Dhaka ০২:৩৪ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ১৪ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম :
স্বামীর সঙ্গে বেড়াতে গিয়ে ‘প্রেমিকের’ বাইকে উধাও ভারতীয় তরুণী, অতঃপর… লাইনচ্যুত হওয়া ট্রেনের উদ্ধার কার্যক্রম চলছে, তদন্ত কমিটি গঠন ১৩ বছর পর ধরা পড়লেন ছদ্মবেশে থাকা চঞ্চল সৈকতে গোসলে নেমে মাদরাসাছাত্রের মৃত্যু, উদ্ধার ১৫ তুলসীগঙ্গা নদী থেকে বহুমূল্য কষ্টিপাথরের মূর্তি উদ্ধার বিষ হাতে হৃদয়ের বাড়িতে কিশোরী, বলছে ‘বিয়ে করতেই হবে’ ১০ বছর বয়সেই কুরআনের হাফেজ আশ্রাফ তাহসিফের মৃত্যুর আগে সিসিটিভি ফুটেজে দেখা মিলল যে দৃশ্য ‘ভালোবাসা যত বড় হয়, জীবনটা তত নয়’, দেড় দশক ধরে স্ত্রীর কবর পরিষ্কার করছেন আইনজীবী সিলেটে রায়হান হত্যা: এসআই আকবরের মৃত্যুদন্ড, দুজনের যাবজ্জীবন, ৩ জনের ৭ বছরের জেল

ফ্ল্যাটের চেয়েও কবরের দাম বেশি, এক টুকরো কবরস্থানের দাম সাড়ে ৪ কোটি

রাজধানী ঢাকায় জমির সংকটের প্রভাব পড়ছে জীবনের পাশাপাশি মৃত্যুর পরের শেষ ঠিকানাতেও। অভিজাত বনানী এলাকায় একটি কবরের জায়গা দীর্ঘমেয়াদে সংরক্ষণ করতে যে অর্থ প্রয়োজন, তা অনেক ক্ষেত্রে একটি মাঝারি আকারের ফ্ল্যাটের দামের কাছাকাছি।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের অধীন বনানী কবরস্থানে প্রায় ২০ বর্গফুট জায়গা ২৫ বছরের জন্য সংরক্ষণ করতে ব্যয় হচ্ছে প্রায় সাড়ে ৪ কোটি টাকা। অথচ একই এলাকায় প্রায় ২ হাজার বর্গফুটের ফ্ল্যাট কিনতে প্রায় ৪ থেকে সাড়ে ৫ কোটি টাকা পর্যন্ত খরচ হতে পারে।

সীমিত জায়গায় বাড়ছে কবর সংরক্ষণের খরচ

বনানী কবরস্থানে বর্তমানে ৯ হাজারের বেশি কবর রয়েছে। জায়গার স্বল্পতার কারণে সেখানে নতুন দাফনের জন্য পর্যাপ্ত স্থান পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে নির্দিষ্ট সময় পর পুরোনো কবরের জায়গা আবারও ব্যবহারের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, পুরোনো কবরের জায়গায় নতুন মরদেহ দাফনের জন্য নির্ধারিত ফি ৫০ হাজার ৫০০ টাকা। তবে কেউ যদি দীর্ঘ সময়ের জন্য কবরের জায়গা সংরক্ষণ করতে চান, সেক্ষেত্রে ব্যয় অনেক বেড়ে যায়।

১৫ বছরের জন্য একটি কবরের জায়গা সংরক্ষণে খরচ প্রায় ৩ কোটি টাকা। আর ২৫ বছরের জন্য সেই ব্যয় গিয়ে দাঁড়ায় প্রায় সাড়ে ৪ কোটি টাকায়।

কবরস্থানে প্রতিদিন গড়ে ১০ থেকে ১২ জন জায়গার খোঁজে আসেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। কিন্তু সামর্থ্য থাকলেও অনেকের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না জায়গার অভাবে।

জীবিত অবস্থাতেই নিজের শেষ ঠিকানা খুঁজছেন কেউ কেউ

কবরের জায়গার সংকটের বাস্তব চিত্র পাওয়া যায় বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার ৬৫ বছর বয়সী এক বাসিন্দার ঘটনায়।

