Dhaka ০১:৫৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৮ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম :
‘মহিলাদের আমার ভাল্লাগে না’—প্রতি রাতে ১/২ জন ছাত্রকে হুজুরের রুমে নিতেন পত্রিকা অফিস থেকে সাংবাদিকের মরদেহ উদ্ধার সিলেটে পুলিশ কর্মকর্তা পরিচয়ে ব্ল্যাকমেল, এআই দিয়ে নারীর ছবি বিকৃত করে ছড়ানোর অভিযোগ সাগর-রুনি হত্যা: সাড়ে ১৩ বছর কারাগারে সিলেটের এনাম, মেলেনি সম্পৃক্ততার প্রমাণ সরকারি প্রতিষ্ঠানের পর ক্রীড়া সংস্থায় সাবেক ছাত্রদল নেতাদের জায়গা বাংলাদেশ ইনোভেশন ফেয়ার উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী সিকৃবি ভিসির অপসারণ দাবিতে আন্দোলন, ১৮ অভিযোগ তুলে লিফলেট জৈন্তাপুরে লরি থেকে এস্কেভেটর পড়ে চালকের মৃত্যু শনিবার বিদ্যুৎ থাকবে না সিলেটের অর্ধশতাধিক এলাকায় টিকা না নেওয়া শিশুরাই নতুন করে হামে আক্রান্ত হচ্ছে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী

হামে মৃত্যু ছাড়াল ৯৯০, টিকার বাইরে ৪০ লাখ পথশিশু

  • ডেস্ক নিউজ
  • Update Time : ০৭:০৫:২৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • ৫২৫ Time View

দেশে হাম পরিস্থিতির এখনও উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি। প্রাদুর্ভাব শুরুর প্রায় ছয় মাস পরও আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে। এখন পর্যন্ত হাম ও হামের মতো উপসর্গে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা ১ লাখ ৮৫ হাজারের বেশি। একই সময়ে হাম-সংশ্লিষ্ট নিশ্চিত ও সন্দেহভাজন মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় এক হাজারে পৌঁছেছে।

স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় হাম ও হামসদৃশ উপসর্গ নিয়ে আরও তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এতে দেশে হাম-সংশ্লিষ্ট মোট মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯৯৭ জনে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংক্রমণ এখন শুধু নির্দিষ্ট বয়সের শিশুদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বিভিন্ন বয়সের শিশুর মধ্যেই হাম ছড়িয়ে পড়ছে। ফলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রচলিত টিকাদান কার্যক্রমের পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে আরও কার্যকর পরিকল্পনা ও কমিউনিটি পর্যায়ে নজরদারি বাড়ানো জরুরি।

‘ইমিউনিটি গ্যাপ’ বড় কারণ

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, বিপুলসংখ্যক শিশু নিয়মিত টিকাদানের আওতার বাইরে থাকায় তাদের শরীরে হাম প্রতিরোধী পর্যাপ্ত রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়নি। এর ফলে সংক্রমণের বিস্তার ঠেকানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরীর মতে, শুধু টিকাদান কর্মসূচি পরিচালনা করলেই হবে না; নির্দিষ্টসংখ্যক শিশুকে কার্যকরভাবে টিকার আওতায় আনতে হবে। বিশেষ করে ঝুঁকিপূর্ণ ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের টিকা নিশ্চিত করা জরুরি।

তিনি বলেন, দেশে বিপুলসংখ্যক শিশু টিকাদানের বাইরে রয়েছে। এমনকি ছয় মাসের কম বয়সী শিশুর মধ্যেও হাম দেখা যাচ্ছে। মায়ের শরীরে পর্যাপ্ত রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা না থাকায় এসব শিশুও ঝুঁকিতে পড়ছে বলে মনে করেন তিনি।

এ ছাড়া পথশিশুদের বড় একটি অংশ নিয়মিত টিকাদানের আওতার বাইরে রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন এই জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ। তার মতে, শিশুদের বড় অংশকে টিকার আওতায় আনা না গেলে সংক্রমণ ও মৃত্যুহার কমানো কঠিন।

