Dhaka ০৪:৫১ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম :
ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক আরও জোরদার করতে চায় বাংলাদেশ: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী হতে শিক্ষাগত যোগ্যতা লাগবে না: প্রতিমন্ত্রী শাহে আলম গোয়াইনঘাটে অবৈধ বালু উত্তোলনবিরোধী অভিযান, জরিমানা ৩ জনকে মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্যাতন, গরম খুন্তি দিয়ে দুই ছাত্রকে ছ্যাঁকা; পরিচালকসহ গ্রেপ্তার ৩ কুড়িয়ে পাওয়া টাকা ফেরত দিতে মালিকের সন্ধানে দুদিন ধরে মাইকিং করছেন এক যুবক ৮ দফা দাবিতে রেলপথ অবরোধ, থামল কপোতাক্ষ এক্সপ্রেস ঢাকায় গোপন বৈঠক, যুবলীগের ৮ নেতা গ্রেপ্তার বিএনপির বিভিন্ন কমিটির শূন্যপদে পদোন্নতি হবে কীভাবে, জানালেন রিজভ রাষ্ট্রপতির সিলেট সফর ঘিরে ব্যাপক প্রস্তুতি, সাজছে নগরী ২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি হবে বাংলাদেশ: বিমানমন্ত্রী

পাশাপাশি কবরে চিরনিদ্রায় এক পরিবারের ৫ জন

  • Reporter Name
  • Update Time : ০৩:১৯:২৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৬ মে ২০২৬
  • ৫১৪ Time View

প্রায় ২০ বছর আগে এক বুক আশা নিয়ে ঢাকায় পাড়ি জমিয়েছিলেন পটুয়াখালীর আবুল কালাম। স্বপ্ন ছিল, কোরবানির ঈদে গ্রামে ফিরে নতুন পাকা ঘরের ছাদ ঢালাই করে স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে উঠবেন। সেই আবুল কালাম ও তাঁর পরিবার ঠিকই গ্রামে ফিরেছেন, তবে স্বপ্নের ঘরে নয়; সাদা কফিনে মোড়া লাশ হয়ে। 

শনিবার সকালে মা সালমা বেগম (৪০), একমাত্র ছেলে মুন্না (১২), দুই মেয়ে মুন্নী (৯) ও কথা (৭)-এর সাদা কফিনে মোড়ানো লাশ পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার কনকদিয়া ইউনিয়নের উত্তর কনকদিয়া গ্রামের কাড়াল বাড়িতে এসে পৌঁছায়। এর আগে গত সোমবার সকালে দাফন করা হয়েছিল গৃহকর্তা কালাম মিয়া (৪৫)-এর লাশ। নতুন বাড়ির পুকুরপাড়ে কালাম মিয়ার কবরের ঠিক পাশেই বাকি চারজনের লাশ দাফন করা হয়েছে। এর আগে, গত রোববার (১০ মে) নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় গ্যাস লিকেজ থেকে বিস্ফোরণে দগ্ধ হয়ে একে একে না-ফেরার দেশে চলে গেছেন স্বামী, স্ত্রী ও তাঁদের তিন সন্তান। শনিবার সকালে পটুয়াখালীর বাউফলে পাশাপাশি পাঁচটি কবরে চিরনিদ্রায় শায়িত হয়েছে এই পরিবারের সকল সদস্য।  

জানা গেছে, কালাম মিয়া দীর্ঘদিন ধরে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার সাইনবোর্ড এলাকায় কাঁচামালের ব্যবসা করতেন। স্ত্রী ও তিন সন্তানকে নিয়ে ভুইগড় এলাকার একটি ১০ তলা ভবনের নিচতলায় দুটি রুম ভাড়া নিয়ে থাকতেন তিনি। গত রোববার  সকাল ৬টার দিকে কালাম মিয়া রান্নাঘরে গ্যাসের চুলায় তরকারি গরম করতে যান। তখন স্ত্রী ও সন্তানরা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ছিল। ঘরটিতে আগে থেকেই জমে থাকা লিকেজ গ্যাস দেশলাইয়ের সংস্পর্শে আসতেই বিকট শব্দে বিস্ফোরিত হয়। মুহূর্তের মধ্যে আগুন ছড়িয়ে পড়ে পুরো ঘরে। জ্বলন্ত আগুনের মাঝেও বাবা কালাম দরজা খুলে দগ্ধ ছেলে মুন্নাকে বাইরে বের করে দেন, কিন্তু মুহূর্তেই আগুনের লেলিহান শিখা পুরো পরিবারকে গ্রাস করে।  পরে স্থানীয় বাসিন্দা ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা তাদের উদ্ধার করে দ্রুত ঢাকা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ভর্তি করেন। 

আরও পড়ুনঃ  ৩৪০০ চুমু দিয়ে বয়ফ্রেন্ডের গাড়ি সাজালেন তরুণী, অতঃপর...