তিনি কয়েক বছর ধরে নিজের জন্য একটি কবরের জায়গা সংরক্ষণের চেষ্টা করছেন। কয়েক কোটি টাকা খরচ করার সক্ষমতা থাকলেও পছন্দমতো জায়গা পাচ্ছেন না বলে জানা গেছে।

এমন ঘটনা নগরীর কবরস্থান ব্যবস্থাপনা নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তাকে আরও সামনে নিয়ে এসেছে।

আরও পড়ুনঃ  সাংবাদিকদের শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণ ও ডাটাবেজ তৈরির পরিকল্পনা করছে সরকার

একই জায়গায় আবারও দাফন

বনানী কবরস্থানে জায়গার সংকট মোকাবিলায় পুরোনো কবর নির্দিষ্ট সময় পর পুনরায় ব্যবহারের ব্যবস্থা রয়েছে। সাধারণত প্রায় দুই বছর পর একটি কবরের জায়গায় নতুন করে দাফন করা হয়।

এমনকি কিছু স্থায়ী কবরেও একাধিক ব্যক্তিকে দাফনের নজির রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, কোনো কোনো স্থায়ী কবরে সাতজন পর্যন্ত মরদেহ দাফন করা হয়েছে।

ঢাকার অন্যান্য কবরস্থানেও সংকট

কবরের জায়গার এই সংকট শুধু বনানীতে সীমাবদ্ধ নয়। রাজধানীর পুরোনো ও গুরুত্বপূর্ণ আজিমপুর কবরস্থানও দীর্ঘদিন ধরে জায়গার স্বল্পতায় ভুগছে।

প্রায় ৩২ একর জমির ওপর গড়ে ওঠা আজিমপুর কবরস্থানে আনুমানিক ৩০ হাজার কবর রয়েছে। প্রতিদিন সেখানে গড়ে ২৫ থেকে ৩০ জনের দাফন হয়।

চাহিদার তুলনায় জায়গা কম থাকায় সেখানে প্রায় ১৮ মাস পর প্রয়োজন অনুযায়ী পুরোনো কবরের জায়গা পুনরায় ব্যবহারের ব্যবস্থা করা হয়।

জনসংখ্যার তুলনায় কবরস্থানের জমি অপ্রতুল

নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, একটি শহরের পরিকল্পনায় আবাসন, সড়ক, খেলার মাঠ বা পার্কের মতো কবরস্থানকেও গুরুত্বপূর্ণ নগরসেবা হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

রাজউকের নগর পরিকল্পনা সংশ্লিষ্টদের হিসাবে, জনসংখ্যার অনুপাতে পর্যাপ্ত কবরস্থানের জমি থাকা দরকার। প্রচলিত পরিকল্পনা মানদণ্ড অনুযায়ী প্রতি ৫০ হাজার মানুষের জন্য প্রায় এক একর জমি কবরস্থানের কাজে প্রয়োজন হতে পারে।

ঢাকার জনসংখ্যা যদি সাড়ে ৩ কোটি ধরা হয়, তাহলে প্রয়োজন হতে পারে প্রায় ৭০০ একর কবরস্থানের জমি। আর জনসংখ্যা ২ কোটি হিসাব করলেও প্রয়োজন দাঁড়ায় প্রায় ৪০০ একর।

এ কারণেই বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা বা ড্যাপে রাজধানীর বিভিন্ন ওয়ার্ডে ছোট আকারে কবরস্থান তৈরির সুপারিশ করা হয়েছে।

শেষ ঠিকানার জায়গাও এখন দুষ্প্রাপ্য

ঢাকায় জনসংখ্যা ও জমির চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কবরস্থানের জায়গাও ক্রমেই মূল্যবান হয়ে উঠছে। ফলে একজন মানুষের মৃত্যুর পর তার শেষ ঠিকানা নিশ্চিত করাও নগর ব্যবস্থাপনার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আরও পড়ুনঃ  গোয়াইনঘাটে ৪ লাখ টাকায় স্ত্রীকে বিক্রি করে দেন আশিকুর, অতঃপর...

