Dhaka ০৩:৪৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

‘তোমার বাবা আকাশের তারা হয়ে গেছে’

 

 

নেত্রকোনার সাংবাদিক আলিফ নিহত হওয়ার পর তার পরিবার এখন অসহায়। পিতৃহীন চার বছরের অবুঝ শিশু প্রান্থিকে ‘মা, তুমি কেঁদো না। বাবা তো আকাশের তারা হয়ে গেছে, কদিন পরেই ফিরবে’ বলে সান্ত্বনা দিচ্ছেন মা।

পিতৃহীন হওয়ার কষ্ট বোঝার বয়স না হলেও, মায়ের চোখের জল দেখে নিজের মতো করে সান্ত্বনা দেওয়ার এই আকুতি সত্যিই বুকভাঙা।

শনিবার (১৭ অক্টোবর) বিকেলে দুর্গাপুরের গ্রামের বাড়িতে এই দৃশ্য দেখা যায়।

মেয়ের মুখে এমন কথা শুনে কান্না ধরে রাখতে পারেননি সাংবাদিক আলিফের স্ত্রী আনন্দিতা সাংমা। যে বয়সে প্রান্থির বাবার কোলে চড়ে ঘুরে বেড়ানোর কথা, সেই বয়সেই বাবাকে হারিয়ে কাঁদতে থাকা মাকে সান্ত্বনা দিতে হচ্ছে তাকে।আনন্দিতা বলেন, ‘মেয়ের মুখে এসব কথা শুনলে বুকটা ফেটে যায়। বাবা যে আর কোনোদিন ফিরে আসবে না, তা বোঝার বয়স এখনও হয়নি তার। ওর কথা শুনে আমার কান্না দ্বিগুণ হয়ে যায়। আমার কী হবে? আমার সন্তানদের কী হবে? আমার মা বিধবা! আমার বড় বোনও বিধবা! সন্ত্রাসীরা আমাকেও বিধবা করে দিলো!’

প্রান্থির ছোট ভাই আইয়ান সাফয়ানের বয়স মাত্র দেড় বছর। বাবার মৃত্যুর অর্থ বোঝার বয়স হয়নি তারও। দুই দিন ধরে বাবাকে কাছে না পেয়ে কিছুক্ষণ পরপর কেঁদে উঠছে সে। বাবা ডাকতে শিখেছে, কিন্তু সেই বাবা যে আর কোনোদিন তার ডাকে সাড়া দেবেন না, সেটি বোঝার ক্ষমতা হয়নি শিশুটির। এই দুই শিশুকে নিয়েই এখন অনিশ্চিত ভবিষ্যতের সামনে দাঁড়িয়ে আনন্দিতা। স্বামীকে হারানোর শোকের পাশাপাশি দুই সন্তানকে কীভাবে বড় করবেন, কীভাবে তাদের বাবার অভাব পূরণ করবেন- এসব প্রশ্নই এখন তাকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে।

স্বামীকে হারানোর পর স্বামীকে ‘সুপারহিরো’ মেনে আনন্দিতা বলছিলেন, ‘আমার স্বামী আমার কাছে সুপারম্যান ছিলেন। তাকে কে কীভাবে মূল্যায়ন করত, তা জানি না। তবে তিনি আমার কাছে সব সময়ই সুপারহিরো হয়ে থাকবেন।’

আরও পড়ুনঃ  শাহজালাল মাজারের দানবাক্সে ৭০ লাখ ৮৮ হাজার টাকা, মিলেছে স্বর্ণ-রুপাসহ ১৯ দেশের মুদ্রা

কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘বিয়ের পর থেকে একটা রাতও আমাকে ছাড়া তিনি থাকতে পারতেন না। প্রতিদিন আমার মুখে ভাত তুলে দিতেন। আমি নিজের হাতে খেতাম না, তার হাতে খেতাম। আমার পড়ালেখার পেছনেও তার অবদান আছে। আমি নার্সিং পাস করেছি। তিনি আমার চাকরিরও ব্যবস্থাও করবেন বলছিলেন। কিন্তু এখন সব শেষ হয়ে গেছে।’

আনন্দিতার ভাষ্য, ঢাকা বা সিলেটে চাকরি হলে স্বামী-সন্তান নিয়ে দুর্গাপুর থেকে চলে যাওয়ার পরিকল্পনাও করেছিলেন তিনি। সেই পরিকল্পনা আর বাস্তবায়ন হলো না।

স্বামী হত্যার বিচার চাওয়ার পাশাপাশি সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়েও শংকিত আনন্দিতা। তিনি বলেন, ‘বাবাহীন ছোট ছোট ছেলে-মেয়েকে আমি কীভাবে মানুষ করব? আলিফ ছেলে-মেয়েকে খুব ভালোবাসত, অনেক আদর করত। ওরা তো আর কোনোদিন বাবার আদর পাবে না।’

কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘যারা আমার সন্তানদের এতিম করেছে, বাবার স্নেহ থেকে বঞ্চিত করেছে, আমি তাদের কঠিন শাস্তি দেখতে চাই। হত্যাকারীদের দ্রুত গ্রেপ্তার করা হোক।’

আলিফের বড় বোন কল্পনা আক্তারও সরকারের কাছে হত্যাকারীদের বিচারের পাশাপাশি তার স্ত্রী-সন্তানদের সহায়তার দাবি জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘তার ভাইয়ের স্ত্রী নার্সিংয়ে পড়াশোনা করেছেন। তাকে চাকরির ব্যবস্থা করে দিলে দুই সন্তানকে মানুষ করে তোলা সহজ হবে।’

আলিফের শাশুড়ি শিলা রাংসার কণ্ঠেও একই উদ্বেগ। তিনি বলেন, ‘আমার জামাতাকে এতগুলো গুলি করে মেরে ফেলল। এখন আমরা কার কাছে বিচার চাইব? ছোট দুটি বাচ্চা নিয়ে আমার মেয়েটা কীভাবে চলবে? আমিও তো গরিব।’

এর আগে, বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) রাত সোয়া আটটার দিকে নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলার তেলুঞ্জিয়া এলাকায় সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকিরকে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা।

এ ঘটনায়, শনিবার (১৭ অক্টোবর) দিবাগত রাতে অপূর্ব (২৪) নামে এক যুবককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

নিহত লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকির বেসরকারি আইপিটিভি (ইন্টারনেট প্রটোকল টেলিভিশন) চ্যানেল রূপসী বাংলার নেত্রকোনা প্রতিনিধি হিসেবে কর্মরত ছিলেন। পাশাপাশি তিনি ‘ডিটেকটিভ আর্টিকেল’ নামে একটি ফেসবুক পেজ পরিচালনা করতেন। ওই পেজে বিভিন্ন অনিয়ম, দুর্নীতি ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড নিয়ে লেখালেখি করতেন তিনি।

আরও পড়ুনঃ  ওষুধ কারখানার আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে ১৯ ইউনিট

তার গ্রামের বাড়ি জেলার কলমাকান্দা উপজেলার পোগলা ইউনিয়নের সুনই গ্রামে। তিনি দুর্গাপুরের তেলুঞ্জিয়া এলাকায় শ্বশুরবাড়ি থাকতেন। তার চার বছর বয়সী একটি মেয়ে ও দেড় বছর বয়সী একটি ছেলে রয়েছে।

Tag :
জনপ্রিয় পোস্ট

‘তোমার বাবা আকাশের তারা হয়ে গেছে’

Update Time : ০১:০৭:৩৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬

 

 

নেত্রকোনার সাংবাদিক আলিফ নিহত হওয়ার পর তার পরিবার এখন অসহায়। পিতৃহীন চার বছরের অবুঝ শিশু প্রান্থিকে ‘মা, তুমি কেঁদো না। বাবা তো আকাশের তারা হয়ে গেছে, কদিন পরেই ফিরবে’ বলে সান্ত্বনা দিচ্ছেন মা।

পিতৃহীন হওয়ার কষ্ট বোঝার বয়স না হলেও, মায়ের চোখের জল দেখে নিজের মতো করে সান্ত্বনা দেওয়ার এই আকুতি সত্যিই বুকভাঙা।

শনিবার (১৭ অক্টোবর) বিকেলে দুর্গাপুরের গ্রামের বাড়িতে এই দৃশ্য দেখা যায়।

মেয়ের মুখে এমন কথা শুনে কান্না ধরে রাখতে পারেননি সাংবাদিক আলিফের স্ত্রী আনন্দিতা সাংমা। যে বয়সে প্রান্থির বাবার কোলে চড়ে ঘুরে বেড়ানোর কথা, সেই বয়সেই বাবাকে হারিয়ে কাঁদতে থাকা মাকে সান্ত্বনা দিতে হচ্ছে তাকে।আনন্দিতা বলেন, ‘মেয়ের মুখে এসব কথা শুনলে বুকটা ফেটে যায়। বাবা যে আর কোনোদিন ফিরে আসবে না, তা বোঝার বয়স এখনও হয়নি তার। ওর কথা শুনে আমার কান্না দ্বিগুণ হয়ে যায়। আমার কী হবে? আমার সন্তানদের কী হবে? আমার মা বিধবা! আমার বড় বোনও বিধবা! সন্ত্রাসীরা আমাকেও বিধবা করে দিলো!’