সব বয়সি শিশুর মধ্যেই সংক্রমণ

জাতীয় হাম ও রুবেলা নির্মূল যাচাই কমিটির চেয়ারম্যান ও মহামারি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে হাম কমার উল্লেখযোগ্য লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। ছয় থেকে নয় মাস বয়সি শিশু থেকে শুরু করে নয় মাস থেকে এক বছর এবং এক থেকে পাঁচ বছর বয়সি শিশুদের মধ্যেও সংক্রমণ রয়েছে।

আরও পড়ুনঃ  দালালকে ৩১ লাখ টাকা দিয়েও ফেরেনি ছেলে, লাশের অপেক্ষায় বৃদ্ধা মা

তার মতে, টিকাদানের যে কভারেজের কথা বলা হচ্ছে, সেটি মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্রের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। শুধু টিকা সরবরাহের পরিমাণ দিয়ে প্রকৃত টিকাদান কভারেজ নির্ধারণ করা যায় না; কতজন শিশু বাস্তবে টিকা পেয়েছে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।

অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান বলেন, শিশুদের টিকাকেন্দ্রে নিয়ে আসতে অভিভাবকদের মধ্যে ব্যাপক সচেতনতা তৈরি করতে হবে। একই সঙ্গে ছয় মাসের কম বয়সি কোনো শিশুর জ্বর হলে দ্রুত শনাক্ত করে তাকে অন্যদের থেকে আলাদা রাখার বিষয়েও গুরুত্ব দিতে হবে।

তিনি আরও বলেন, হামকে জাতীয় স্বাস্থ্য ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন।

হাসপাতাল নয়, কমিউনিটিকেন্দ্রিক ব্যবস্থা জরুরি

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মোহাম্মদ মুশতাক হোসেনের মতে, হাম নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ শুধু হাসপাতাল বা আইসিইউনির্ভর হলে চলবে না। রোগী শনাক্তকরণ, সংক্রমণ প্রতিরোধ এবং প্রয়োজনীয় আইসোলেশনের ব্যবস্থা করতে হবে কমিউনিটি পর্যায়েই।

তিনি বলেন, রোগী গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই যদি তাকে শনাক্ত করা যায় এবং যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া যায়, তাহলে সংক্রমণ ছড়ানোর ঝুঁকি কমানো সম্ভব। বিপরীতে রোগী যখন সংকটাপন্ন অবস্থায় আইসিইউতে পৌঁছান, তখন মৃত্যুঝুঁকি কমানোর সুযোগও সীমিত হয়ে যায়।

জরুরি পরিস্থিতিতে বাড়ি বাড়ি গিয়ে টিকা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির প্রচলিত মাইক্রোপ্ল্যানিং ব্যবস্থা আরও কার্যকর করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।

তার মতে, প্রতিটি এলাকায় শিশুর তালিকা তৈরি করে কার টিকা প্রয়োজন, কে টিকা পেয়েছে এবং কার টিকা বাকি রয়েছে—এসব তথ্য নিয়মিত হালনাগাদ করা দরকার। পাশাপাশি অভিভাবকদের আগে থেকেই নিকটবর্তী টিকাকেন্দ্রের তথ্য জানাতে হবে।

টিকাদান কর্মসূচি নিয়ে প্রশ্ন

মার্চের শুরুতে দেশে হামের প্রাদুর্ভাব বাড়তে শুরু করার পর এপ্রিলে ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সি শিশুদের জন্য বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু করে সরকার। ওই কর্মসূচিতে সারাদেশে প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ ১৫ হাজার শিশুকে টিকার আওতায় আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল।

আরও পড়ুনঃ  সিলেটে হামের উপসর্গে আরও এক শিশুর মৃত্যু, মোট প্রাণহানি ১৪৫

এরপর জুন মাসে একই বয়সসীমার শিশুদের ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ানোর কর্মসূচি পরিচালিত হয়। সেই কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া শিশুর সংখ্যা ছিল প্রায় ২ কোটি ২৬ লাখ।

দুই কর্মসূচির পরিসংখ্যানের মধ্যে পার্থক্য থাকায় হামের টিকাদান কর্মসূচি থেকে বিপুলসংখ্যক শিশু বাদ পড়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

তবে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, শুধু ভিটামিন ‘এ’ কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া শিশুর সংখ্যা দিয়ে হামের টিকাদানের বাইরে থাকা শিশুর সংখ্যা নির্ধারণ করা যাবে না। কারণ ভিটামিন ‘এ’ কর্মসূচিতে পাঁচ বছরের বেশি বয়সি শিশুও অংশ নিয়ে থাকতে পারে।

