
আজ ৬ সেপ্টেম্বর। ঠিক ৩০ বছর আগে এই দিনেই বাংলাদেশের চলচ্চিত্র হারিয়েছিল তারুণ্যের সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্রদের একজনকে। মাত্র ২৫ বছর বয়সে চলে গিয়েছিলেন সালমান শাহ—যাঁর আসল নাম শহীদ চৌধুরী মোহাম্মদ শাহরিয়ার ইমন।
১৯৭১ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর সিলেটের জকিগঞ্জে জন্ম তাঁর। বাবা কমর উদ্দিন চৌধুরী, মা নীলা চৌধুরী। পরিবারের বড় ছেলে সালমান খুব অল্প সময়েই চলচ্চিত্রে এমন জনপ্রিয়তা অর্জন করেন, যা আজও বিস্ময় জাগায়।
কিন্তু ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর হঠাৎ থেমে যায় তাঁর জীবন।
শেষ সকালটি কেমন ছিল?
সালমান তখন স্ত্রী সামিরাকে নিয়ে নিউ ইস্কাটনের ইস্কাটন প্লাজার একটি ফ্ল্যাটে থাকতেন। মৃত্যুর দিন সকালে তাঁর বাবা ছেলের সঙ্গে দেখা করতে বাসায় যান। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও তিনি সরাসরি ছেলের সঙ্গে দেখা করতে পারেননি।
এরপর বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আসে সেই ভয়াবহ খবর। সালমানকে দেখতে দ্রুত বাসায় যেতে বলা হয় তাঁর মা নীলা চৌধুরীকে।
বাসায় গিয়ে তিনি ছেলেকে শারীরিকভাবে অচেতন অবস্থায় দেখতে পান। পরে তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকেরা মৃত ঘোষণা করেন।
ময়নাতদন্তের পর তাঁর মৃত্যুকে আত্মহত্যা হিসেবে উল্লেখ করা হয়। কিন্তু সালমানের পরিবার শুরু থেকেই এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত ছিল না। তাঁদের দাবি ছিল, এটি আত্মহত্যা নয়; সালমানকে হত্যা করা হয়েছে।
মৃত্যুর আগের দিন কী হয়েছিল?
মৃত্যুর আগের দিন, ৫ সেপ্টেম্বর, ‘প্রেমপিয়াসী’ সিনেমার ডাবিং করতে এফডিসিতে গিয়েছিলেন সালমান শাহ। সেখানে তাঁর সহশিল্পী শাবনূরও উপস্থিত ছিলেন।
বিভিন্ন সময় প্রকাশিত সাক্ষাৎকার ও লেখায় উঠে এসেছে, ডাবিংয়ের সময় সালমান ও শাবনূরের বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ নিয়ে তাঁর স্ত্রী সামিরার সঙ্গে মনোমালিন্য হয়েছিল বলে দাবি করা হয়।
পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন পরিচালক বাদল খন্দকার। শেষ পর্যন্ত সেদিন ডাবিং আর হয়নি। রাতের দিকে বাদল খন্দকার সালমানকে ইস্কাটনের বাসায় পৌঁছে দেন।
এর পরের রাতের ঘটনাগুলো নিয়ে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন বক্তব্য সামনে এসেছে। তবে প্রত্যেকটি বক্তব্য স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
৩০ বছরেও প্রশ্নের শেষ নেই
সালমান শাহর মৃত্যু নিয়ে তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়া দীর্ঘ সময় ধরে চলেছে। আত্মহত্যা নাকি হত্যাকাণ্ড—এই প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর নিয়ে তাঁর ভক্তদের কৌতূহল আজও শেষ হয়নি।
তাঁর পরিবার বহু বছর ধরে হত্যার অভিযোগ করে এসেছে। অন্যদিকে তদন্তের বিভিন্ন পর্যায়ে আত্মহত্যার সিদ্ধান্তও সামনে এসেছে।
এই দুই বিপরীত দাবির মাঝেই কেটে গেছে তিন দশক।
নায়ক চলে গেছেন, কিন্তু সালমান শাহ থেকে গেছেন
সালমান শাহর অভিনয়জীবন ছিল খুব ছোট। কিন্তু সেই ছোট ক্যারিয়ারে তিনি উপহার দিয়েছেন একের পর এক জনপ্রিয় সিনেমা।
‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’, ‘তুমি আমার’, ‘অন্তরে অন্তরে’, ‘স্বপ্নের ঠিকানা’, ‘বিচার হবে’, ‘এই ঘর এই সংসার’, ‘স্বপ্নের পৃথিবী’, ‘সত্যের মৃত্যু নেই’, ‘জীবন সংসার’, ‘মায়ের অধিকার’, ‘চাওয়া থেকে পাওয়া’ ও ‘আনন্দ অশ্রু’—তাঁর সিনেমাগুলো আজও দর্শকের কাছে আলাদা আবেগের নাম।
সময় চলে যায়। প্রজন্ম বদলে যায়। নতুন নতুন নায়ক আসেন, নতুন গল্প আসে।
কিন্তু সালমান শাহ?
তিনি যেন থেমে আছেন সেই ২৫ বছর বয়সেই।
তাঁর সিনেমা এখনো দেখা হয়। তাঁর গান এখনো শোনা হয়। তাঁর স্টাইল এখনো অনুকরণ করা হয়। আর তাঁর অকালমৃত্যুর রহস্য নিয়ে প্রশ্নও এখনো ফিরে আসে।
৩০ বছর পরও সালমান শাহ শুধু একটি নাম নন—তিনি বাংলাদেশের চলচ্চিত্রপ্রেমীদের কাছে এক অসমাপ্ত অধ্যায়, এক গভীর আবেগ এবং হারিয়ে যাওয়া এক তারুণ্যের প্রতীক।
সালমান শাহ বেঁচে আছেন তাঁর অভিনয়ে, তাঁর সিনেমায় এবং কোটি মানুষের ভালোবাসায়।
চিরসবুজ নায়ক সালমান শাহ—আপনি আজও আমাদের হৃদয়ে অমলিন।
সিলেট প্রতিনিধি 



















