
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরে না যাওয়ার ঘোষণার পরই বিদ্যুৎ নিয়ে তালবাহনা শুরু করেছে ভারতের আদানি। একদিনের মধ্যেই আদানি কারিগরি ত্রুটি দেখিয়ে কৌশলে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সুরবরাহ বন্ধ করে দেয়। যার ফলে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সংকট আরো ঘণীভূত হয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার (১০ তারিখ) পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ূন কবীর ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যাচ্ছেন না ভারতে। ঘোষণার পরদিনই আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বাংলাদেশে বিদুৎ সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হয়।
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে কয়েক সপ্তাহ ধরে ঢাকা-দিল্লির মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ চলছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের আউটরিচ পর্বেও তিনি যাচ্ছেন না। ঢাকার পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ব্রিকস সম্মেলনে আমন্ত্রণটি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নয়, বিমসটেকের বর্তমান চেয়ার হিসেবে। একই সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় ভারত সফরের জন্য ‘অনুকূল পরিবেশ’ প্রয়োজন বলেও বারবার জানিয়েছে বাংলাদেশ।
এর মধ্যেই দেশে নতুন করে তীব্র হয়েছে বিদ্যুৎ সংকট। ভারতের ঝাড়খণ্ডের গোড্ডায় আদানি পাওয়ারের ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াটের বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ৮০০ মেগাওয়াট ইউনিট কারিগরি ত্রুটিতে বন্ধ হয়ে গেছে। এর ফলে কেন্দ্রটির উৎপাদন নেমে এসেছে ৭৫০ মেগাওয়াটের নিচে। একই সময়ে দেশে সর্বোচ্চ লোডশেডিং ৩ হাজার ৫৫৭ মেগাওয়াটে পৌঁছানোর তথ্য এসেছে।ঘটনাগুলোর সময়ের এই মিলই এখন নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে—এটি কি নিছক কারিগরি ও জ্বালানি সংকটের ধারাবাহিকতা, নাকি ঢাকা-দিল্লির রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যে বিদ্যুৎ সরবরাহও চাপ তৈরির একটি হাতিয়ার হয়ে উঠছে?
আদানির বিদ্যুৎ কমল কেন, সংকট কি শুধু কারিগরি?
বাংলাদেশের বিদ্যুৎব্যবস্থা এমনিতেই চাপের মধ্যে ছিল। গ্যাস, কয়লা ও তরল জ্বালানির সংকটে দেশের বেশ কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছিল না। এর মধ্যেই আদানি পাওয়ারের গোড্ডা বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জাতীয় গ্রিডে চাপ আরও বেড়েছে।
সেপ্টেম্বরের শুরুতেই আদানি পাওয়ার জানিয়েছিল, ভারতের রেলপথে অতিরিক্ত চাপ ও কয়লা পরিবহনে নানা বিধিনিষেধের কারণে গোড্ডা কেন্দ্রের জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহে সমস্যা হচ্ছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে দিনের কম চাহিদার সময়ে উৎপাদন কমিয়ে সন্ধ্যার ব্যস্ত সময়ে সরবরাহ ধরে রাখার চেষ্টা করা হচ্ছিল।
১১ সেপ্টেম্বরের তথ্য অনুযায়ী, আগের রাতে কেন্দ্রটি ১ হাজার ৪০০ মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করলেও একটি ইউনিট বন্ধ হওয়ার পর উৎপাদন নেমে যায় ৭৫০ মেগাওয়াটের নিচে।
কেন্দ্র-সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য, বয়লারের একটি সমস্যার কারণে ইউনিটটি বন্ধ করতে হয়েছে। সেটি পুনরায় চালুর আগে ঠান্ডা করতে প্রায় ৪৮ ঘণ্টা প্রয়োজন হতে পারে।
অর্থাৎ আদানি পাওয়ারের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, বিদ্যুৎ সরবরাহ কমে যাওয়ার পেছনে প্রথমে ছিল কয়লা সরবরাহের সমস্যা এবং পরে দেখা দেয় কারিগরি ত্রুটি।
কিন্তু এখানেই উঠছে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
২০১৭ সালের চুক্তি, দীর্ঘমেয়াদি দায়
আদানির গোড্ডা বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ কেনার চুক্তি হয় ২০১৭ সালে। কেন্দ্রটির মোট উৎপাদন ক্ষমতা ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট। দুটি ইউনিটের প্রতিটির সক্ষমতা ৮০০ মেগাওয়াট।
দীর্ঘমেয়াদি এই চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ এখনো বিদ্যুৎ কিনছে। ফলে বর্তমান পরিস্থিতিতে চুক্তির শর্ত এবং সরবরাহকারীর দায় নিয়ে আলোচনা নতুন করে সামনে এসেছে।
একটি বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তিতে জ্বালানি সংগ্রহ, কেন্দ্রের উৎপাদন সক্ষমতা বজায় রাখা এবং নির্ধারিত পরিমাণ বিদ্যুৎ সরবরাহের বিষয়ে সরবরাহকারীর কী দায়িত্ব রয়েছে, সেটি নির্ভর করে চুক্তির নির্দিষ্ট ধারার ওপর।
বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ মনে করেন, চুক্তিতে সরবরাহ ব্যাহত হওয়া, বিরোধ সৃষ্টি হওয়া কিংবা চুক্তিগত ব্যর্থতার মতো পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য নির্দিষ্ট ব্যবস্থা থাকার কথা। তবে আদানি চুক্তির ক্ষেত্রে সেসব শর্ত কী এবং বর্তমানে সেগুলো কীভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে, তা নথিপত্র দেখে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
ফলে প্রশ্নটি শুধু ‘বিদ্যুৎ কমল কেন’—এখানেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং প্রশ্ন হলো, সরবরাহে সমস্যা দেখা দিলে বাংলাদেশকে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য চুক্তিতে কী ব্যবস্থা রাখা হয়েছে?
