Dhaka ০৫:২৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ১৪ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

‘ভালোবাসা যত বড় হয়, জীবনটা তত নয়’, দেড় দশক ধরে স্ত্রীর কবর পরিষ্কার করছেন আইনজীবী

দিনাজপুরের বিরামপুরে স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন প্রবীণ আইনজীবী অ্যাডভোকেট মওলা বক্স। বয়স ৮৫ বছর হলেও প্রতিদিন সকালে ঝাঁটা হাতে ছুটে যান কবরস্থানে। সেখানে প্রয়াত স্ত্রী জাহানারা বেগম ঝর্ণার কবর পরিষ্কার করার পাশাপাশি পরিচ্ছন্ন রাখেন পুরো কবরস্থানের পথঘাট ও আশপাশের এলাকা। টানা ১৫ বছর ধরে নীরবে এই কাজ করে যাচ্ছেন তিনি।

শহরের প্রাণকেন্দ্র ঢাকা মোড়ে আধুনিক ভবন, বহুতল সুপার মার্কেট আর বিত্তবৈভবের হাতছানি থাকলেও সেসবের চেয়ে স্ত্রীর স্মৃতি আর কবরস্থানের পরিচর্যাতেই যেন প্রশান্তি খুঁজে পান এই প্রবীণ আইনজীবী। জীবনের শেষ প্রান্তে এসেও প্রিয় মানুষটির প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা ধরে রেখেছেন তিনি।

মওলা বক্সের জীবনের এই বিশেষ অধ্যায়ের সূচনা ১৯৭০ সালে। সে সময় সামাজিক নানা বাধা পেরিয়ে সনাতন ধর্মাবলম্বী এক তরুণীকে বিয়ে করেন তিনি। তার স্ত্রী জাহানারা বেগম ঝর্ণার সঙ্গে দীর্ঘ চার দশকের দাম্পত্য জীবনে গড়ে ওঠে ভালোবাসা, বিশ্বাস ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার সম্পর্ক। এই দম্পতির দুই ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছেন। তারা সবাই উচ্চশিক্ষিত এবং বাবার মতো আইন বিষয়ে পড়াশোনা করেছেন।

কিন্তু ২০১১ সালে স্ত্রী জাহানারা বেগম ঝর্ণার মৃত্যুতে তাদের দীর্ঘদিনের সংসারে ছেদ পড়ে। প্রিয় জীবনসঙ্গীকে হারিয়ে নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েন মওলা বক্স। তবে স্ত্রীর স্মৃতি ধরে রাখার এক ভিন্ন পথ বেছে নেন তিনি। শুরু করেন প্রতিদিন কবরস্থানে যাওয়া এবং নিজের হাতে স্ত্রীর কবর পরিচ্ছন্ন রাখার কাজ।

প্রতিদিন ফজরের নামাজ শেষে কবরস্থানে গিয়ে প্রথমে স্ত্রীর আত্মার মাগফিরাত কামনা করে দোয়া করেন তিনি। এরপর নিজ হাতে পরিষ্কার করেন কবরটি। শুকনো পাতা, গাছের ডালপালা ও আগাছা সরিয়ে পরিচ্ছন্ন রাখেন আশপাশের জায়গা। একসময় স্ত্রীর কবরের পরিচর্যা করতে গিয়ে পুরো কবরস্থানের চলাচলের পথ ও আশপাশের এলাকাও পরিষ্কার করতে শুরু করেন।

গত ১৫ বছরে ঝড়-বৃষ্টি কিংবা শীতের সকাল—কোনো কিছুই তার এই অভ্যাসে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি বলে জানা যায়। প্রতিদিনের এই নীরব সেবার মধ্যেই তিনি খুঁজে পান মানসিক প্রশান্তি এবং প্রিয় স্ত্রীর স্মৃতির সান্নিধ্য।

আরও পড়ুনঃ  ১৫ একর সরকারি জমিতে আধুনিক স্টেডিয়াম নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হবে : সিউক চেয়ারম্যান কয়েস লোদী

