাজনীতি ও কারাবরণ

 

রাজনৈতিক জীবনেও সক্রিয় ছিলেন দেওয়ান আজরফ। মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর সমর্থক হিসেবে তিনি আসামে মুসলমানদের ওপর নির্যাতনের প্রতিবাদ করেন। ১৯৪৬ সালে মুসলিম লীগে যোগ দিয়ে আসাম প্রাদেশিক কমিটির সদস্য হন। পরে ১৪৪ ধারা অমান্য করার দায়ে গ্রেপ্তার হয়ে শিলচরে প্রায় ১০ মাস কারাভোগ করেন।

 

সিলেটকে তৎকালীন পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত করার পক্ষে গণভোটের প্রচারেও তিনি ভাসানীর সঙ্গে কাজ করেন। জমিদার পরিবারের সন্তান হয়েও নানকার আন্দোলনের সমর্থনে ভূমি ও বসতভিটা দানের মাধ্যমে দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি।

আরও পড়ুনঃ  নিউইয়র্ক বিমানবন্দরে হেনস্তার শিকার ড. ইউনূস

 

দর্শন ও লেখালেখিতে অনন্য অবদান

 

দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফের কর্মজীবনের বড় অংশ কেটেছে শিক্ষকতায়। ১৯৪৮ সালে সুনামগঞ্জ কলেজে যুক্তিবিদ্যার প্রভাষক হিসেবে তার শিক্ষকতা শুরু হয়। পরে বিভিন্ন কলেজে অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেন। ঢাকার আবুজর গিফারী কলেজেও তিনি দীর্ঘদিন অধ্যক্ষ ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন ও ইসলামি শিক্ষা বিভাগে খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

 

দর্শন, ধর্ম, মানবতাবাদ, সাহিত্য ও সংস্কৃতি নিয়ে তিনি বহু গ্রন্থ রচনা করেন। তার উল্লেখযোগ্য বইয়ের মধ্যে রয়েছে ইসলাম ও মানবতাবাদ, মরমি কবি হাছন রাজা, ধর্ম ও দর্শন, দর্শনের কথা, বিজ্ঞান, ধর্ম ও দর্শন এবং তমদ্দুনের বিকাশ। জীবদ্দশায় তার অর্ধশতাধিক গ্রন্থ প্রকাশিত হয়; আরও বহু লেখা অপ্রকাশিত থেকে যায়।

 

দেশের বাইরেও দর্শন ও ধর্মবিষয়ক সম্মেলনে অংশ নিয়ে তিনি বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন। ভারত, ইরাক, দক্ষিণ কোরিয়া, ইতালি ও ইরানে বিভিন্ন সম্মেলনে তার অংশগ্রহণ ও গবেষণাপত্র উপস্থাপনা তাকে আন্তর্জাতিক পরিসরে পরিচিতি এনে দেয়।

 

জাতীয় অধ্যাপক ও পুরস্কারে স্বীকৃতি

 

জ্ঞানচর্চা ও শিক্ষা ক্ষেত্রে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ স্বাধীনতা পুরস্কার, একুশে পদক, অতীশ দীপংকর পুরস্কারসহ বিভিন্ন সম্মাননা লাভ করেন। ১৯৯৩ সালের ৪ নভেম্বর বাংলাদেশ সরকার তাকে জাতীয় অধ্যাপক হিসেবে নিয়োগ দেয়।

 

১৯৯৯ সালের ১ নভেম্বর তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তার ইচ্ছা অনুযায়ী সুনামগঞ্জের দুহালিয়া গ্রামে বাবা-মায়ের কবরের পাশে তাকে সমাহিত করা হয়।

 

ভাষা আন্দোলনের সাহসী কর্মী, নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক, চিন্তাবিদ ও লেখক হিসেবে দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফের জীবন ও কর্ম আজও নতুন প্রজন্মের কাছে অনুপ্রেরণার উৎস।

Tag :
জনপ্রিয় পোস্ট

আজ ভাষা সৈনিক-লেখক দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফের জন্মদিন

Update Time : ০২:৪৯:০১ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬

শিক্ষাবিদ, দার্শনিক, লেখক ও জাতীয় অধ্যাপক দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফের ১২০তম জন্মদিন আজ (২৫ অক্টোবর)। ১৯০৬ সালের ২৫ অক্টোবর সুনামগঞ্জের তেঘরিয়া গ্রামে নানা মরমি কবি দেওয়ান হাছন রাজার বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। ভাষা আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা, দর্শনচর্চা, শিক্ষকতা ও লেখালেখির মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছেন।

 

দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফের বাবা দেওয়ান মোহাম্মদ আসফ ছিলেন দুহালিয়ার জমিদার। মা রওশন হুসেইন বানু ছিলেন হাছন রাজার জ্যেষ্ঠ কন্যা। শৈশব থেকেই জ্ঞানচর্চায় আগ্রহী আজরফ সুনামগঞ্জের বিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষে সিলেটের মুরারিচাঁদ কলেজ থেকে ১৯৩০ সালে কৃতিত্বের সঙ্গে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শনে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। ফারসি, আরবি, সংস্কৃত ও ইংরেজি ভাষায়ও তার দক্ষতা ছিল।

