এপিআই (এশিয়ান প্যাসিফিক আইল্যান্ডার)– যুক্তরাষ্ট্রে যারা থাকেন তাদের অনেকেরই জানা প্রতি বছরের মে মাসটা তাদের একটি জনগোষ্ঠীর জন্য ঐতিহ্য ও উদযাপনের মাস। এই মাসে সেখানকার এশীয় বংশোদ্ভূত সফল ব্যক্তিত্বদের কৃতিত্ব স্মরণ করা হয়। ২০২৩ সালে তেমনই এক এপিআই উদযাপনে ফিলাডেলফিয়া ইউনিয়ন নামের ক্লাবটি তাদের খেলোয়াড় কুইন সুলিভানের বাংলাদেশি শিকড়ের কথা জানিয়ে একটি ভিডিও পোস্ট করে; যেখানে দেখানো হয় ফিলাডেলফিয়ার এক বাংলাদেশি রেস্টুরেন্ট ‘লবঙ্গ কাবাব অ্যান্ড ক্যাফে’তে বসে সামনে ধোঁয়া ওঠা নান রুটির সঙ্গে গরু আর খাসির ঝোল নিয়ে খেতে বসেছিলেন কুইন সুলিভান।
সঙ্গীর সঙ্গে খাবারের স্বাদ ভাগাভাগি করতে গিয়ে বলছিলেন খাবারটির সঙ্গে তাঁর বাংলাদেশি সম্পর্কের কথা। জানিয়েছিলেন তাঁর নানি ঢাকার মেয়ে, এই খাবার তাঁর হাতেই খেয়েছেন। স্থানীয় মিডিয়াও শিরোনাম করে– ‘মেজর সকার লিগে খেলা একমাত্র সক্রিয় বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ফুটবলার’। ইনস্টাগ্রাম ঘাঁটতে গিয়ে বাংলাদেশ থেকে সেই শিরোনামে চোখ পরে আসির আওসাফ তাসিনের। যিনি ‘সেভ ফুটবল বাংলাদেশ’ নামের দেশীয় ফুটবল সমর্থকদের একটি গোষ্ঠীর ফেসবুক পেইজের অ্যাডমিন। ক্রিকেট আর ইউরোপীয় ফুটবলের অমোঘ আকর্ষণের বাইরেও যিনি দেশের ফুটবলের মান উন্নয়ন ও প্রচারে অনেকটা সময় ব্যয় করেন। সেই তিনিই এরপর ইনস্টাগ্রামে খুঁজতে থাকেন এই কুইন সুলিভানকে। এতেই পেয়ে যান রোনান আর ডেকলান ভাইদের সন্ধান। পরিচয় পর্বের দুই বছরে অনেক প্রচেষ্টার পর সফল স্কাউটের মতো অবশেষে পেয়ে যান বাংলাদেশ ফুটবলে নানি-নাতিদের বাংলাদেশ জয়ের গল্প।
‘আমি আসলে ইনস্টাগ্রামে প্রথম কুইনকে খুঁজছিলাম, কেননা তার আগে কোথায় যেন তাঁর বাংলাদেশি শিকড়ের খবরটি পড়েছিলাম। কুইনকে পাওয়ার পর তাঁর ভাই রোনানের ইনস্টাগ্রামও পেয়ে যাই। তাকে মেসেজ দিতে থাকি। একসময় সে রিপ্লাই দেয়। তাকে বাংলাদেশ ও বাংলাদেশ ফুটবল সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা দিতে থাকি। সেও বাংলাদেশ সম্পর্কে আগ্রহ দেখাতে থাকে। এক সময় তাকে জানাই সে বাংলাদেশে খেলতে আগ্রহী কিনা?