স্বজনদের অভিযোগ, বাসার গ্যাসের পাইপ লিকেজ হওয়ার বিষয়টি কালাম মিয়া আগের দিনই ভবনের দারোয়ানকে জানিয়েছিলেন। কিন্তু দারোয়ান অলসতা করে বাড়ির মালিককে তা জানাননি। 

মৃত্যুর এই নির্মম মিছিলে প্রথমে বিদায় নেয় পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি আবুল কালাম মিয়া। দুর্ঘটনার দিন রোববারই চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। স্বজনরা রাতেই তার মরদেহ নিয়ে আসেন কনকদিয়া ইউনিয়নের উত্তর কনকদিয়া গ্রামের বাড়িতে এবং সোমবার সকাল ১০টায় তার জানাজা শেষে দাফন করা হয়। 

এরপর গত বুধবার বিকেলে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে ৭ বছরের শিশু কথা মনি। মায়ের কোল খালি করে চলে যাওয়া কথার লাশ রাখা হয় জাতীয় বার্ন ইউনিট হাসপাতালের হিমাগারে, কারণ বাকিদের অবস্থাও ছিল আশঙ্কাজনক। বুধবার রাত ১১টায় বোনকে হারানোর কয়েক ঘণ্টার মাথায় মারা যায় একমাত্র ছেলে মুন্না (১২)। বৃহস্পতিবার না-ফেরার দেশে চলে যায় মেঝ মেয়ে মুন্নী (৯)। শেষে গতকাল শুক্রবার সকাল ৮টায় শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন মা সালমা বেগম (৪০)।

কালাম মিয়ার বোন রাসেদা বেগম বিলাপ করে বলেন, ‘ভাই বলছিল, এবার ঈদে বাড়ি আইসা ঘরের কাজ শেষ করমু। ভাই আমার বাড়ি ফিরল, কিন্তু লাশ হয়ে!’ 

কালাম মিয়ার চাচাতো ভাই সোহাগ বলেন, ‘প্রায় ২০-২২ বছর আগে কালাম বাড়ি ছেড়ে ঢাকায় গিয়ে উজিরপুরে বিয়ে করেছিল। কত কষ্ট করে ফতুল্লার ব্যবসাটা দাঁড় করাল। মাত্র ২০-২৫ দিন আগেও ঢাকায় ওর সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল। ভাবতেই পারছি না, ভাই-ভাবি আর বাচ্চারা এভাবে আমাদের ছেড়ে একেবারে চলে যাবে!’  

নিহতদের জানাজার নামাজে বাউফলের সংসদ সদস্য ও জামায়াতে ইসলামীর ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সেক্রেটারি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদসহ শত শত মুসল্লি উপস্থিত ছিলেন। তাঁর ব্যক্তিগত পক্ষ থেকে নিহতদের লাশ পরিবহন ও দাফন সম্পন্ন করার যাবতীয় ব্যবস্থা করা হয়। বাউফল উপজেলা নির্বাহী অফিসার সালেহ আহম্মেদও এই ঘটনাকে অত্যন্ত মর্মাহত ও হৃদয়বিদারক বলে সমবেদনা জানিয়েছেন।

Tag :
About Author Information

জনপ্রিয় পোস্ট

ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক আরও জোরদার করতে চায় বাংলাদেশ: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী

পাশাপাশি কবরে চিরনিদ্রায় এক পরিবারের ৫ জন

Update Time : ০৩:১৯:২৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৬ মে ২০২৬

প্রায় ২০ বছর আগে এক বুক আশা নিয়ে ঢাকায় পাড়ি জমিয়েছিলেন পটুয়াখালীর আবুল কালাম। স্বপ্ন ছিল, কোরবানির ঈদে গ্রামে ফিরে নতুন পাকা ঘরের ছাদ ঢালাই করে স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে উঠবেন। সেই আবুল কালাম ও তাঁর পরিবার ঠিকই গ্রামে ফিরেছেন, তবে স্বপ্নের ঘরে নয়; সাদা কফিনে মোড়া লাশ হয়ে। 

শনিবার সকালে মা সালমা বেগম (৪০), একমাত্র ছেলে মুন্না (১২), দুই মেয়ে মুন্নী (৯) ও কথা (৭)-এর সাদা কফিনে মোড়ানো লাশ পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার কনকদিয়া ইউনিয়নের উত্তর কনকদিয়া গ্রামের কাড়াল বাড়িতে এসে পৌঁছায়। এর আগে গত সোমবার সকালে দাফন করা হয়েছিল গৃহকর্তা কালাম মিয়া (৪৫)-এর লাশ। নতুন বাড়ির পুকুরপাড়ে কালাম মিয়ার কবরের ঠিক পাশেই বাকি চারজনের লাশ দাফন করা হয়েছে। এর আগে, গত রোববার (১০ মে) নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় গ্যাস লিকেজ থেকে বিস্ফোরণে দগ্ধ হয়ে একে একে না-ফেরার দেশে চলে গেছেন স্বামী, স্ত্রী ও তাঁদের তিন সন্তান। শনিবার সকালে পটুয়াখালীর বাউফলে পাশাপাশি পাঁচটি কবরে চিরনিদ্রায় শায়িত হয়েছে এই পরিবারের সকল সদস্য।  