বনানীতে ২০ বর্গফুট কবরের জায়গা দীর্ঘমেয়াদে সংরক্ষণে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ের বিষয়টি শুধু জমির উচ্চমূল্যের উদাহরণ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে রাজধানীর অপরিকল্পিত নগরায়ণ, জনসংখ্যার চাপ এবং কবরস্থান ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ঘাটতি।

জীবিত মানুষের আবাসনের পাশাপাশি মৃতদের শেষ আশ্রয়ের জন্যও পর্যাপ্ত জায়গা নিশ্চিত করা এখন ঢাকার নগর পরিকল্পনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।

Tag :
জনপ্রিয় পোস্ট

স্বামীর সঙ্গে বেড়াতে গিয়ে ‘প্রেমিকের’ বাইকে উধাও ভারতীয় তরুণী, অতঃপর…

ফ্ল্যাটের চেয়েও কবরের দাম বেশি, এক টুকরো কবরস্থানের দাম সাড়ে ৪ কোটি

Update Time : ১১:৪৮:৩৩ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

রাজধানী ঢাকায় জমির সংকটের প্রভাব পড়ছে জীবনের পাশাপাশি মৃত্যুর পরের শেষ ঠিকানাতেও। অভিজাত বনানী এলাকায় একটি কবরের জায়গা দীর্ঘমেয়াদে সংরক্ষণ করতে যে অর্থ প্রয়োজন, তা অনেক ক্ষেত্রে একটি মাঝারি আকারের ফ্ল্যাটের দামের কাছাকাছি।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের অধীন বনানী কবরস্থানে প্রায় ২০ বর্গফুট জায়গা ২৫ বছরের জন্য সংরক্ষণ করতে ব্যয় হচ্ছে প্রায় সাড়ে ৪ কোটি টাকা। অথচ একই এলাকায় প্রায় ২ হাজার বর্গফুটের ফ্ল্যাট কিনতে প্রায় ৪ থেকে সাড়ে ৫ কোটি টাকা পর্যন্ত খরচ হতে পারে।

সীমিত জায়গায় বাড়ছে কবর সংরক্ষণের খরচ

বনানী কবরস্থানে বর্তমানে ৯ হাজারের বেশি কবর রয়েছে। জায়গার স্বল্পতার কারণে সেখানে নতুন দাফনের জন্য পর্যাপ্ত স্থান পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে নির্দিষ্ট সময় পর পুরোনো কবরের জায়গা আবারও ব্যবহারের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, পুরোনো কবরের জায়গায় নতুন মরদেহ দাফনের জন্য নির্ধারিত ফি ৫০ হাজার ৫০০ টাকা। তবে কেউ যদি দীর্ঘ সময়ের জন্য কবরের জায়গা সংরক্ষণ করতে চান, সেক্ষেত্রে ব্যয় অনেক বেড়ে যায়।

১৫ বছরের জন্য একটি কবরের জায়গা সংরক্ষণে খরচ প্রায় ৩ কোটি টাকা। আর ২৫ বছরের জন্য সেই ব্যয় গিয়ে দাঁড়ায় প্রায় সাড়ে ৪ কোটি টাকায়।

কবরস্থানে প্রতিদিন গড়ে ১০ থেকে ১২ জন জায়গার খোঁজে আসেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। কিন্তু সামর্থ্য থাকলেও অনেকের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না জায়গার অভাবে।

জীবিত অবস্থাতেই নিজের শেষ ঠিকানা খুঁজছেন কেউ কেউ

কবরের জায়গার সংকটের বাস্তব চিত্র পাওয়া যায় বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার ৬৫ বছর বয়সী এক বাসিন্দার ঘটনায়।

তিনি কয়েক বছর ধরে নিজের জন্য একটি কবরের জায়গা সংরক্ষণের চেষ্টা করছেন। কয়েক কোটি টাকা খরচ করার সক্ষমতা থাকলেও পছন্দমতো জায়গা পাচ্ছেন না বলে জানা গেছে।

এমন ঘটনা নগরীর কবরস্থান ব্যবস্থাপনা নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তাকে আরও সামনে নিয়ে এসেছে।

আরও পড়ুনঃ  এআই দিয়ে নারী সেনাসদস্য সেজে ইতালি প্রবাসীর সঙ্গে প্রেম, অতঃপর..