এ বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পেতে জরিপের প্রয়োজন রয়েছে বলে জানিয়েছেন সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়-সংশ্লিষ্ট বিশেষ সহকারী ড. এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার।

সরকারের বক্তব্য

তবে হাম পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে বলে দাবি করেছেন প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বিষয়ক বিশেষ সহকারী ড. এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার।

তার বক্তব্য অনুযায়ী, যেসব শিশুর শরীরে পর্যাপ্ত ইমিউনিটি তৈরি হয়নি এবং যারা রোগের একেবারে গুরুতর পর্যায়ে হাসপাতালে আসছে, তাদের ক্ষেত্রে মৃত্যুঝুঁকি বেশি থাকছে।

টিকার কার্যকারিতা নিয়েও কাজ করা হচ্ছে বলে জানান তিনি। টিকা নেওয়া শিশুদের শরীর থেকে নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করা হচ্ছে। এসব পরীক্ষার ফল পেতে কিছুটা সময় লাগবে বলেও জানান তিনি।

দেশের প্রতিটি উপজেলায় টিকার মজুত রাখা হয়েছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী মানুষ যাতে টিকা নিতে পারে, সে ব্যবস্থাও করা হয়েছে বলে জানান তিনি।

৯৫ শতাংশ টিকাদানের ওপর জোর

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) নির্দেশনা অনুযায়ী, হাম প্রতিরোধে একটি জনগোষ্ঠীর অন্তত ৯৫ শতাংশ শিশুকে দুই ডোজ টিকার আওতায় আনা জরুরি। এ মাত্রার টিকাদান নিশ্চিত করা গেলে কোনো এলাকায় কিছু শিশু টিকা না পেলেও সংক্রমণ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা কমে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে চলমান হামের বড় প্রাদুর্ভাবের পেছনে দীর্ঘদিনের টিকাদান ঘাটতি বা ‘ইমিউনিটি গ্যাপ’ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

আরও পড়ুনঃ  ‘ওরা আমাকে মেরে ফেলবে’, সিজারের আগে নারীর আর্তনাদ; অতঃপর

তাদের পরামর্শ, শুধু নির্দিষ্ট বয়সসীমার শিশুদের টিকা দেওয়ার মধ্যে কার্যক্রম সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তব পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় বয়সসীমা বাড়ানো, মাঠপর্যায়ে শিশুভিত্তিক তালিকা তৈরি এবং দুর্গম ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীকে টিকার আওতায় আনতে হবে।

একই সঙ্গে কমিউনিটি পর্যায়ে রোগ শনাক্তকরণ, নজরদারি ও দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা জোরদার করা গেলে হামজনিত মৃত্যু কমিয়ে আনা সম্ভব বলে মনে করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।

Tag :
জনপ্রিয় পোস্ট

‘মহিলাদের আমার ভাল্লাগে না’—প্রতি রাতে ১/২ জন ছাত্রকে হুজুরের রুমে নিতেন

হামে মৃত্যু ছাড়াল ৯৯০, টিকার বাইরে ৪০ লাখ পথশিশু

Update Time : ০৭:০৫:২৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

দেশে হাম পরিস্থিতির এখনও উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি। প্রাদুর্ভাব শুরুর প্রায় ছয় মাস পরও আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে। এখন পর্যন্ত হাম ও হামের মতো উপসর্গে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা ১ লাখ ৮৫ হাজারের বেশি। একই সময়ে হাম-সংশ্লিষ্ট নিশ্চিত ও সন্দেহভাজন মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় এক হাজারে পৌঁছেছে।

স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় হাম ও হামসদৃশ উপসর্গ নিয়ে আরও তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এতে দেশে হাম-সংশ্লিষ্ট মোট মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯৯৭ জনে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংক্রমণ এখন শুধু নির্দিষ্ট বয়সের শিশুদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বিভিন্ন বয়সের শিশুর মধ্যেই হাম ছড়িয়ে পড়ছে। ফলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রচলিত টিকাদান কার্যক্রমের পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে আরও কার্যকর পরিকল্পনা ও কমিউনিটি পর্যায়ে নজরদারি বাড়ানো জরুরি।

