নৌকায় করে চা বিক্রি করেন বাবা। সংসারে অভাব নিত্যসঙ্গী। কিন্তু সেই অভাব কখনোই মেয়ের স্বপ্নের পথে দেয়াল হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। মেধা, পরিশ্রম আর অদম্য ইচ্ছাশক্তিকে সঙ্গী করে এবার উচ্চশিক্ষার জন্য প্রায় ৭৫ লাখ টাকা মূল্যের স্কলারশিপ অর্জন করেছেন সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার মেরিন জামান রুহি।
চট্টগ্রামের এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেন (AUW) থেকে ৬০ হাজার মার্কিন ডলারের স্কলারশিপ পেয়েছেন রুহি। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার মূল্য প্রায় ৭৫ লাখ টাকা। এই স্কলারশিপের আওতায় আগামী চার বছর বিশ্ববিদ্যালয়টিতে স্নাতক পর্যায়ে পড়াশোনার সুযোগ পাবেন তিনি।
রুহির এই অর্জনে আনন্দিত তাঁর পরিবার। একই সঙ্গে গর্বিত স্বজন ও এলাকাবাসী। কারণ, যে পরিবারের জীবিকার অন্যতম অবলম্বন নৌকায় চা বিক্রি, সেই পরিবারের মেয়েই এখন পা রাখতে যাচ্ছেন উচ্চশিক্ষার নতুন দিগন্তে।
নৌকায় চা বিক্রি করেন বাবা
রুহির বাড়ি সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার ইসলামপুর ইউনিয়নের গনেশপুর গ্রামে। তাঁর বাবা আব্দুল কাদির পেশায় চা বিক্রেতা। নৌকা নিয়ে বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে চা বিক্রি করেই পরিবারের খরচ চালান তিনি।
সীমিত আয় দিয়ে সংসার চালানোর পাশাপাশি সন্তানদের পড়াশোনা করানো ছিল তাঁর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে রুহির উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন পূরণে অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা ছিল বড় বাধা।
তবে সেই বাধার কাছে হার মানেননি রুহি। পড়াশোনার প্রতি মনোযোগ, কঠোর পরিশ্রম ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করেছেন তিনি। শেষ পর্যন্ত সেই মেধা ও পরিশ্রমের স্বীকৃতি হিসেবেই এসেছে বড় অঙ্কের এই স্কলারশিপ।
অভাব থামাতে পারেনি স্বপ্ন
ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনা করে জীবনে বড় কিছু করার স্বপ্ন দেখতেন রুহি। পরিবারের আর্থিক সংকট সেই স্বপ্ন পূরণের পথে কঠিন চ্যালেঞ্জ তৈরি করলেও তিনি থেমে যাননি।
বরং প্রতিকূলতাকে শক্তিতে পরিণত করে এগিয়ে গেছেন নিজের লক্ষ্যের দিকে। তাঁর অর্জিত এই স্কলারশিপ শুধু উচ্চশিক্ষার সুযোগই তৈরি করেনি, পরিবারের দীর্ঘদিনের আর্থিক দুশ্চিন্তাও অনেকটা কমিয়েছে।
রুহির জন্য এই স্কলারশিপ তাই শুধু একটি শিক্ষাবৃত্তি নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পরিবারের দীর্ঘদিনের সংগ্রাম, বাবার পরিশ্রম এবং তাঁর নিজের অদম্য চেষ্টা।
রুহির সাফল্যে গর্বিত ছাতক
রুহির সাফল্যের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর গনেশপুরসহ আশপাশের এলাকায় আনন্দের সৃষ্টি হয়েছে। স্বজন, প্রতিবেশী ও স্থানীয়রা তাঁর এই অর্জনকে নিজেদের গর্বের বিষয় হিসেবে দেখছেন।
পরিবারের সদস্যরা জানান, রুহির সাফল্যে তাঁরা অত্যন্ত আনন্দিত ও গর্বিত। উচ্চশিক্ষার পরবর্তী পথচলায় তাঁকে সব ধরনের সহযোগিতা করার পাশাপাশি তাঁর স্বপ্ন পূরণের জন্য দোয়া করবেন তাঁরা।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, রুহির এই অর্জন এলাকার অন্য শিক্ষার্থীদেরও অনুপ্রাণিত করবে। বিশেষ করে আর্থিক সংকটে থাকা শিক্ষার্থীরা তাঁর গল্প থেকে সাহস পাবে। তারা বুঝতে পারবে, সুযোগের অভাব থাকলেও মেধা ও পরিশ্রম থাকলে বড় স্বপ্ন পূরণের পথ তৈরি করা সম্ভব।
চায়ের নৌকা থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পথে
রুহির গল্প শুধু একটি স্কলারশিপ পাওয়ার গল্প নয়। এটি একজন সংগ্রামী বাবার স্বপ্ন এবং একজন মেধাবী মেয়ের এগিয়ে যাওয়ার গল্প।
যে বাবা প্রতিদিন নৌকায় চা বিক্রি করে পরিবারের জীবিকা নির্বাহ করেন, সেই বাবার মেয়েই আজ ৭৫ লাখ টাকার স্কলারশিপ নিয়ে উচ্চশিক্ষার পথে এগিয়ে যাচ্ছেন। তাঁর এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে পরিবারের ত্যাগ, বাবার পরিশ্রম এবং নিজের প্রতি বিশ্বাস।
আগামী চার বছর AUW-তে পড়াশোনা করে নিজের স্বপ্ন পূরণের পথে এগিয়ে যেতে চান রুহি। তাঁর এই অর্জন ইতোমধ্যে প্রমাণ করেছে—অভাব কখনো স্বপ্নকে থামিয়ে দিতে পারে না; মেধা, সাহস আর নিরলস পরিশ্রম থাকলে সাফল্যের দরজা একদিন খুলবেই।
সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি 



