ইতিবাচক থাকলেও সেভাবে চূড়ান্ত কিছু জানাচ্ছিল না রোনান। এভাবেই প্রায় ছয় সাত মাস কেটে যায়। হাল ছাড়িনি। এক সময় তার কাছ থেকে ঢাকায় তার নানির ঠিকানা নিই। এ সবই হয়েছিল ২০২৪ সালের আগস্ট-সেপ্টেম্বরের দিক। এরপর তার নানির ধানমন্ডির ঠিকানা নিয়ে দেখা করি। তাঁর সাক্ষাৎকার নিই। তিনি পরামর্শ দেন রোনানের বাবা-মায়ের সঙ্গে কথা বলতে। তাদের সঙ্গেও কথা বলি এবং তাদের সঙ্গে বাফুফের সহসভাপতি ফাহাদ করিমের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দিই।’
তাসিন জানান, ওই পর্যন্ত তাঁর দায়িত্ব ছিল অনূর্ধ্ব-২০ দলের জন্য বিশ্বমানের একজন ফুটবলার খুঁজে দেওয়ার। এরপর বাকিটা তো ইতিহাস, সুলিভান ভাইদের নজরকাড়া পারফরম্যান্সে ভারতকে হারিয়ে সাফ অনূর্ধ্ব-২০ চ্যাম্পিয়ন হয় বাংলাদেশ।
আসলে গল্পটা এক নানি আর তাঁর নাতিদের লাল-সবুজ জয় করার। বড় নাতি তাঁর কুইন সুলিভান, যে কিনা এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে বয়সভিত্তিক দলের হয়ে বিশ্বকাপ খেলেছেন। বাড়ির সবার আশা এবার যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে মূল বিশ্বকাপেও সুযোগ পাবেন বড় ছেলে। ছোট ছেলে কাভান সুলিভানের বয়স মাত্র সতেরো, ম্যানসিটি থেকে এখনই ডাক এসেছে এই মিডফিল্ডারের। আর মাঝে দুই যমজ ভাই– রোনান আর ডেকলান। নানিবাড়ির হয়ে খেলার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এই দুই ভাই।
গত মাসেই প্রথমবার বাংলাদেশে এসেছেন। ৩৫ জনের ট্রায়াল থেকে নিজেদের জায়গা করে নিয়েছেন মূল দলে। চার পাশে মানুষের এত ভালোবাসা, এত আবেগ দেখে দারুণ আপ্লুত ডেকলান। ‘আমার দেখা পৃথিবীর সেরা সমর্থক এই বাংলাদেশিরা। তাদের এত ভালোবাসা আমাদের প্রেরণা দিচ্ছে জাতীয় দলের হয়ে খেলার।’
মালদ্বীপের মালেতে ভারতকে হারানোর পর এভাবেই নিজের অনুভূতি ব্যক্ত করতে দেখা যায় ডেকলানকে। রোনানও ছিলেন দারুণ আবেগী। জয়সূচক গোলটি করার পরই মেসির মতো জার্সি খুলে গ্যালারির সামনে তাঁকে উদযাপন করতে দেখা যায়। তিনিও স্বপ্ন দেখেন একদিন হামজার মতো তিনিও বাংলাদেশ জাতীয় দলের হয়ে খেলবেন। ওদিকে তারা নানি সুলতানা আলম, যে কিনা দুই নাতির মধ্যে নিজের শিকড়কে খুঁজে পান। মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। একসময় চাকরি করেছেন জাতিসংঘেও। এখন গর্ব তাঁর দুই নাতিকে বাংলাদেশের জার্সি গায়ে দেখে। ‘সত্যিই এ এক অন্যরকম অনুভূতি। দারুণ গর্বিত আমি। দুই নাতি বাংলাদেশের হয়ে খেলেছে এবং দেশকে ট্রফি এনে দিয়েছে। বাংলাদেশের মানুষ যেভাবে তাদের গ্রহণ করেছে তা দেখে খুব ভালো লাগছে।’
শুক্রবার মালেতে ভারতকে হারিয়ে অনূর্ধ্ব-২০ সাফ জয়ের পর এভাবেই ঢাকা থেকে যাওয়া একটি টেলিভিশনের সামনে নিজের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করছিলেন সুলতানা আলম। বহু বছর আগে ঢাকার মেয়ে সুলতানা পাড়ি জমিয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রে। সেখানে ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভানিয়ায় পড়তে গিয়ে বিয়ে করেন এক জার্মান অধ্যাপককে। সেই দম্পতির মেয়ের ঘরেই জন্ম চার ভাই কুইন, রোনান, ডেকলান আর কাভান সুলিভানের।
ফুটবল পরিবারটির একেবারে রক্তে মেশা। রোনানের বাবা ব্রেন্ডান সুলিভান অস্ট্রেলিয়ার ‘এ’ লিগে ছয় বছর পেশাদার ফুটবলে পাঁচটি ক্লাবের হয়ে খেলেছেন। রোনানের মা হেইকে বিশ্ববিদ্যালয় দলের হয় খেলেছেন। রোনানদের চাচাতো ভাই ক্রিস অলব্রাইটও যুক্তরাষ্ট্র দলের হয়ে খেলেছেন। তাদের নানা ল্যারি সুলিভান– তিনি ভিলানোভা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান কোচের দায়িত্ব পালন করেছেন। সব মিলিয়ে ফুটবল নিয়েই পরিবারটির যত স্বপ্ন আর সাধনা। যেখানে বাংলাদেশের হয়ে দুই ভাইয়ের খেলা দেখতে বসে কুইন আর কাভানও বাংলাদেশের ফুটবলের আবেগে জড়িয়ে পড়েছেন।
সেদিন যখন রোনান ভারতের বিপক্ষে পেনাল্টি কিক নিতে যাবেন তার ঠিক আগেই কুইন সামাজিক মাধ্যমে ভিডিও পোস্ট করেন–‘চিপ হিট’। টেলিপ্যাথি কিনা কে জানে, সেই চিপ হিটই নিয়েছিলেন রোনান। তার সেই পানেনকা শটেই জয় নিশ্চিত হয়ে যায় বাংলাদেশের।






