স্বপ্ন ছিল আমেরিকায় গিয়ে ভাগ্য বদলাবেন। নিজের হাতে গড়বেন স্ত্রী-সন্তানের সুন্দর ভবিষ্যৎ। ঋণের বোঝা শোধ করে দেশে ফিরবেন, তারপর প্রিয় মানুষগুলোকে নিয়ে পাড়ি জমাবেন নতুন জীবনের পথে। কিন্তু সেই স্বপ্নের আমেরিকাতেই বন্দুকধারীর গুলিতে নিভে গেল নোয়াখালীর মো. ইউসুফ রাজুর জীবন।
মাত্র ৪৪ বছর বয়সে প্রবাসের মাটিতে প্রাণ হারালেন সোনাইমুড়ীর এই যুবক। নিউইয়র্কের ব্রুকলিনে কর্মস্থলে বন্দুকধারীর গুলিতে নিহত হয়েছেন তিনি। একই ঘটনায় গুলিবিদ্ধ হয়েছেন তাঁর বাংলাদেশি সহকর্মী রাসেল।
স্থানীয় সময় শনিবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে ব্রুকলিনের রাউনসভিল এলাকার ‘আমেরিকান বেস্ট উইংস অ্যান্ড পিজ্জা’ নামের একটি দোকানে এ ঘটনা ঘটে।
রাজুর মৃত্যুর খবর দেশে পৌঁছানোর পর থেকেই নোয়াখালীর সোনাইমুড়ীর কংশনগর গ্রামে নেমে এসেছে শোকের মাতম। যে বাড়িতে প্রিয়জনের ফেরার অপেক্ষা ছিল, সেই বাড়িতেই এখন কেবল কান্না আর আহাজারি। স্বামীকে হারিয়ে স্ত্রী পলি আক্তারের চোখে অন্ধকার। বাবাকে হারিয়ে দুই ছোট্ট মেয়ের ভবিষ্যৎও যেন অনিশ্চয়তার মুখে।
নিহত ইউসুফ রাজুর বাড়ি সোনাইমুড়ী উপজেলার আমিশাপাড়া ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের কংশনগর গ্রামে। কৃষক মোহাম্মদ উল্লার তিন ছেলে ও তিন মেয়ের মধ্যে রাজু ছিলেন দ্বিতীয়।
পরিবারের ভাগ্য বদলের আশায় ২০২৩ সালের অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমিয়েছিলেন রাজু। দেশ ছাড়ার সময় তাঁর স্ত্রী ছিলেন সন্তানসম্ভবা। বুকভরা স্বপ্ন নিয়ে প্রবাসে গিয়েছিলেন তিনি—একদিন প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের কাজ শেষ করে দেশে ফিরবেন, এরপর স্ত্রী ও সন্তানদেরও আমেরিকায় নিয়ে যাবেন।
কিন্তু নিয়তির নির্মম পরিহাস, সেই মানুষটিই আর জীবিত হয়ে দেশে ফিরতে পারলেন না।
স্বজনরা জানান, যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক আশ্রয়ের জন্য আবেদন করেছিলেন রাজু। সেখানে কাজ করার বৈধ কাগজপত্রও ছিল তাঁর। প্রবাসে থাকাকালীন জন্ম নেয় তাঁর ছোট মেয়ে রাইসা। মেয়েটির বয়স এখন মাত্র আড়াই বছর। বড় মেয়ের বয়স ১২ বছর।
বাবা যে দূরদেশে আছেন, একদিন ফিরে এসে তাদের কাছে নিয়ে যাবেন—হয়তো এমন স্বপ্নই ছিল দুই মেয়ের চোখে। কিন্তু সেই বাবা এখন ফিরবেন নিথর দেহ হয়ে।
রাজুর স্ত্রী পলি আক্তার এখন দুই সন্তানকে নিয়ে দিশেহারা। স্বজনরা জানান, বিদেশ যাওয়ার সময় রাজু ঋণ করেছিলেন। পরিবারের জন্য একটি স্থায়ী ঘর করার স্বপ্নও ছিল তাঁর। কিন্তু সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষটি চলে যাওয়ায় সেই স্বপ্নগুলোও এখন থমকে গেছে।
রাজুর স্বজনদের আহাজারিতে বারবার ফিরে আসছে তাঁর ফেলে যাওয়া স্বপ্নের কথা। পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে যে মানুষটি হাজার হাজার মাইল দূরে গিয়েছিলেন, তাঁর নিজের মুখের হাসিই আজ চিরতরে থেমে গেছে।
এলাকাবাসী জানান, রাজু ছিলেন পরিবারের প্রতি দায়িত্বশীল ও পরিশ্রমী। অভাব ঘোচানোর আশায় তিনি দেশ ছেড়েছিলেন। তাঁর এমন মৃত্যু মেনে নিতে পারছেন না স্বজন ও প্রতিবেশীরা।
এদিকে দ্রুত রাজুর মরদেহ দেশে ফিরিয়ে এনে পরিবারের কাছে হস্তান্তরের ব্যবস্থা করার দাবি জানিয়েছেন স্বজন ও এলাকাবাসী। পাশাপাশি অসহায় স্ত্রী ও দুই শিশুকন্যার পাশে দাঁড়াতে সরকারের সহযোগিতাও কামনা করেছেন তাঁরা।
একটি উন্নত জীবনের আশায় দেশ ছেড়েছিলেন ইউসুফ রাজু। স্বপ্ন ছিল—একদিন স্ত্রী-সন্তানকে নিয়ে হাসিমুখে ফিরবেন, নিজের ঘর করবেন, সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়বেন। কিন্তু স্বপ্নের আমেরিকার মাটিতেই একটি গুলি কেড়ে নিল সেই স্বপ্নের মানুষটিকে।
এখন আর রাজুর ফেরার অপেক্ষা নেই। অপেক্ষা শুধু তাঁর নিথর দেহের। আর কংশনগরের সেই বাড়িতে দুই শিশু কন্যার চোখে হয়তো একটাই প্রশ্ন—বাবা আর কোনোদিন ফিরবে না?
নোয়াখালী প্রতিনিধি 


