কয়লার সংকটের পর ইউনিট বন্ধ
২ সেপ্টেম্বর আদানি পাওয়ার জানিয়েছিল, ভারতের রেল নেটওয়ার্কে অতিরিক্ত চাপ, বিভিন্ন এলাকায় কয়লা লোডিংয়ের সীমাবদ্ধতা এবং পরিবহন বিঘ্নের কারণে গোড্ডা কেন্দ্রে কয়লা পৌঁছাতে সমস্যা হচ্ছে।
কোম্পানির পক্ষ থেকে আরও বলা হয়েছিল, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডকে বিষয়টি জানানো হয়েছে এবং কয়লা পরিবহন স্বাভাবিক করতে ভারতীয় রেলের সঙ্গে কাজ করা হচ্ছে।
এর কয়েক দিন পর পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ার সময়ই কেন্দ্রটির একটি ইউনিটে নতুন সমস্যা দেখা দেয়। বয়লার-সংক্রান্ত ত্রুটির কারণে ইউনিটটি বন্ধ করতে হয়।
পিডিবির এক সদস্যের ভাষ্য অনুযায়ী, একটি ফিড ইউনিটে সমস্যার কারণে অতিরিক্ত উত্তাপ তৈরি হয়। নিরাপত্তার স্বার্থে ইউনিটটি বন্ধ করা হয় এবং মেরামতের আগে সেটিকে ঠান্ডা করার প্রয়োজন পড়ে। পুরোপুরি উৎপাদনে ফিরতে কয়েক দিন সময় লাগতে পারে।
কারিগরি ত্রুটি যে কোনো বিদ্যুৎকেন্দ্রেই হতে পারে। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এ ধরনের পরিস্থিতিতে বিকল্প সরবরাহ কতটা দ্রুত নিশ্চিত করা যায় এবং গ্রাহক দেশের ওপর এর প্রভাব কীভাবে কমানো যায়।
রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহও কি প্রশ্ন তুলছে?
আদানি কেন্দ্রের উৎপাদন কমে যাওয়ার সময়ের সঙ্গে ঢাকা-দিল্লির রাজনৈতিক সম্পর্কের কিছু ঘটনাও কাছাকাছি সময়ে ঘটেছে।
আগস্টে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে আলোচনা চলছিল। সফর আয়োজনের ক্ষেত্রে অনুকূল পরিবেশের প্রয়োজনীয়তার কথাও বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল।
সেপ্টেম্বরের শুরু পর্যন্ত সফর নিয়ে আলোচনা অব্যাহত থাকলেও ৫ সেপ্টেম্বর পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির জানান, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের আগে সফরের সম্ভাবনা নেই এবং তখনও তারিখ চূড়ান্ত হয়নি।
এরপর ১০ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জানানো হয়, তারেক রহমান ব্রিকস সম্মেলনে অংশ নিচ্ছেন না। আমন্ত্রণটি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নয়, বিমসটেকের চেয়ার হিসেবে দেওয়া হয়েছিল এবং ঢাকার অবস্থান ছিল—তার প্রথম ভারত সফরকে পৃথক দ্বিপক্ষীয় সফর হিসেবে আয়োজন করা উচিত।
এর পরদিনই গোড্ডা কেন্দ্রের একটি ইউনিট বন্ধ হওয়ার খবর সামনে আসে।
সময়ের এই কাছাকাছি অবস্থান স্বাভাবিকভাবেই নানা প্রশ্ন তৈরি করতে পারে। তবে সময়ের মিল থাকলেই একটি ঘটনার সঙ্গে আরেকটির সরাসরি সম্পর্ক প্রমাণিত হয় না।
এখন পর্যন্ত প্রকাশ্য তথ্যের ভিত্তিতে এমন কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই যে তারেক রহমানের ভারত সফর না করার সিদ্ধান্তের কারণে ভারত সরকার বা আদানি পাওয়ার ইচ্ছাকৃতভাবে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ সরবরাহ কমিয়েছে।
ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের নতুন বাস্তবতা
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ককে শুধু বন্ধুত্ব বা বিরোধিতার সরল কাঠামোয় দেখার সুযোগ নেই। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য, নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা এবং জনগণের পারস্পরিক যোগাযোগের মতো গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে।
তবে একই সঙ্গে বাংলাদেশ তার নিজস্ব সার্বভৌম ও আইনগত অবস্থান আরও স্পষ্টভাবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে। ফলে দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন বাস্তবতা তৈরি হচ্ছে।
দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতি নিয়েও বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করেন, দুই দেশের শীর্ষ পর্যায়ের সফর শুধু আনুষ্ঠানিকতার বিষয় হওয়া উচিত নয়; সেখানে স্পষ্ট স্বার্থ, আলোচ্যসূচি এবং পারস্পরিক সমঝোতার বিষয় থাকা প্রয়োজন।