একই জায়গায় আবারও দাফন

বনানী কবরস্থানে জায়গার সংকট মোকাবিলায় পুরোনো কবর নির্দিষ্ট সময় পর পুনরায় ব্যবহারের ব্যবস্থা রয়েছে। সাধারণত প্রায় দুই বছর পর একটি কবরের জায়গায় নতুন করে দাফন করা হয়।

এমনকি কিছু স্থায়ী কবরেও একাধিক ব্যক্তিকে দাফনের নজির রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, কোনো কোনো স্থায়ী কবরে সাতজন পর্যন্ত মরদেহ দাফন করা হয়েছে।

ঢাকার অন্যান্য কবরস্থানেও সংকট

কবরের জায়গার এই সংকট শুধু বনানীতে সীমাবদ্ধ নয়। রাজধানীর পুরোনো ও গুরুত্বপূর্ণ আজিমপুর কবরস্থানও দীর্ঘদিন ধরে জায়গার স্বল্পতায় ভুগছে।

প্রায় ৩২ একর জমির ওপর গড়ে ওঠা আজিমপুর কবরস্থানে আনুমানিক ৩০ হাজার কবর রয়েছে। প্রতিদিন সেখানে গড়ে ২৫ থেকে ৩০ জনের দাফন হয়।

চাহিদার তুলনায় জায়গা কম থাকায় সেখানে প্রায় ১৮ মাস পর প্রয়োজন অনুযায়ী পুরোনো কবরের জায়গা পুনরায় ব্যবহারের ব্যবস্থা করা হয়।

জনসংখ্যার তুলনায় কবরস্থানের জমি অপ্রতুল

নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, একটি শহরের পরিকল্পনায় আবাসন, সড়ক, খেলার মাঠ বা পার্কের মতো কবরস্থানকেও গুরুত্বপূর্ণ নগরসেবা হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

রাজউকের নগর পরিকল্পনা সংশ্লিষ্টদের হিসাবে, জনসংখ্যার অনুপাতে পর্যাপ্ত কবরস্থানের জমি থাকা দরকার। প্রচলিত পরিকল্পনা মানদণ্ড অনুযায়ী প্রতি ৫০ হাজার মানুষের জন্য প্রায় এক একর জমি কবরস্থানের কাজে প্রয়োজন হতে পারে।

ঢাকার জনসংখ্যা যদি সাড়ে ৩ কোটি ধরা হয়, তাহলে প্রয়োজন হতে পারে প্রায় ৭০০ একর কবরস্থানের জমি। আর জনসংখ্যা ২ কোটি হিসাব করলেও প্রয়োজন দাঁড়ায় প্রায় ৪০০ একর।

এ কারণেই বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা বা ড্যাপে রাজধানীর বিভিন্ন ওয়ার্ডে ছোট আকারে কবরস্থান তৈরির সুপারিশ করা হয়েছে।

শেষ ঠিকানার জায়গাও এখন দুষ্প্রাপ্য

ঢাকায় জনসংখ্যা ও জমির চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কবরস্থানের জায়গাও ক্রমেই মূল্যবান হয়ে উঠছে। ফলে একজন মানুষের মৃত্যুর পর তার শেষ ঠিকানা নিশ্চিত করাও নগর ব্যবস্থাপনার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আরও পড়ুনঃ  জগন্নাথপুরে ৬ বছর ধরে প্রধান শিক্ষক-শূন্য বিদ্যালয়

বনানীতে ২০ বর্গফুট কবরের জায়গা দীর্ঘমেয়াদে সংরক্ষণে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ের বিষয়টি শুধু জমির উচ্চমূল্যের উদাহরণ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে রাজধানীর অপরিকল্পিত নগরায়ণ, জনসংখ্যার চাপ এবং কবরস্থান ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ঘাটতি।

জীবিত মানুষের আবাসনের পাশাপাশি মৃতদের শেষ আশ্রয়ের জন্যও পর্যাপ্ত জায়গা নিশ্চিত করা এখন ঢাকার নগর পরিকল্পনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।