ব্যক্তিজীবনে অ্যাডভোকেট মওলা বক্স একজন প্রবীণ আইনজীবী হওয়ার পাশাপাশি বিরামপুর জেলা বাস্তবায়ন আন্দোলনের স্বপ্নদ্রষ্টা ও সভাপতি হিসেবে এলাকার উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডেও ভূমিকা রেখেছেন। তবে কবরস্থানে গেলে তার পরিচয় যেন বদলে যায়। সেখানে তিনি একজন দায়িত্বশীল মানুষ, যিনি প্রিয়জনের স্মৃতিকে আগলে রাখার পাশাপাশি অন্যদের জন্যও পরিচ্ছন্ন পরিবেশ নিশ্চিত করতে কাজ করে যাচ্ছেন।

স্ত্রীর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে মওলা বক্স বলেন, তার স্ত্রী নিজের পরিবার, ধর্মীয় পরিচয় ও পরিচিত পরিবেশ ছেড়ে তার ওপর বিশ্বাস রেখে সংসার শুরু করেছিলেন। স্ত্রীর সেই আত্মত্যাগ ও নিঃস্বার্থ ভালোবাসার ঋণ কখনো শোধ করা সম্ভব নয় বলে মনে করেন তিনি। সেই ভালোবাসার কথা স্মরণ করেই প্রতিদিন কবরস্থানে আসেন এবং নিজ হাতে পরিচ্ছন্নতার কাজ করেন।

ভালোবাসার গভীরতা বোঝাতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘ভালোবাসা যত বড় হয়, জীবনটা তত নয়।’

অ্যাডভোকেট মওলা বক্সের এই দৈনন্দিন কাজ কেবল প্রয়াত স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসার স্মারক নয়; একই সঙ্গে এটি দায়িত্ববোধ, শ্রদ্ধা ও মানবিকতারও এক অনন্য উদাহরণ। সময়ের সঙ্গে মানুষ হারিয়ে গেলেও তার প্রতি গভীর মমতা কীভাবে জীবনের প্রতিদিনের কাজে বেঁচে থাকতে পারে, তারই প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছেন এই প্রবীণ আইনজীবী।

Tag :
জনপ্রিয় পোস্ট

লাইনচ্যুত হওয়া ট্রেনের উদ্ধার কার্যক্রম চলছে, তদন্ত কমিটি গঠন

‘ভালোবাসা যত বড় হয়, জীবনটা তত নয়’, দেড় দশক ধরে স্ত্রীর কবর পরিষ্কার করছেন আইনজীবী

Update Time : ০৪:২৫:৪৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬

দিনাজপুরের বিরামপুরে স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন প্রবীণ আইনজীবী অ্যাডভোকেট মওলা বক্স। বয়স ৮৫ বছর হলেও প্রতিদিন সকালে ঝাঁটা হাতে ছুটে যান কবরস্থানে। সেখানে প্রয়াত স্ত্রী জাহানারা বেগম ঝর্ণার কবর পরিষ্কার করার পাশাপাশি পরিচ্ছন্ন রাখেন পুরো কবরস্থানের পথঘাট ও আশপাশের এলাকা। টানা ১৫ বছর ধরে নীরবে এই কাজ করে যাচ্ছেন তিনি।

শহরের প্রাণকেন্দ্র ঢাকা মোড়ে আধুনিক ভবন, বহুতল সুপার মার্কেট আর বিত্তবৈভবের হাতছানি থাকলেও সেসবের চেয়ে স্ত্রীর স্মৃতি আর কবরস্থানের পরিচর্যাতেই যেন প্রশান্তি খুঁজে পান এই প্রবীণ আইনজীবী। জীবনের শেষ প্রান্তে এসেও প্রিয় মানুষটির প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা ধরে রেখেছেন তিনি।

মওলা বক্সের জীবনের এই বিশেষ অধ্যায়ের সূচনা ১৯৭০ সালে। সে সময় সামাজিক নানা বাধা পেরিয়ে সনাতন ধর্মাবলম্বী এক তরুণীকে বিয়ে করেন তিনি। তার স্ত্রী জাহানারা বেগম ঝর্ণার সঙ্গে দীর্ঘ চার দশকের দাম্পত্য জীবনে গড়ে ওঠে ভালোবাসা, বিশ্বাস ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার সম্পর্ক। এই দম্পতির দুই ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছেন। তারা সবাই উচ্চশিক্ষিত এবং বাবার মতো আইন বিষয়ে পড়াশোনা করেছেন।

