নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে ইতোমধ্যে প্রান্তিক ও নিম্ন আয়ের পরিবারকে সুরক্ষা দিতে ৩৭ হাজার ৮১৪টি পরিবারের ‘নারী প্রধানকে’ ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে মাসিক ২ হাজার ৫০০ টাকা দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
বুধবার জাতীয় সংসদ অধিবেশনে সংসদ সদস্য মো. রবিউল আওয়ালের এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা জানান। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ। তারেক রহমান বলেন, বর্তমান সরকার একটি নিরাপদ, বৈষম্যহীন ও জলবায়ু সহিষ্ণু বাংলাদেশ গড়ে তুলতে কাজ করছে, যেখানে নারী ও শিশুরা হবে টেকসই উন্নয়নের সমঅংশীদার এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম পাবে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ। নারী ও শিশুদের সার্বিক উন্নয়ন ও কল্যাণ নিশ্চিতকল্পে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আওতায় নানাবিধ কার্যক্রম পরিচালিত ছিল, এবং কর্মক্ষম মহিলাদের আর্থ-হচ্ছে। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো: গরীব অসচ্ছল, সামাজিক অবস্থার উন্নয়ন সাধনের লক্ষ্যে ভালনারেবল উইমেন বেনিফিট (ভিডব্লিউবি) কার্যক্রম; গর্ভবতী মায়ের গর্ভকালীন পুষ্টি এবং শিশুর পুষ্টি চাহিদা পূরণ ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশে মা ও শিশু সহায়তা কর্মসূচি; মহিলাদের আত্ম-কর্মসংস্থানের জন্য ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচি; নারী উদ্যোক্তাদের উৎপাদিত পণ্য বিপণনের লক্ষ্যে জয়িতা ফাউন্ডেশন পরিচালনা ইত্যাদি।
তিনি বলেন, নারী নির্যাতন প্রতিরোধকল্পে বিভিন্ন আইন এবং বিধিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের পাশাপাশি নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে ন্যাশনাল টোলফ্রি হেল্প লাইন, ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেন্টার (ওসিসি), ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেল, ন্যাশনাল ফরেনসিক ডিএনএ প্রোফাইলিং ল্যাবরেটরি, ন্যাশনাল ট্রমা কাউন্সিলিং সেন্টার, মহিলা, শিশু ও কিশোরী হেফাজতীদের নিরাপদ আবাসন কেন্দ্র রয়েছে।প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিদ্যমান মা ও শিশু সহায়তা কর্মসূচি ধারাবাহিকভাবে সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। এ কর্মসূচিতে প্রাপ্ত আর্থিক সুবিধার পরিমাণ ও উপকারভোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি, কর্মসূচিতে প্রসবপূর্ব এবং প্রসব পরবর্তী সেবা অন্তর্ভুক্ত করা, টিকা ও প্রাতিষ্ঠানিক ডেলিভারি অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, নারীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে মানসম্মত প্রশিক্ষণ, নগদ সহায়তার সঙ্গে জীবিকা সহায়তা যুক্ত করে, শহর ও গ্রামাঞ্চলের জন্য পৃথক গ্রাজুয়েশনভিত্তিক মডেল সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। অধিক সংখ্যক নারী উদ্যোক্তা তৈরি ও নারীদের জন্য বিপণন নেটওয়ার্ক শক্তিশালীকরণের পরিকল্পনাও সরকারের রয়েছে। ইতোমধ্যে নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে প্রান্তিক ও নিম্ন আয়ের পরিবারকে সুরক্ষা দিতে প্রাথমিক পর্যায়ে ১৩টি জেলা এবং ৩টি সিটি কর্পোরেশনে ৩৭ হাজার ৮১৪টি পরিবারের নারী প্রধানকে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ এর মাধ্যমে মাসিক ২ হাজার ৫০০ টাকা প্রদান করা হয়েছে।
তারেক রহমান বলেন, শিশুরা দেশ ও জাতির ভবিষ্যত। শিশুর বিকাশ ও কল্যাণে বাংলাদেশ শিশু একাডেমি সাংস্কৃতিক প্রশিক্ষণ; জাতীয় শিশু পুরস্কার প্রতিযোগিতা আয়োজন; শিশুতোষ চলচ্চিত্র নির্মাণ, দরিদ্র ও দুস্থ শিশুদের প্রাক্-প্রাথমিক ও শিশু বিকাশ কর্মসূচি; অটিজম বিষয়ক সচেতনতামূলক কার্যক্রম; পরিবেশ সংরক্ষণসহ শিশু স্বার্থ সংরক্ষণে নানাবিধ দায়িত্ব পালন করে আসছে। পথশিশু পুনর্বাসন কার্যক্রমের আওতায় ২টি আবাসিক কেন্দ্রের মাধ্যমে বর্তমানে ১৫১ জন শিশুকে আবাসিক ব্যবস্থা, খাবার, শিক্ষা ও চিকিৎসা সেবা প্রদান করা হয়। এছাড়াও এ কার্যক্রমের আওতায় ৯টি আউটরিচ স্কুল রয়েছে। কর্মজীবী মায়েদের ৬ মাস হতে ৬ বছর বয়সের শিশুদের দেখভালের জন্য মোট ৬৪টি শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র রয়েছে।