‘ইমিউনিটি গ্যাপ’ বড় কারণ

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, বিপুলসংখ্যক শিশু নিয়মিত টিকাদানের আওতার বাইরে থাকায় তাদের শরীরে হাম প্রতিরোধী পর্যাপ্ত রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়নি। এর ফলে সংক্রমণের বিস্তার ঠেকানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরীর মতে, শুধু টিকাদান কর্মসূচি পরিচালনা করলেই হবে না; নির্দিষ্টসংখ্যক শিশুকে কার্যকরভাবে টিকার আওতায় আনতে হবে। বিশেষ করে ঝুঁকিপূর্ণ ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের টিকা নিশ্চিত করা জরুরি।

তিনি বলেন, দেশে বিপুলসংখ্যক শিশু টিকাদানের বাইরে রয়েছে। এমনকি ছয় মাসের কম বয়সী শিশুর মধ্যেও হাম দেখা যাচ্ছে। মায়ের শরীরে পর্যাপ্ত রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা না থাকায় এসব শিশুও ঝুঁকিতে পড়ছে বলে মনে করেন তিনি।

এ ছাড়া পথশিশুদের বড় একটি অংশ নিয়মিত টিকাদানের আওতার বাইরে রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন এই জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ। তার মতে, শিশুদের বড় অংশকে টিকার আওতায় আনা না গেলে সংক্রমণ ও মৃত্যুহার কমানো কঠিন।

সব বয়সি শিশুর মধ্যেই সংক্রমণ

জাতীয় হাম ও রুবেলা নির্মূল যাচাই কমিটির চেয়ারম্যান ও মহামারি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে হাম কমার উল্লেখযোগ্য লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। ছয় থেকে নয় মাস বয়সি শিশু থেকে শুরু করে নয় মাস থেকে এক বছর এবং এক থেকে পাঁচ বছর বয়সি শিশুদের মধ্যেও সংক্রমণ রয়েছে।

আরও পড়ুনঃ  টানা চার দিন বৃদ্ধির পর আজ কমল সোনার দাম, ভরিতে ৯,২১৪ টাকা

তার মতে, টিকাদানের যে কভারেজের কথা বলা হচ্ছে, সেটি মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্রের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। শুধু টিকা সরবরাহের পরিমাণ দিয়ে প্রকৃত টিকাদান কভারেজ নির্ধারণ করা যায় না; কতজন শিশু বাস্তবে টিকা পেয়েছে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।

অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান বলেন, শিশুদের টিকাকেন্দ্রে নিয়ে আসতে অভিভাবকদের মধ্যে ব্যাপক সচেতনতা তৈরি করতে হবে। একই সঙ্গে ছয় মাসের কম বয়সি কোনো শিশুর জ্বর হলে দ্রুত শনাক্ত করে তাকে অন্যদের থেকে আলাদা রাখার বিষয়েও গুরুত্ব দিতে হবে।

তিনি আরও বলেন, হামকে জাতীয় স্বাস্থ্য ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন।

হাসপাতাল নয়, কমিউনিটিকেন্দ্রিক ব্যবস্থা জরুরি

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মোহাম্মদ মুশতাক হোসেনের মতে, হাম নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ শুধু হাসপাতাল বা আইসিইউনির্ভর হলে চলবে না। রোগী শনাক্তকরণ, সংক্রমণ প্রতিরোধ এবং প্রয়োজনীয় আইসোলেশনের ব্যবস্থা করতে হবে কমিউনিটি পর্যায়েই।

তিনি বলেন, রোগী গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই যদি তাকে শনাক্ত করা যায় এবং যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া যায়, তাহলে সংক্রমণ ছড়ানোর ঝুঁকি কমানো সম্ভব। বিপরীতে রোগী যখন সংকটাপন্ন অবস্থায় আইসিইউতে পৌঁছান, তখন মৃত্যুঝুঁকি কমানোর সুযোগও সীমিত হয়ে যায়।

জরুরি পরিস্থিতিতে বাড়ি বাড়ি গিয়ে টিকা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির প্রচলিত মাইক্রোপ্ল্যানিং ব্যবস্থা আরও কার্যকর করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।

তার মতে, প্রতিটি এলাকায় শিশুর তালিকা তৈরি করে কার টিকা প্রয়োজন, কে টিকা পেয়েছে এবং কার টিকা বাকি রয়েছে—এসব তথ্য নিয়মিত হালনাগাদ করা দরকার। পাশাপাশি অভিভাবকদের আগে থেকেই নিকটবর্তী টিকাকেন্দ্রের তথ্য জানাতে হবে।