 

ভাষা আন্দোলনে সাহসী ভূমিকা

 

দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ ছিলেন ভাষা আন্দোলনের দৃঢ় সমর্থক ও সক্রিয় কর্মী। ১৯৪৮ সালে সিলেট থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক ‘নওবেলাল’ পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে তিনি বাংলা ভাষার দাবির পক্ষে লেখালেখি করেন। এ ভূমিকার কারণে ১৯৫৪ সালে তাকে সুনামগঞ্জ কলেজের অধ্যক্ষের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয় বলে বিভিন্ন জীবনীতে উল্লেখ রয়েছে। পরে অবশ্য তাকে ওই পদে পুনর্বহাল করা হয়।তিনি তমদ্দুন মজলিশের সভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সমাজচিন্তায় তার অবদান ছিল উল্লেখযোগ্য।

রাজনীতি ও কারাবরণ

 

রাজনৈতিক জীবনেও সক্রিয় ছিলেন দেওয়ান আজরফ। মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর সমর্থক হিসেবে তিনি আসামে মুসলমানদের ওপর নির্যাতনের প্রতিবাদ করেন। ১৯৪৬ সালে মুসলিম লীগে যোগ দিয়ে আসাম প্রাদেশিক কমিটির সদস্য হন। পরে ১৪৪ ধারা অমান্য করার দায়ে গ্রেপ্তার হয়ে শিলচরে প্রায় ১০ মাস কারাভোগ করেন।

 

সিলেটকে তৎকালীন পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত করার পক্ষে গণভোটের প্রচারেও তিনি ভাসানীর সঙ্গে কাজ করেন। জমিদার পরিবারের সন্তান হয়েও নানকার আন্দোলনের সমর্থনে ভূমি ও বসতভিটা দানের মাধ্যমে দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি।

আরও পড়ুনঃ  ‘বাংলাদেশ সোলার এক্সপো’ উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী

 

দর্শন ও লেখালেখিতে অনন্য অবদান

 

দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফের কর্মজীবনের বড় অংশ কেটেছে শিক্ষকতায়। ১৯৪৮ সালে সুনামগঞ্জ কলেজে যুক্তিবিদ্যার প্রভাষক হিসেবে তার শিক্ষকতা শুরু হয়। পরে বিভিন্ন কলেজে অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেন। ঢাকার আবুজর গিফারী কলেজেও তিনি দীর্ঘদিন অধ্যক্ষ ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন ও ইসলামি শিক্ষা বিভাগে খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

 

দর্শন, ধর্ম, মানবতাবাদ, সাহিত্য ও সংস্কৃতি নিয়ে তিনি বহু গ্রন্থ রচনা করেন। তার উল্লেখযোগ্য বইয়ের মধ্যে রয়েছে ইসলাম ও মানবতাবাদ, মরমি কবি হাছন রাজা, ধর্ম ও দর্শন, দর্শনের কথা, বিজ্ঞান, ধর্ম ও দর্শন এবং তমদ্দুনের বিকাশ। জীবদ্দশায় তার অর্ধশতাধিক গ্রন্থ প্রকাশিত হয়; আরও বহু লেখা অপ্রকাশিত থেকে যায়।

 

দেশের বাইরেও দর্শন ও ধর্মবিষয়ক সম্মেলনে অংশ নিয়ে তিনি বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন। ভারত, ইরাক, দক্ষিণ কোরিয়া, ইতালি ও ইরানে বিভিন্ন সম্মেলনে তার অংশগ্রহণ ও গবেষণাপত্র উপস্থাপনা তাকে আন্তর্জাতিক পরিসরে পরিচিতি এনে দেয়।

 

জাতীয় অধ্যাপক ও পুরস্কারে স্বীকৃতি

 

জ্ঞানচর্চা ও শিক্ষা ক্ষেত্রে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ স্বাধীনতা পুরস্কার, একুশে পদক, অতীশ দীপংকর পুরস্কারসহ বিভিন্ন সম্মাননা লাভ করেন। ১৯৯৩ সালের ৪ নভেম্বর বাংলাদেশ সরকার তাকে জাতীয় অধ্যাপক হিসেবে নিয়োগ দেয়।

 

১৯৯৯ সালের ১ নভেম্বর তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তার ইচ্ছা অনুযায়ী সুনামগঞ্জের দুহালিয়া গ্রামে বাবা-মায়ের কবরের পাশে তাকে সমাহিত করা হয়।

 

ভাষা আন্দোলনের সাহসী কর্মী, নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক, চিন্তাবিদ ও লেখক হিসেবে দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফের জীবন ও কর্ম আজও নতুন প্রজন্মের কাছে অনুপ্রেরণার উৎস।