কিন্তু ২০১১ সালে স্ত্রী জাহানারা বেগম ঝর্ণার মৃত্যুতে তাদের দীর্ঘদিনের সংসারে ছেদ পড়ে। প্রিয় জীবনসঙ্গীকে হারিয়ে নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েন মওলা বক্স। তবে স্ত্রীর স্মৃতি ধরে রাখার এক ভিন্ন পথ বেছে নেন তিনি। শুরু করেন প্রতিদিন কবরস্থানে যাওয়া এবং নিজের হাতে স্ত্রীর কবর পরিচ্ছন্ন রাখার কাজ।

প্রতিদিন ফজরের নামাজ শেষে কবরস্থানে গিয়ে প্রথমে স্ত্রীর আত্মার মাগফিরাত কামনা করে দোয়া করেন তিনি। এরপর নিজ হাতে পরিষ্কার করেন কবরটি। শুকনো পাতা, গাছের ডালপালা ও আগাছা সরিয়ে পরিচ্ছন্ন রাখেন আশপাশের জায়গা। একসময় স্ত্রীর কবরের পরিচর্যা করতে গিয়ে পুরো কবরস্থানের চলাচলের পথ ও আশপাশের এলাকাও পরিষ্কার করতে শুরু করেন।

গত ১৫ বছরে ঝড়-বৃষ্টি কিংবা শীতের সকাল—কোনো কিছুই তার এই অভ্যাসে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি বলে জানা যায়। প্রতিদিনের এই নীরব সেবার মধ্যেই তিনি খুঁজে পান মানসিক প্রশান্তি এবং প্রিয় স্ত্রীর স্মৃতির সান্নিধ্য।

আরও পড়ুনঃ  সিলেটে সিএনজি অটোরিকশার সংঘর্ষে বৃদ্ধ নিহত, আহত ১

ব্যক্তিজীবনে অ্যাডভোকেট মওলা বক্স একজন প্রবীণ আইনজীবী হওয়ার পাশাপাশি বিরামপুর জেলা বাস্তবায়ন আন্দোলনের স্বপ্নদ্রষ্টা ও সভাপতি হিসেবে এলাকার উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডেও ভূমিকা রেখেছেন। তবে কবরস্থানে গেলে তার পরিচয় যেন বদলে যায়। সেখানে তিনি একজন দায়িত্বশীল মানুষ, যিনি প্রিয়জনের স্মৃতিকে আগলে রাখার পাশাপাশি অন্যদের জন্যও পরিচ্ছন্ন পরিবেশ নিশ্চিত করতে কাজ করে যাচ্ছেন।

স্ত্রীর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে মওলা বক্স বলেন, তার স্ত্রী নিজের পরিবার, ধর্মীয় পরিচয় ও পরিচিত পরিবেশ ছেড়ে তার ওপর বিশ্বাস রেখে সংসার শুরু করেছিলেন। স্ত্রীর সেই আত্মত্যাগ ও নিঃস্বার্থ ভালোবাসার ঋণ কখনো শোধ করা সম্ভব নয় বলে মনে করেন তিনি। সেই ভালোবাসার কথা স্মরণ করেই প্রতিদিন কবরস্থানে আসেন এবং নিজ হাতে পরিচ্ছন্নতার কাজ করেন।

ভালোবাসার গভীরতা বোঝাতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘ভালোবাসা যত বড় হয়, জীবনটা তত নয়।’

অ্যাডভোকেট মওলা বক্সের এই দৈনন্দিন কাজ কেবল প্রয়াত স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসার স্মারক নয়; একই সঙ্গে এটি দায়িত্ববোধ, শ্রদ্ধা ও মানবিকতারও এক অনন্য উদাহরণ। সময়ের সঙ্গে মানুষ হারিয়ে গেলেও তার প্রতি গভীর মমতা কীভাবে জীবনের প্রতিদিনের কাজে বেঁচে থাকতে পারে, তারই প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছেন এই প্রবীণ আইনজীবী।