এ প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেস, এসকল দিবাযত্ন কেন্দ্রে সুষম খাবার প্রদান, প্রাক-স্কুল শিক্ষা প্রদান, প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিচর্যা করা হয় এবং ইনডোর খেলাধুলা ও চিত্তবিনোদনের ব্যবস্থা রয়েছে। নারীদের কর্মস্থলে শিশু পরিচর্যা কেন্দ্র (ডে-কেয়ার) স্থাপনের পাশাপাশি, গার্মেন্টসসহ সব শিল্প কারখানা, অফিস ও আদালতে কর্মরত মায়েদের জন্য ‘বেস্ট ফিডিং কর্ণার’ স্থাপনের বিষয়ে নির্বাচনী ইশতেহারে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
তারেক রহমান বলেন, উপকূলীয় জনগোষ্ঠী, বিশেষত নারীদের জলবায়ু পরিবর্তনজনিত লবণাক্ততার ঝুঁকি প্রশমন ও অভিযোজন সক্ষমতা বৃদ্ধি করে সুপেয় পানির প্রাপ্যতা এবং জীবিকার মান উন্নয়ন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে ‘Gender Responsive Climate Adaptation (GCA)’ প্রকল্পের আওতায় বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকায় (খুলনা জেলার দাকোপ, কয়রা ও পাইকগাছা উপজেলা এবং সাতক্ষীরা জেলার আশাশুনি ও শ্যামনগর উপজেলা) বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এ প্রকল্পের মাধ্যমে মোট ৪৩ হাজার নারীকে জীবিকা সহায়তা, প্রশিক্ষণ ও কৃষি উপকরণ প্রদান করা হয়েছে। এছাড়া, ১৩ হাজার ৩০৮টি পরিবারভিত্তিক বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা সম্পন্ন হয়েছে এবং উপকারভোগীর নিকট হস্তান্তর করা হয়েছে। এছাড়া ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে ৩ হাজার লিটার বিশিষ্ট আরও ২ হাজার পরিবারভিত্তিক বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা সিস্টেম স্থাপনের কাজ চলমান রয়েছে। এ অর্থবছরে আরও ১০ খানাবিশিষ্ট ৬৫৮টি কমিউনিটি ভিত্তিক রেইন ওয়াটার হারভেস্টিং সিস্টেম স্থাপনের কাজও চলমান আছে।
সংসদ সদস্য আমীর এজাজ খানের এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, উপকূলীয় জেলা খুলনার দাকোপ ও বটিয়াঘাটা উপজেলা ভয়াবহ নদী ভাঙনের ঝুঁকি সম্পর্কে সরকার অবগত। দাকোপ উপজেলায় ৬০-এর দশকে বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হয়। উক্ত বেড়িবাঁধটি নদীভাঙন, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের কারণে সময়ে সময়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাই, দাকোপ ও বটিয়াঘাটা উপজেলাবাসীর জীবন ও সম্পদ রক্ষায় টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ এবং নদী ভাঙন রোধকল্পে সরকার ইতোমধ্যেই বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে যা নিম্নরূপ।
খুলনা জেলায় দাকোপ উপজেলায় পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃক নদী ভাঙন রোধে “Disaster Risk Management Enhancement Project” এর আওতায় বটবুনিয়া, খলিশা, গাইনবাড়ি এবং ঝালবুনিয়া নামক স্থানে স্থায়ী নদী তীর ও বাঁধের ঢাল সংরক্ষণ কাজ চলমান রয়েছে। প্রকল্পটির মেয়াদ জুন, ২০২৭ এ সমাপ্ত হবে।
এছাড়াও জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় খুলনা জেলার দাকোপ উপজেলার উপকূলীয় পোল্ডার নং ৩১ এর পুনর্বাসন” প্রকল্পটির প্রকল্প দলিল বর্তমানে যাচাই বাছাই পর্যায়ে রয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দাকোপ উপজেলাবাসী ভয়াবহ নদী ভাঙনের হাত থেকে রক্ষা পাবে। ভয়াবহ নদী ভাঙনের হাত থেকে দাকোপ ও বটিয়াঘাটা উপজেলাবাসীর জীবন ও সম্পদ রক্ষায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের মাধ্যমে অধিক ঝুঁকিপূর্ণ স্থানসমূহে ইতোমধ্যে জরুরি আপদকালীন কাজ বাস্তবায়ন করা হয়েছে। আগামী বর্ষা মৌসুমের পূর্বেই দাকোপ এবং বটিয়াঘাটা উপজেলার ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধগুলো বাস্তবতার আলোকে সংস্কারের পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি বলেন, সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা ও সম্পদ রক্ষায় সরকার সচেষ্ট রয়েছে। এ লক্ষ্যে পানি উন্নয়ন বোর্ডের মাধ্যমে ভাঙনপ্রবণ স্থানগুলো নিয়মিত তদারকি করা এবং জরুরি প্রয়োজনে দ্রুততার সাথে সংস্কার কাজ পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে।