এই বাস্তবতায় বিদ্যুৎ আমদানির মতো কৌশলগত খাত কতটা নিরাপদ এবং কোনো একটি উৎসের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা বাংলাদেশের জন্য কতটা ঝুঁকিপূর্ণ—সেটিও আলোচনায় আসছে।
বিদ্যুৎ সরবরাহ কি রাজনৈতিক চাপের মাধ্যম হতে পারে?
এই প্রশ্নের উত্তর এখনই দেওয়া সম্ভব নয়।
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাত ইতোমধ্যেই আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর উল্লেখযোগ্যভাবে নির্ভরশীল। গ্যাসের সংকটের কারণে অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারে না। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে কয়লা ও তরল জ্বালানি সরবরাহের নানা সমস্যা।
ফলে একটি বড় আন্তঃদেশীয় বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদন কমে গেলে জাতীয় গ্রিডে তার প্রভাব পড়া স্বাভাবিক।
বিশেষজ্ঞদের দীর্ঘদিনের একটি উদ্বেগ হলো—একটি নির্দিষ্ট বিদেশি উৎসের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা জ্বালানি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
আদানি চুক্তি নিয়েও অতীতে বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ প্রশ্ন তুলেছেন। কেউ চুক্তির শর্ত পুনর্মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন, আবার কেউ এটিকে বাংলাদেশের স্বার্থের দিক থেকে অসম চুক্তি হিসেবে সমালোচনা করেছেন।
তবে এসব সমালোচনার পাশাপাশি চুক্তির প্রকৃত শর্ত, অর্থনৈতিক হিসাব এবং উভয় পক্ষের আইনগত দায়ও জনসমক্ষে পরিষ্কার হওয়া জরুরি।
বড় প্রশ্ন বিকল্প ব্যবস্থা নিয়ে
একটি ইউনিট বন্ধ হওয়া অস্বাভাবিক ঘটনা নয়। কিন্তু সেই একটি ইউনিটের উৎপাদন কমে যাওয়ার কারণে যদি জাতীয় পর্যায়ে বড় ধরনের বিদ্যুৎ ঘাটতি তৈরি হয়, তাহলে বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনার বিকল্প পরিকল্পনা নিয়েও প্রশ্ন উঠবে।
কারণ বর্তমান সংকট শুধু আদানি কেন্দ্রের কারণে তৈরি হয়নি। কেন্দ্রটি বন্ধ হওয়ার আগেই দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন জ্বালানি সংকটের কারণে চাপে ছিল।
১১ সেপ্টেম্বরের বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন ১৩ থেকে ১৪ হাজার মেগাওয়াটের মধ্যে থাকার কথা বলা হয়, বিপরীতে চাহিদা ছিল ১৬ হাজার মেগাওয়াটের বেশি।
অর্থাৎ আদানি কেন্দ্রের উৎপাদন কমে যাওয়া আগে থেকেই থাকা সংকটকে আরও তীব্র করেছে।
যেসব প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন
বর্তমান পরিস্থিতিতে আদানি পাওয়ার, পিডিবি এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে কয়েকটি বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য পাওয়া এর পরপরই আদানি কেন্দ্রের একটি ইউনিট বন্ধ হওয়া—দুটি ঘটনা সময়ের হিসেবে কাছাকাছি। কিন্তু শুধু এই সময়গত মিল থেকে রাজনৈতিক যোগসূত্রেরের উচিত উৎপাদন বন্ধের কারণ, মেরামতের অগ্রগতি এবং সরবরাহ স্বাভাবিক তাহলে বিষয়টি কেবল বিদ্যুৎ খাতের সমস্যা থাকবে না; এটি বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ওের প্রধানমন্ত্রী ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক কীভাবে পরিচালনা করবেন, সেটি বাংলাদেশের নিজস্ব সিদ্ধান্ত। একইভাবে দুই দেশের মধ্যে বিদ্যুৎ বাণিজ্যও হওয়া উচিত স্বচ্ছ চুক্তি, নির্ধারিত দায়বদ্ধতা এবং পারস্পাহত হলে বাংলাদেশের জনগণের জানার অধিকার রয়েছে—কেন সরবরাহ কমেছে, কতমান পরিস্থিতি তাই একটি বড় শিক্ষা সামনে আনে: কোনো একটি উৎসের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও কারিগরি ঘটনা। কিন্তু সেটি যদি জাতীয় বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় বড় ধরনের চাপ তৈরি করে, সঙ্গে রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের সময়গত মিল থাকলে প্রশ্ন উঠতেই পারে। গুরুত্বপূর্ণ—
- গোড্ডা কেন্দ্রের ইউনিটে ঠিক কী ধরনের কারিগরি সমস্যা দেখা দিয়েছে?