টিকাদান কর্মসূচি নিয়ে প্রশ্ন

মার্চের শুরুতে দেশে হামের প্রাদুর্ভাব বাড়তে শুরু করার পর এপ্রিলে ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সি শিশুদের জন্য বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু করে সরকার। ওই কর্মসূচিতে সারাদেশে প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ ১৫ হাজার শিশুকে টিকার আওতায় আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল।

আরও পড়ুনঃ  ‘ওরা আমাকে মেরে ফেলবে’, সিজারের আগে নারীর আর্তনাদ; অতঃপর

এরপর জুন মাসে একই বয়সসীমার শিশুদের ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ানোর কর্মসূচি পরিচালিত হয়। সেই কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া শিশুর সংখ্যা ছিল প্রায় ২ কোটি ২৬ লাখ।

দুই কর্মসূচির পরিসংখ্যানের মধ্যে পার্থক্য থাকায় হামের টিকাদান কর্মসূচি থেকে বিপুলসংখ্যক শিশু বাদ পড়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

তবে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, শুধু ভিটামিন ‘এ’ কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া শিশুর সংখ্যা দিয়ে হামের টিকাদানের বাইরে থাকা শিশুর সংখ্যা নির্ধারণ করা যাবে না। কারণ ভিটামিন ‘এ’ কর্মসূচিতে পাঁচ বছরের বেশি বয়সি শিশুও অংশ নিয়ে থাকতে পারে।

এ বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পেতে জরিপের প্রয়োজন রয়েছে বলে জানিয়েছেন সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়-সংশ্লিষ্ট বিশেষ সহকারী ড. এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার।

সরকারের বক্তব্য

তবে হাম পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে বলে দাবি করেছেন প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বিষয়ক বিশেষ সহকারী ড. এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার।

তার বক্তব্য অনুযায়ী, যেসব শিশুর শরীরে পর্যাপ্ত ইমিউনিটি তৈরি হয়নি এবং যারা রোগের একেবারে গুরুতর পর্যায়ে হাসপাতালে আসছে, তাদের ক্ষেত্রে মৃত্যুঝুঁকি বেশি থাকছে।

টিকার কার্যকারিতা নিয়েও কাজ করা হচ্ছে বলে জানান তিনি। টিকা নেওয়া শিশুদের শরীর থেকে নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করা হচ্ছে। এসব পরীক্ষার ফল পেতে কিছুটা সময় লাগবে বলেও জানান তিনি।

দেশের প্রতিটি উপজেলায় টিকার মজুত রাখা হয়েছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী মানুষ যাতে টিকা নিতে পারে, সে ব্যবস্থাও করা হয়েছে বলে জানান তিনি।

৯৫ শতাংশ টিকাদানের ওপর জোর

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) নির্দেশনা অনুযায়ী, হাম প্রতিরোধে একটি জনগোষ্ঠীর অন্তত ৯৫ শতাংশ শিশুকে দুই ডোজ টিকার আওতায় আনা জরুরি। এ মাত্রার টিকাদান নিশ্চিত করা গেলে কোনো এলাকায় কিছু শিশু টিকা না পেলেও সংক্রমণ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা কমে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে চলমান হামের বড় প্রাদুর্ভাবের পেছনে দীর্ঘদিনের টিকাদান ঘাটতি বা ‘ইমিউনিটি গ্যাপ’ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

আরও পড়ুনঃ  সিলেটে হামের উপসর্গে আরও এক শিশুর মৃত্যু, মোট প্রাণহানি ১৪৫

তাদের পরামর্শ, শুধু নির্দিষ্ট বয়সসীমার শিশুদের টিকা দেওয়ার মধ্যে কার্যক্রম সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তব পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় বয়সসীমা বাড়ানো, মাঠপর্যায়ে শিশুভিত্তিক তালিকা তৈরি এবং দুর্গম ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীকে টিকার আওতায় আনতে হবে।

একই সঙ্গে কমিউনিটি পর্যায়ে রোগ শনাক্তকরণ, নজরদারি ও দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা জোরদার করা গেলে হামজনিত মৃত্যু কমিয়ে আনা সম্ভব বলে মনে করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।