প্রান্থির ছোট ভাই আইয়ান সাফয়ানের বয়স মাত্র দেড় বছর। বাবার মৃত্যুর অর্থ বোঝার বয়স হয়নি তারও। দুই দিন ধরে বাবাকে কাছে না পেয়ে কিছুক্ষণ পরপর কেঁদে উঠছে সে। বাবা ডাকতে শিখেছে, কিন্তু সেই বাবা যে আর কোনোদিন তার ডাকে সাড়া দেবেন না, সেটি বোঝার ক্ষমতা হয়নি শিশুটির। এই দুই শিশুকে নিয়েই এখন অনিশ্চিত ভবিষ্যতের সামনে দাঁড়িয়ে আনন্দিতা। স্বামীকে হারানোর শোকের পাশাপাশি দুই সন্তানকে কীভাবে বড় করবেন, কীভাবে তাদের বাবার অভাব পূরণ করবেন- এসব প্রশ্নই এখন তাকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে।

স্বামীকে হারানোর পর স্বামীকে ‘সুপারহিরো’ মেনে আনন্দিতা বলছিলেন, ‘আমার স্বামী আমার কাছে সুপারম্যান ছিলেন। তাকে কে কীভাবে মূল্যায়ন করত, তা জানি না। তবে তিনি আমার কাছে সব সময়ই সুপারহিরো হয়ে থাকবেন।’

আরও পড়ুনঃ  সিলেট মহানগর বিএনপির সভাপতি হিসেবে আবারও দায়িত্ব পেলেন নাসিম হোসাইন

কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘বিয়ের পর থেকে একটা রাতও আমাকে ছাড়া তিনি থাকতে পারতেন না। প্রতিদিন আমার মুখে ভাত তুলে দিতেন। আমি নিজের হাতে খেতাম না, তার হাতে খেতাম। আমার পড়ালেখার পেছনেও তার অবদান আছে। আমি নার্সিং পাস করেছি। তিনি আমার চাকরিরও ব্যবস্থাও করবেন বলছিলেন। কিন্তু এখন সব শেষ হয়ে গেছে।’

আনন্দিতার ভাষ্য, ঢাকা বা সিলেটে চাকরি হলে স্বামী-সন্তান নিয়ে দুর্গাপুর থেকে চলে যাওয়ার পরিকল্পনাও করেছিলেন তিনি। সেই পরিকল্পনা আর বাস্তবায়ন হলো না।

স্বামী হত্যার বিচার চাওয়ার পাশাপাশি সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়েও শংকিত আনন্দিতা। তিনি বলেন, ‘বাবাহীন ছোট ছোট ছেলে-মেয়েকে আমি কীভাবে মানুষ করব? আলিফ ছেলে-মেয়েকে খুব ভালোবাসত, অনেক আদর করত। ওরা তো আর কোনোদিন বাবার আদর পাবে না।’

কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘যারা আমার সন্তানদের এতিম করেছে, বাবার স্নেহ থেকে বঞ্চিত করেছে, আমি তাদের কঠিন শাস্তি দেখতে চাই। হত্যাকারীদের দ্রুত গ্রেপ্তার করা হোক।’

আলিফের বড় বোন কল্পনা আক্তারও সরকারের কাছে হত্যাকারীদের বিচারের পাশাপাশি তার স্ত্রী-সন্তানদের সহায়তার দাবি জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘তার ভাইয়ের স্ত্রী নার্সিংয়ে পড়াশোনা করেছেন। তাকে চাকরির ব্যবস্থা করে দিলে দুই সন্তানকে মানুষ করে তোলা সহজ হবে।’

আলিফের শাশুড়ি শিলা রাংসার কণ্ঠেও একই উদ্বেগ। তিনি বলেন, ‘আমার জামাতাকে এতগুলো গুলি করে মেরে ফেলল। এখন আমরা কার কাছে বিচার চাইব? ছোট দুটি বাচ্চা নিয়ে আমার মেয়েটা কীভাবে চলবে? আমিও তো গরিব।’

এর আগে, বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) রাত সোয়া আটটার দিকে নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলার তেলুঞ্জিয়া এলাকায় সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকিরকে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা।

এ ঘটনায়, শনিবার (১৭ অক্টোবর) দিবাগত রাতে অপূর্ব (২৪) নামে এক যুবককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

নিহত লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকির বেসরকারি আইপিটিভি (ইন্টারনেট প্রটোকল টেলিভিশন) চ্যানেল রূপসী বাংলার নেত্রকোনা প্রতিনিধি হিসেবে কর্মরত ছিলেন। পাশাপাশি তিনি ‘ডিটেকটিভ আর্টিকেল’ নামে একটি ফেসবুক পেজ পরিচালনা করতেন। ওই পেজে বিভিন্ন অনিয়ম, দুর্নীতি ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড নিয়ে লেখালেখি করতেন তিনি।

আরও পড়ুনঃ  আনন্দভ্রমণ পরিণত হলো শোকে,টাঙ্গুয়ার হাওরে গোসল করতে নেমে পর্যটকের মৃত্যু

তার গ্রামের বাড়ি জেলার কলমাকান্দা উপজেলার পোগলা ইউনিয়নের সুনই গ্রামে। তিনি দুর্গাপুরের তেলুঞ্জিয়া এলাকায় শ্বশুরবাড়ি থাকতেন। তার চার বছর বয়সী একটি মেয়ে ও দেড় বছর বয়সী একটি ছেলে রয়েছে।