
নেপাল ও চীনের তিব্বত অঞ্চলজুড়ে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে অন্তত ১৬৫ জন নিহত হয়েছেন। একই ঘটনায় নেপাল ও তিব্বত মিলিয়ে প্রায় ১ হাজার ৫০০ মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। নিখোঁজদের মধ্যে ২৮টিরও বেশি দেশের ৮০০-এর বেশি বিদেশি নাগরিক রয়েছেন।
বুধবার (২৬ আগস্ট) হিমালয়ের নেপাল-তিব্বত সীমান্তবর্তী এলাকায় একটি নদীতে কাদা, বরফ ও পাথরের বিশাল স্রোত নেমে আসার পর ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা দেখা দেয়। প্রবল স্রোতে বাড়িঘর, সড়ক, সেতু, যানবাহন ও বিদ্যুৎ প্রকল্প ধ্বংস হয়ে যায়। দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল হওয়ায় উদ্ধারকাজও ব্যাহত হচ্ছে।
নেপাল পুলিশ ও পর্যটন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দেশটিতে নিখোঁজ ৮২৬ জনের মধ্যে প্রায় ৬০০ জন বিদেশি। নিখোঁজ বিদেশিদের মধ্যে ভারতের ১৭৭ জন, যুক্তরাষ্ট্রের ৬৩ জন, অস্ট্রেলিয়ার ৩৪ জন, যুক্তরাজ্যের ৩৩ জন এবং কানাডার ২৫ জন রয়েছেন।
অন্যদিকে, চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি জানিয়েছে, তিব্বতের জিরং কাউন্টিতে ৫৫৮ জন নিখোঁজ রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ২৬০ জন বিদেশি নাগরিক। তিব্বতে এখন পর্যন্ত তিনজনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে চীন।
হিমালয়ের নদীতে ধস, এরপর ভয়াবহ বন্যা
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হিমালয়ের একটি হিমবাহের নিচের অংশ ধসে পড়ার পর বরফ ও পাথরের বিশাল স্রোত লেন্দে খোলা নদীতে নেমে আসে। এর ফলে দ্রুতগতির কাদা ও ধ্বংসাবশেষের স্রোত নেপাল ও তিব্বতের বিস্তীর্ণ এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে।
প্রাথমিকভাবে নেপালের কর্মকর্তারা ঘটনাটিকে ভূমিকম্পের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে ধারণা করেছিলেন। তবে যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (USGS) পরবর্তী বিশ্লেষণে জানায়, প্রথমে ৪ দশমিক ৪ মাত্রার ভূমিকম্প হিসেবে শনাক্ত হওয়া কম্পনটি আসলে হিমবাহের বরফ ও পাথর ধসে সৃষ্ট ভূকম্পনজনিত শক্তি।
নিখোঁজদের সন্ধানে ৫ হাজারের বেশি সদস্য
দুর্গম পার্বত্য এলাকায় আটকা পড়া মানুষদের উদ্ধারে নেপাল সেনাবাহিনী ও পুলিশ হেলিকপ্টার ব্যবহার করছে। দুর্গতদের কাছে খাবার, তাঁবু ও অন্যান্য জরুরি সামগ্রী পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।
নেপাল সেনাবাহিনীর একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, উদ্ধার ও নিখোঁজদের সন্ধানে ৫ হাজারের বেশি সেনা ও পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। প্রতিবেশী ভারত থেকে পাঠানো তাঁবু, খাবার ও অন্যান্য ত্রাণসামগ্রীও হেলিকপ্টারের মাধ্যমে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।
তিব্বতে নতুন ঝুঁকি
বন্যার পর তিব্বতের জিরং এলাকায় আরও একটি বড় ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। চীনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, একটি বাঁধে আটকে থাকা হ্রদ থেকে নতুন করে পানি ও ধ্বংসাবশেষ নেমে আসার আশঙ্কা রয়েছে। এ কারণে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের সরিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং হ্রদটির পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
কৈলাস-মানস সরোবরের তীর্থযাত্রীরাও নিখোঁজ
নিহত ও নিখোঁজদের অনেকেই কৈলাস-মানস সরোবরের তীর্থযাত্রী ছিলেন। হিন্দু ও বৌদ্ধসহ বিভিন্ন ধর্মের মানুষের কাছে তিব্বতের এই অঞ্চল অত্যন্ত পবিত্র। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস, কৈলাস পর্বত ভগবান শিবের আবাসস্থল।
হিমালয়ভিত্তিক একটি পর্যটন প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী জানিয়েছেন, তাঁদের প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তীর্থযাত্রায় যাওয়া ১৫ জন ভারতীয়-অস্ট্রেলীয় নাগরিক নিখোঁজ রয়েছেন।
আন্তর্জাতিক সহায়তা
দুর্যোগ মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহায়তাও শুরু হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, তারা একজন দুর্যোগ মোকাবিলা পরামর্শক পাঠানোর পাশাপাশি ৫ লাখ ডলার সহায়তা দেবে। জাতিসংঘও ক্ষতিগ্রস্ত নেপালি জনগোষ্ঠীর সহায়তায় ত্রাণসামগ্রী ও কর্মী পাঠাচ্ছে।
এদিকে, ভয়াবহ বন্যায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির পরও উদ্ধারকারীরা দুর্গম এলাকায় নিখোঁজদের সন্ধান চালিয়ে যাচ্ছেন। ধ্বংসস্তূপের নিচে আরও মরদেহ থাকতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ফলে মৃত ও নিখোঁজের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
আন্তর্জাতিক ডেস্ক 


