জানা গেছে, কালাম মিয়া দীর্ঘদিন ধরে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার সাইনবোর্ড এলাকায় কাঁচামালের ব্যবসা করতেন। স্ত্রী ও তিন সন্তানকে নিয়ে ভুইগড় এলাকার একটি ১০ তলা ভবনের নিচতলায় দুটি রুম ভাড়া নিয়ে থাকতেন তিনি। গত রোববার  সকাল ৬টার দিকে কালাম মিয়া রান্নাঘরে গ্যাসের চুলায় তরকারি গরম করতে যান। তখন স্ত্রী ও সন্তানরা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ছিল। ঘরটিতে আগে থেকেই জমে থাকা লিকেজ গ্যাস দেশলাইয়ের সংস্পর্শে আসতেই বিকট শব্দে বিস্ফোরিত হয়। মুহূর্তের মধ্যে আগুন ছড়িয়ে পড়ে পুরো ঘরে। জ্বলন্ত আগুনের মাঝেও বাবা কালাম দরজা খুলে দগ্ধ ছেলে মুন্নাকে বাইরে বের করে দেন, কিন্তু মুহূর্তেই আগুনের লেলিহান শিখা পুরো পরিবারকে গ্রাস করে।  পরে স্থানীয় বাসিন্দা ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা তাদের উদ্ধার করে দ্রুত ঢাকা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ভর্তি করেন। 

আরও পড়ুনঃ  যুদ্ধের মধ্যেই জ্বালানি নিয়ে বড় সুখবর দিল ইরান

স্বজনদের অভিযোগ, বাসার গ্যাসের পাইপ লিকেজ হওয়ার বিষয়টি কালাম মিয়া আগের দিনই ভবনের দারোয়ানকে জানিয়েছিলেন। কিন্তু দারোয়ান অলসতা করে বাড়ির মালিককে তা জানাননি। 

মৃত্যুর এই নির্মম মিছিলে প্রথমে বিদায় নেয় পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি আবুল কালাম মিয়া। দুর্ঘটনার দিন রোববারই চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। স্বজনরা রাতেই তার মরদেহ নিয়ে আসেন কনকদিয়া ইউনিয়নের উত্তর কনকদিয়া গ্রামের বাড়িতে এবং সোমবার সকাল ১০টায় তার জানাজা শেষে দাফন করা হয়। 

এরপর গত বুধবার বিকেলে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে ৭ বছরের শিশু কথা মনি। মায়ের কোল খালি করে চলে যাওয়া কথার লাশ রাখা হয় জাতীয় বার্ন ইউনিট হাসপাতালের হিমাগারে, কারণ বাকিদের অবস্থাও ছিল আশঙ্কাজনক। বুধবার রাত ১১টায় বোনকে হারানোর কয়েক ঘণ্টার মাথায় মারা যায় একমাত্র ছেলে মুন্না (১২)। বৃহস্পতিবার না-ফেরার দেশে চলে যায় মেঝ মেয়ে মুন্নী (৯)। শেষে গতকাল শুক্রবার সকাল ৮টায় শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন মা সালমা বেগম (৪০)।

কালাম মিয়ার বোন রাসেদা বেগম বিলাপ করে বলেন, ‘ভাই বলছিল, এবার ঈদে বাড়ি আইসা ঘরের কাজ শেষ করমু। ভাই আমার বাড়ি ফিরল, কিন্তু লাশ হয়ে!’ 

কালাম মিয়ার চাচাতো ভাই সোহাগ বলেন, ‘প্রায় ২০-২২ বছর আগে কালাম বাড়ি ছেড়ে ঢাকায় গিয়ে উজিরপুরে বিয়ে করেছিল। কত কষ্ট করে ফতুল্লার ব্যবসাটা দাঁড় করাল। মাত্র ২০-২৫ দিন আগেও ঢাকায় ওর সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল। ভাবতেই পারছি না, ভাই-ভাবি আর বাচ্চারা এভাবে আমাদের ছেড়ে একেবারে চলে যাবে!’  

নিহতদের জানাজার নামাজে বাউফলের সংসদ সদস্য ও জামায়াতে ইসলামীর ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সেক্রেটারি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদসহ শত শত মুসল্লি উপস্থিত ছিলেন। তাঁর ব্যক্তিগত পক্ষ থেকে নিহতদের লাশ পরিবহন ও দাফন সম্পন্ন করার যাবতীয় ব্যবস্থা করা হয়। বাউফল উপজেলা নির্বাহী অফিসার সালেহ আহম্মেদও এই ঘটনাকে অত্যন্ত মর্মাহত ও হৃদয়বিদারক বলে সমবেদনা জানিয়েছেন।