
রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়ায় অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী জুয়েল, তাঁর স্ত্রী ও দুই সন্তানকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে ফরেনসিক বিভাগ। নিহতদের মুখমণ্ডল বিকৃত হয়ে গেলেও ময়নাতদন্তে অ্যাসিড বা কোনো রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহারের আলামত পাওয়া যায়নি। মুখের বিকৃতি পচন ধরার কারণে হয়েছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।
রোববার (২৩ আগস্ট) সন্ধ্যায় চারটি মরদেহের ময়নাতদন্ত শেষে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. বাবলু কিশোর বিশ্বাস এসব তথ্য জানান।
তিনি বলেন, চারটি মরদেহেরই ময়নাতদন্ত করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে তাঁদের শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। প্রয়োজনীয় নমুনা সংগ্রহ করে রাখা হয়েছে। এসব নমুনা সিআইডির ল্যাবে পাঠানো হবে। সেখান থেকে পাওয়া প্রতিবেদনের ভিত্তিতে হত্যার বিষয়ে চূড়ান্ত মতামত দেওয়া হবে।
নিহতদের মুখে অ্যাসিড বা অন্য কোনো রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহারের বিষয়ে জানতে চাইলে ডা. বাবলু কিশোর বিশ্বাস বলেন, পচনের কারণে মুখমণ্ডল বিকৃত হয়েছে। রাসায়নিক ব্যবহারের কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়নি। একইভাবে নিহত প্রার্থী চক্রবর্তীর চোয়াল ভাঙারও কোনো আলামত ময়নাতদন্তে পাওয়া যায়নি।
বাড়ি থেকে চারজনের মরদেহ উদ্ধার
শনিবার (২২ আগস্ট) রাত ১১টার দিকে রংপুর নগরের কামালকাছনা-মাছুয়াপাড়া এলাকার নিজ বাড়ি থেকে গণপতি চক্রবর্তী জুয়েল, তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, মেয়ে আগামী চক্রবর্তী প্রার্থী ও ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তী প্রিয়মের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
এ ঘটনায় রোববার ভোরে মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাস নামে দুই যুবককে আটক করা হয়। পরে তাঁদের গ্রেপ্তার দেখানো হয়। একই দিন নিহত গণপতি চক্রবর্তীর বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী বাদী হয়ে হত্যা মামলা করেন।
ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করে হত্যার অভিযোগ
রোববার দুপুরে সংবাদ সম্মেলনে রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ হত্যাকাণ্ডের প্রাথমিক কারণ ও ঘটনার বিবরণ তুলে ধরেন।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ পাশের একটি ভবনের ছাদ দিয়ে গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে প্রবেশ করেন। সেখানে তাঁরা ইয়াবা সেবন করছিলেন। এ সময় গণপতি চক্রবর্তী ছাদে গিয়ে তাঁদের দেখতে পান এবং মাদক সেবন ও সেখানে আড্ডা দেওয়ার বিষয়ে বকাঝকা করেন।
পুলিশের দাবি, তাঁরা ভয় পান গণপতি চক্রবর্তী বিষয়টি অন্যদের জানিয়ে দিতে পারেন। এ আশঙ্কা থেকেই তাঁকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। একপর্যায়ে গামছা দিয়ে গলায় পেঁচিয়ে তাঁকে শ্বাসরোধ করা হয়।
গণপতির চিৎকার ও ধস্তাধস্তির শব্দ শুনে তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী সিঁড়ি দিয়ে ওপরে যাওয়ার চেষ্টা করলে তাঁকেও গামছা পেঁচিয়ে হত্যা করা হয়। এরপর মেয়ে প্রার্থী চক্রবর্তী এগিয়ে এলে তাকেও হত্যা করা হয়। পরে ১২ বছরের ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তী প্রিয়মকেও হত্যা করা হয় বলে পুলিশের দাবি।
পুলিশ জানিয়েছে, প্রিয়ম অভিযুক্তদের চিনত। ভবিষ্যতে সে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা অন্যদের জানিয়ে দিতে পারে—এমন আশঙ্কা থেকেও তাকে হত্যা করা হয় বলে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তথ্য পাওয়া গেছে।
লুটপাটের চেষ্টা
হত্যাকাণ্ডের পর অভিযুক্তরা ওই বাড়ির ওয়াশরুমে গোসল করেন এবং সেখানে আবার ইয়াবা সেবন করেন বলে পুলিশ জানিয়েছে। পরে তারা বাসার আসবাবপত্র তল্লাশি করে স্বর্ণালংকার বের করেন।
পুলিশের দাবি, সিদ্ধার্থ একটি স্বর্ণের দোকানে কাজ করেন। তাই আগুন দিয়ে পরীক্ষা করে স্বর্ণালংকারের কোনগুলো আসল, তা শনাক্ত করে নেওয়া হয়। পরে লুট করা স্বর্ণালংকার উদ্ধার করেছে পুলিশ।
পুলিশ আরও জানায়, শুক্রবার জুমার নামাজের সময় আশপাশের লোকজন মসজিদে গেলে মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ পাশের বাড়ির ছাদ দিয়ে ওই বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান।
আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি
এদিকে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গ্রেপ্তার মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাস আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন বলে পুলিশ জানিয়েছে। রোববার রাতে তাঁদের জবানবন্দি গ্রহণ শেষে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন আদালত।
তবে হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে পুলিশের প্রাথমিক বক্তব্যের পাশাপাশি ফরেনসিক বিভাগের চূড়ান্ত প্রতিবেদনও গুরুত্বপূর্ণ। সংগৃহীত নমুনা সিআইডির ল্যাব থেকে পরীক্ষার পর হত্যার কারণ ও পদ্ধতি সম্পর্কে চূড়ান্ত মতামত পাওয়া যাবে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।
রংপুর প্রতিনিধি 


