- সমস্যাটি শনাক্ত হওয়ার পর মেরামতের কাজ কখন শুরু হয়েছে?
- অন্য ইউনিটটি সর্বোচ্চ সক্ষমতায় চালানো সম্ভব হচ্ছে কি না?
- কয়লা সরবরাহে সমস্যা কতদিন ধরে চলেছে এবং এর কারণ কী?
- বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হলে চুক্তি অনুযায়ী আদানি পাওয়ারের দায় কী?
- সরবরাহ কমে যাওয়ার কারণে বাংলাদেশ কোনো ক্ষতিপূরণ বা চুক্তিগত সুবিধা পাবে কি না?
- সংকট মোকাবিলায় আদানি পাওয়ার কোনো বিকল্প ব্যবস্থা প্রস্তাব করেছে কি না?
- ভারতীয় রেল বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কয়লা পরিবহন স্বাভাবিক করতে কী পদক্ষেপ নিয়েছে?
- সর্বশেষ রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে বিদ্যুৎ সরবরাহ কমে যাওয়ার কোনো বাস্তব সম্পর্ক আছে কি না?
শেষ প্রশ্নটির ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—সন্দেহকে প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন না করা।
তারেক রহমানের ভারত সফর না করার ঘটনা এবং এর পরপরই আদানি কেন্দ্রের একটি ইউনিট বন্ধ হওয়া—দুটি ঘটনা সময়ের হিসেবে কাছাকাছি। কিন্তু শুধু এই সময়গত মিল থেকে রাজনৈতিক যোগসূত্রের সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।
যদি এটি নিছক কারিগরি সমস্যা হয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত উৎপাদন বন্ধের কারণ, মেরামতের অগ্রগতি এবং সরবরাহ স্বাভাবিক করার পরিকল্পনা পরিষ্কারভাবে জানানো।
আর যদি কোনো ধরনের রাজনৈতিক বা বাণিজ্যিক প্রভাবের প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে বিষয়টি কেবল বিদ্যুৎ খাতের সমস্যা থাকবে না; এটি বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও জাতীয় স্বার্থের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নে পরিণত হবে।
বিদ্যুৎ হওয়া উচিত নির্ভরযোগ্য সেবা, রাজনৈতিক হাতিয়ার নয়
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক কীভাবে পরিচালনা করবেন, সেটি বাংলাদেশের নিজস্ব সিদ্ধান্ত। একইভাবে দুই দেশের মধ্যে বিদ্যুৎ বাণিজ্যও হওয়া উচিত স্বচ্ছ চুক্তি, নির্ধারিত দায়বদ্ধতা এবং পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে।
বাংলাদেশ যে বিদ্যুৎ কিনছে, তার জন্য অর্থ পরিশোধ করছে। তাই এটি কোনো দয়া বা অনুদান নয়—এটি একটি বাণিজ্যিক সম্পর্ক।
ফলে সরবরাহ ব্যাহত হলে বাংলাদেশের জনগণের জানার অধিকার রয়েছে—কেন সরবরাহ কমেছে, কতদিনের মধ্যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে এবং চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশের অধিকার কী।
বর্তমান পরিস্থিতি তাই একটি বড় শিক্ষা সামনে আনে: কোনো একটি উৎসের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও আমদানির ক্ষেত্রে শক্তিশালী বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।
আদানি কেন্দ্রের একটি ইউনিট বন্ধ হওয়া হয়তো একটি কারিগরি ঘটনা। কিন্তু সেটি যদি জাতীয় বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় বড় ধরনের চাপ তৈরি করে, তাহলে সমস্যাটি শুধু ওই বিদ্যুৎকেন্দ্রে সীমাবদ্ধ থাকে না।
নিজস্ব প্রতিবেদক 


















